'আল্লাহতায়ালাই খোররামশাহ্র মুক্ত করেন'
ফার্সি ১৩৬১ সালের ৩রা খোরদাদ বা ১৯৮২ সালের ২৩ মে ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন। এ দিন ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খোররামশাহ্র ইরাকি বাহিনীর হাতে প্রায় ২০ মাস দখল থাকার পর ইরানের অকুতোভয় বীর যোদ্ধারা মুক্ত করেন।
খোররামশাহরের জামে মসজিদের চূড়ায় আবার ইসলামের পতাকা ওড়ে। শহরটি মুক্ত করার খবর দ্রুত সারা ইরানে ছড়িয়ে পড়লে জনতা রাস্তায় নেমে আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন। তারা মসজিদে মসজিদে সমবেত হয়ে শোকরানা নামাজ আদায় করেন। এ সময় কারো কারো চোখে আনন্দাশ্রু দেখা যায়। খোররামশাহ্র মুক্ত করার অভিযানের নাম দেয়া হয়েছিল ‘বাইতুল মোকাদ্দাস' অভিযান। ইরানি যোদ্ধারা ২৪ দিন ধরে চার পর্বে এ অভিযান চালান এবং ইরাকের বাথ পার্টির অনুগত সেনারা বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে খোররামশাহ্র ছেড়ে পালিয়ে যায়।
১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ.)'র নেতৃত্বে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফল হওয়ার পর থেকেই এ বিপ্লব ধ্বংস করার জন্য পাশ্চাত্য হন্যে হয়ে চেষ্টা চালাতে থাকে। এ কাজে পাশ্চাত্যের সঙ্গে যোগ দেয় মধ্যপ্রাচ্যের কিছু আরব দেশ। পশ্চিমা ও আরব দেশগুলো ইরানের নবগঠিত ইসলামী শাসনব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্যে ইরাকের স্বৈরশাসক সাদ্দামকে তেহরানের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়।
সাদ্দাম মাত্র তিন দিনে গোটা ইরান দখলের দাম্ভিক ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ শুরু করলেও ইরানি যোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় এবং সে যুদ্ধ আট বছর স্থায়ী হয়। ইরানের এক ইঞ্চি ভূমি দখল ছাড়াই পিছু হঠে যায় পশ্চিমা ও আরব দেশগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় যুদ্ধ পরিচালনাকারী সাদ্দাম বাহিনী।
খোররামশাহ্র মুক্ত করার অভিযানের সময় ইরানি জনগণের ঐক্য ও দৃঢ় প্রত্যয় ছিল এক কথায় অতুলনীয়। শহরটির অধিবাসীরা এমন সময় সাদ্দাম বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন যখন আগে থেকে এ ধরনের কোন প্রস্তুতিই তাদের ছিল না। তারপরও ঈমানি চেতনা এবং মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে খালি হাতে তারা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তা ছিল প্রতিরোধ সংগ্রামের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান আক্রমণের আগে সাদ্দাম যে কৌশলগত ভুলটি করেছিল তা হলো, বাগদাদ সমরাস্ত্র ও সৈন্যসংখ্যার ভিত্তিতে ইরানের সঙ্গে নিজের শক্তিমত্তা যাচাই করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইরানি জনগণের দৃঢ় ঈমান, দেশপ্রেম ও প্রতিরোধ শক্তি পরিমাপের প্রয়োজন মনে করেনি।
ইরাকি বাহিনীর হাত থেকে খোররামশাহ্র মুক্ত করার ঘটনা ছিল ইরানের বিগত দেড়শ' বছরের সমর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন। এ অর্জনের ফলে ইরানি জনগণ হারানো গৌরব ফিরে পায়, সেইসঙ্গে সাদ্দামকে সমর্থনকারী দেশগুলো হতচকিত হয়ে যায়। বাগদাদ মনে করেছিল, ইরানের খোররামশাহ্র চিরদিনের জন্য ইরাকের দখলে চলে গেছে। কিন্তু তা আবার ইরানের হাতে চলে আসায় তাদের সে স্বপ্ন রূপকথায় পরিণত হয়।
মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ.) খোররামশাহ্র মুক্ত করার খবর শোনার পর ইরানি জনগণকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে একটি বাণী পাঠান। ওই বাণীর একাংশে তিনি বলেছিলেন, "আমি সেই ইরানি জাতিকে অভিনন্দন জানাচ্ছি যে জাতি এমন অকুতোভয় যোদ্ধাদের জন্ম দিয়েছে যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে স্বদেশভূমিকে মুক্ত করেছেন। আমি মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যিনি ইরানি যোদ্ধাদের ঈমানি শক্তি দৃঢ় করে এ রকম একটি বিজয় অর্জনের শক্তি ও সাহস যুগিয়েছেন।" তিনি বলেন, আল্লাহতায়ালাই খোররামশাহ্র মুক্ত করেছেন।
খোররামশাহ্র মুক্তির মাধ্যমে ইরাক-ইরান যুদ্ধে শক্তির ভারসাম্য ইরানের অনুকূলে চলে আসে। ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত এবং এদেশের কিছু ভূখণ্ড দখলের পরিকল্পনা নিয়ে যে যুদ্ধ পশ্চিমা ও আরব দেশগুলো শুরু করেছিল, ইরানি জাতির ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধের ফলে এতে প্রকারান্তরে ইরানই লাভবান হয়।
ইরানি জনগণের মধ্যে নজীরবিহীন রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ইরানি যোদ্ধাদের হাতে খোররামশাহ্র মুক্ত করার খবর পশ্চিমাদের জন্য এতটা বেদনাদায়ক ছিল যে, তাদের গণমাধ্যম টানা ২৪ ঘণ্টা এ খবর প্রচার করেনি। পাশ্চাত্য এ কথা বিশ্বাসই করতে পারেনি যে, ইরানি যোদ্ধারা একদিন খোররামশাহ্র মুক্ত করতে পারবে। কিন্তু এক পর্যায়ে তারা সত্য স্বীকারে বাধ্য হয়। বিবিসি দু'দিন পর খবর দেয়, ‘পশ্চিমা সংবাদদাতারা খোররামশাহ্র পরিদর্শন করে ইরাকি বাহিনীর দৃঢ় মনোবলের খবর দেয়ার মাত্র চারদিন পর ইরানি সৈন্যদের হাতে শহরটির পতন ঘটলো'।
দেশের নিরাপত্তা যখন বিপন্ন হয় তখন প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা প্রতিটি মুসলমানের ধর্মীয় ও জাতীয় কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। মহান আল্লাহ সুরা হজ্বের ৩৯ ও ৪০ নম্বর আয়াতে তাঁর পথের সৈনিকদের বিজয়ের সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন, "যাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে তাদেরকে জিহাদের অনুমতি দেয়া হলো। কারণ, তারা জুলুমের শিকার হয়েছে এবং আল্লাহ তাদেরকে বিজয়ের সুসংবাদ দিচ্ছেন; যারা অন্যায়ভাবে বিনা কারণে তাদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন- তাদের একমাত্র দোষ ছিল এই যে, তারা বলেছিল, আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ।"
আল্লাহর এ প্রতিশ্রুতি ইরাকের সঙ্গে ইরানের আট বছরের যুদ্ধে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হয়েছে। মহান আল্লাহরই প্রত্যক্ষ মদদে শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে ইরান।
খোররামশাহ্র মুক্ত করাসহ আট বছরের প্রতিরক্ষা যুদ্ধে ইরানের সফলতার আরেকটি বড় কারণ ইসলামী ও বিপ্লবী মূল্যবোধের প্রতি ইরানি যোদ্ধাদের গভীর শ্রদ্ধা। যুদ্ধের কঠিনতম দিনগুলোতেও তারা এ মূল্যবোধ রক্ষার কথা ভুলে যাননি। যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর এসব মূল্যবোধ রক্ষার কারণেই ইরান জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অভূতপূর্ব উন্নতি লাভ করেছে। আজ কারো কাছে অজানা নয় যে, পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রচণ্ড চাপ ও বহুমুখী নিষেধাজ্ঞাকে ইরানি জনগণ সুযোগে পরিণত করেছে। তারা এ সব চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি। ইরানি জনগণ অবরোধকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে সব ক্ষেত্রে স্বাবলম্বী হয়েছে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কোন কোন শাখায় বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে স্থান করে নিয়েছে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী সাদ্দাম বাহিনীর কাছ থেকে খোররামশাহ্র মুক্ত করার ঘটনাকে নিছক একটি ভূখণ্ড ফিরে পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে নারাজ। তার মতে, সেদিনের অভিযানে মহান লক্ষ্যপানে ছুটে চলা ইরানি জনগণের একতা ও সংহতির প্রকাশ ঘটেছিল।
তিনি খোররামশাহ্র মুক্ত করার এক বার্ষিকীতে দেয়া ভাষণে বলেছেন, ‘আগ্রাসী বাহিনীর মোকাবিলায় প্রতিরোধের নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন খোররামশাহরের অধিবাসীরা। এ শহরের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা এমন এক বীরত্বগাঁথা সৃষ্টি করেছেন যার ফলে খোররামশাহরের নাম ইরানের ইতিহাসে চির উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। ইরানি জনগণের এ প্রতিরোধকামী মনোভাব যতদিন বজায় থাকবে, ততদিন তারা মহান আল্লাহর ঐশী মদদ থেকে বঞ্চিত হবে না'।
খোররামশাহ্র মুক্ত করার পর বহু বছর পেরিয়ে গেলেও আজো ইরানি জনগণ প্রতি বছর দিনটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে এবং নিজেদের প্রতিরোধস্পৃহাকে চির জাগরূক রাখার শপথ নেয়। তারা আজকের দিনে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে, কোন ধরনের আগ্রাসনের সামনেই তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না, বরং নিজেদের ঐক্য ও সংহতি বজায় রেখে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করবে। আজ যখন সাম্রাজ্যবাদী ও ইহুদিবাদী শক্তিগুলো ইরানের ওপর আগ্রাসন চালানোর হুমকি দিচ্ছে, তখন ইরানি জনগণের এ সংকল্পের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করার সময় এসেছে।#