জনপ্রিয়তাই আসাদের মূল শক্তি, বিরোধীরা ‘বৃহত্তর-ইসরাইল’ প্রকল্পের সেবক : বিশ্লেষক
https://parstoday.ir/bn/news/west_asia-i38256-জনপ্রিয়তাই_আসাদের_মূল_শক্তি_বিরোধীরা_বৃহত্তর_ইসরাইল’_প্রকল্পের_সেবক_বিশ্লেষক
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের ব্যাপক জনপ্রিয়তা, দেশটিতে সাম্প্রতিক ইসরাইলি হামলা ও মুসলিম বিশ্বকে ভেঙ্গে বৃহৎ ইসরাইল গড়ার নীলনকশা প্রসঙ্গে সম্প্রতি মূল্যবান অভিমত ব্যক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষক ও ইসলামী চিন্তাবিদ মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
মে ১৯, ২০১৭ ১৭:০০ Asia/Dhaka
  • জনপ্রিয়তাই আসাদের মূল শক্তি, বিরোধীরা ‘বৃহত্তর-ইসরাইল’ প্রকল্পের সেবক : বিশ্লেষক

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের ব্যাপক জনপ্রিয়তা, দেশটিতে সাম্প্রতিক ইসরাইলি হামলা ও মুসলিম বিশ্বকে ভেঙ্গে বৃহৎ ইসরাইল গড়ার নীলনকশা প্রসঙ্গে সম্প্রতি মূল্যবান অভিমত ব্যক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষক ও ইসলামী চিন্তাবিদ মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান।

রেডিও তেহরানকে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি যেসব মূল্যবান কথা বলেছেন তার প্রথম  কিস্তি তুলে ধরা হল এখানে:

রেডিও তেহরান: ইসরাইল গত ২৭ এপ্রিল  সিরিয়ায় যে হামলা চালিয়েছে তার পটভূমি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আপনার অভিমত ও বিশ্লেষণ কী? এ হামলার কী বহুমুখী লক্ষ্য-উদ্দেশ্য রয়েছে? আর সিরিয়ায় আসাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের বড় বড় বহু সরকারের সর্বাত্মক মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোর ব্যাপক যুদ্ধ সত্ত্বেও এখনও ইসরাইল-বিরোধী এই আরব নেতার টিকে থাকার রহস্যও বা কী হতে পারে?

মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান: দেখুন, তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জাবহাতুন নুসরা নিয়ন্ত্রিত সিরিয় শহর খানশাইখুনে রহস্যজনক ‘রাসায়নিক হামলা’র বিষয়ে এখনও নিরপেক্ষ কোনো তদন্ত করা হয়নি। অথচ ওই হামলার ঠিক পর পরই কোনো তদন্ত ছাড়াই মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররা ওই রাসায়নিক হামলাকে  বাশার আল-আসাদ সরকারের কাজ বলে দাবি করে। আর দামেস্ক সরকারকে একতরফা দোষী সাব্যস্ত করে ট্রাম্প প্রশাসন সিরিয় সরকার নিয়ন্ত্রিত বিমান-ঘাঁটি আশ-শুআইরাতে গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

কথিত ওই রাসায়নিক হামলার আহতদের যে ভিডিও চিত্র ও ফুটেজগুলো জঙ্গি গোষ্ঠী জাবহাতুন নুসরার ওয়েব সাইটে প্রকাশিত হয়েছে সেগুলো সত্য ও বাস্তব হওয়ার ব্যাপারেই বিশেষজ্ঞ মহলের সন্দেহ রয়েছে। আর স্বয়ং বাশার আল আসাদ এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছেন: এ ছবি ও ভিডিও ফুটেজগুলো যে সত্য নয় সে সংক্রান্ত সাক্ষ্য প্রমাণ তাদের কাছে আছে।

এরপরেও আসাদ সরকার, ইরান ও রাশিয়া খানশাইখুনের ব়াসায়নিক হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত করতে জাতিসংঘের কাছে প্রস্তাব দেয়। কিন্তু মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররা এ প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি বরং তা নাকচ করেই দিয়েছে। তাই এ থেকে প্রমাণ হয় যে খানশাইখুন শহরে অসমর্থিত এ রাসায়নিক হামলার অপরাধে বাশার আল আসাদ সরকারকে অভিযুক্ত করাটা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে বাশার আল আসাদ সরকার, ইরান, রাশিয়া ও চীনের শক্ত নীতি অবস্থানের কারণে এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন হালে আর পানি পায়নি।  তাই আবারও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আস্ফালন করা ছাড়া আর তেমন কিছুই করতে পারেনি ট্রাম্প সরকার। অবশ্য ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ আঞ্চলিক বশংবদ তাবেদার মিত্ররা, যেমন: সৌদি আরব গং এ ন্যক্কারজনক মার্কিন হামলার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে।

এটাও সত্য যে মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররা, বিশেষ করে ব্রিটেন, ইসরাইল, সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত ও তুরস্ক যেকোনোভাবেই বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ঘটিয়ে সিরিয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং ইসরাইলকে পুরোপুরি নিরাপদ করতে চায়। কারণ বাশার আল আসাদ সরকার ইসরাইল-বিরোধী লেবাননি ও ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন ও সংগ্রামী গ্রুপ ও দলগুলো তথা হিজবুল্লাহ, হামাস, জিহাদ-ই ইসলামী,পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন-এর মতো ইসরাইলি দখলদারিত্ব-বিরোধী জোটের  মূল অক্ষ।

ইসলামী ইরানও এইসব সংগ্রামী প্রতিরোধ আন্দোলন ও গ্রুপগুলোর মধ্যে যোগাযোগের সেতুবন্ধ স্বরূপ। তাই বাশার আল আসাদ সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে সিরিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই লেবাননি ও ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন ও গ্রুপগুলোর সাথে ইরানের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা যাবে। এভাবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাবকে যেমন খর্ব করা যাবে ঠিক তেমনি ইসরাইলের নিরাপত্তা বিধান ও আধিপত্য নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে।

সিরিয়ার গুটিকয়েক ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্রোহীদের মদদ দিয়ে ও দেশটিতে সালাফি-তাকফিরি ওয়াহাবি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে ঢুকিয়ে গোলযোগ, যুদ্ধ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ঘটাতে চেয়েছিল মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররা তথা পাশ্চাত্য, ইসরাইল ও আঞ্চলিক আরব শাসক-চক্র। কিন্তু তাতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।

অবশ্য তারা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠন ও গ্রুপগুলোর মধ্যে এক ধরণের ভাঙ্গন ও ফাটল ধরাতে আপাতত সক্ষম হয়েছে। যেমন, অতি সম্প্রতি হামাস নিজ আন্দোলন ও কৌশল সংক্রান্ত যে সনদ প্রকাশ করেছে তাতে ইসরাইলকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও ১৯৬৭ সালের জাতিসংঘ প্রস্তাবিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে মেনে নিয়েছে যা অপর জনপ্রিয় ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন ইসলামী জিহাদ প্রত্যাখ্যান করেছে। জিহাদ এ যুক্তি দেখাচ্ছে যে, ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের প্রতিটি অংশ , মাটি ও অঞ্চল ফিলিস্তিনিদের এবং তা কেউ উপেক্ষা করতে পারবে না। 

উল্লেখ্য পিতা আল আসাদের মতো বাশার আল আসাদও ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ ও শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করেননি। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করলে এবং ফিলিস্তিন ও মজলুম ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে  ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করলে এর বিনিময়ে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে হারানো গোলান মালভূমি সিরিয়াকে ফেরত দেয়া হবে বলে তেলআবিব যে টোপ দিয়েছিল তাও প্রত্যাখ্যান করেছেন বাশার আসাদ।

অথচ জর্দান, আরব আমিরাত, কাতার, মরক্কো, সৌদি সরকার ইত্যাদি আরব দেশগুলো ফিলিস্তিন ও ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে এখন একের পর এক দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলের সাথে আপোষ করার ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিচ্ছে। এখন ঊর্ধ্বতন সৌদি-ইসরাইলী রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের এবং ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ আর রাখ-ঢাক করে নয় বরং তা সম্পূর্ণ খোলাখুলি ও নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। যেমন, ২০১৬ সালে সংবাদমাধ্যমগুলো তেল আবিবে সৌদি গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান জেনারেল আনোয়ার এশকির সফর এবং ইসরাইলী রাজনীতিবিদ ও কয়েকজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে তার সাক্ষাতের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।  এ নিয়ে নানা মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়াও হয়েছিল। আর এ প্রসঙ্গে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি বলেছেন, ‘ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সৌদি চেষ্টা মুসলিম উম্মাহর পিঠে ছুরি মারার শামিল’।  

 বর্ণবাদী ইসরাইল, সৌদি আরব ও পারস্য-উপসাগরীয় আরব দেশগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে, ইসরাইল নয় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানই হচ্ছে এ অঞ্চলের তথা মধ্যপ্রাচ্যের আসল দুশমন! শুধু তাই নয়, তারা এটাও বলছে যে মার্কিন সরকারসহ  পাশ্চাত্য ও ইসরাইলের কাছে সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচিত জনপ্রিয় লেবাননি প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনি জনপ্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস ও ইসলামী জিহাদের মত দলগুলোকে পূর্ণ নৈতিক, মানবিক সামরিক সহায়তা দানের জন্য ইরান তথাকথিত বিশ্বশান্তির শত্রু! আর ইরান বিরোধী এ বিষাক্ত প্রচারণায় সর্বাত্মকভাবে অংশ নিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও পাশ্চাত্যও।

২০১৬ সনের ২৩ জানুয়ারি ড্যাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকে সিএনএন-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইসরাইল সম্পর্কে সৌদি আরবের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সৌদি আরব বুঝতে পেরেছে ইসরাইল তার শত্রু  নয় বরং বন্ধু।  আর বাশার আল আসাদ সরকার ইসরাইল-বিরোধী এসব প্রতিরোধ আন্দোলন এবং ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ সুসম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, পাশ্চাত্য এবং তাদের আঞ্চলিক সেবাদাস সরকারগুলোর চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে।

তাই এদের দৃষ্টিতে বাশার আল আসাদ এবং তার সরকার সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার যোগ্য নয়! আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দৃষ্টিতে এটাই তো নিতান্ত স্বাভাবিক। কারণ ২০০৬ সালের ইসরাইল-হিজবুল্লাহর ৩৩ দিনের যুদ্ধ এবং তিন-তিনটি ইসরাইল-গাজা যুদ্ধে (২০০৯ সালের ২২ দিনের যুদ্ধ, ২০১১ সালের ১১ দিনের যুদ্ধ এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালের রমজান ও শাওয়াল মাসের দেড় মাসের বেশি সময় ধরে স্থায়ী যুদ্ধ) ইসরাইলের সামরিক পরাজয় ও ব্যর্থতায় এই বাশার আল আসাদ সরকারের ইতিবাচক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ  অবদান সত্যিই অনস্বীকার্য।

আসলে সিরিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সেদেশের জনগণের কল্যাণের জন্য নয় বরং ইসরাইলের সার্বিক নিরাপত্তা ও এই অঞ্চলের উপর তার প্রভুত্ব ও আধিপত্য বজায় ব়াখার জন্যই দেশটির ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।  সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন সরকার, ইসরাইল, পাশ্চাত্য এবং তাদের আঞ্চলিক বশংবদ তাবেদার সৌদি, কাতারি,আমিরাতি ও তুর্কী শাসকগোষ্ঠীর সম্মিলিত ষড়যন্ত্রই এই যুদ্ধের উৎস। এইসব সরকার ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ভাড়াটে বদমায়েশ সালাফি-তাকফিরি-ওয়াহাবি জঙ্গি সন্ত্রাসীদের সিরিয়ায় পাঠিয়ে ৬ বছর আগে সেদেশে গৃহযুদ্ধের সূচনা করে। আর এ যুদ্ধে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার, ইরাকের ডিক্টেটর সাদ্দাম হোসেন, মিশরের স্বৈরাচারী শাসক হুসনি মুবারক, তিউনিসিয়ার ডিক্টেটর বেন আলী এবং লিবিয়ার উন্মাদ স্বৈরাচারী গাদ্দাফির মতো বাশার আল আসাদ সরকারের পতন হয় নি। কারণ, প্রাগুক্ত সরকার ও স্বৈরাচারী শাসকদের বিপরীতে বাশার আসাদের রয়েছে ব্যাপক জনসমর্থন।

বাশার আল আসাদ সরকারের প্রতি জোরালো জনসমর্থন থাকায় ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েও এ সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব হয় নি। রাশিয়া ও ইরানের জোরালো সমর্থনও বাশার আল আসাদ সরকারের টিকে থাকার একমাত্র কারণ নয়। অধিকন্তু রাশিয়া বিগত এক বছর ধরে সিরিয়াকে প্রত্যক্ষ সামরিক সহায়তা দেয়ার কাজে যুক্ত হয়েছে।

আর যদি বলা হয় যে ইরান তো সিরিয়া সংকটের সূচনালগ্ন থেকে বাশার আল আসাদ সরকারকে প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সামরিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে অর্থাৎ ইরান সূচনাকাল থেকেই এ সংকটের সাথে জড়িত বলেই বাশার আল আসাদ সরকার পতনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে! কিন্তু এই ভুল দাবির জবাব হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর ন্যাটো-জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ সেনা-শক্তির অধিকারী দেশ তুরস্ক, তেলসমৃদ্ধ ধনাঢ্য সৌদি আরব, কাতার, আরব আমিরাত, বিশ্বের ৪র্থ শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তির অধিকারী ইসরাইল, বিশ্বের ১ নং পরাশক্তি মার্কিন সরকার, মহাশক্তিধর গ্রেট ব্রিটেন, শক্তিশালী পরাশক্তি ফ্রান্স এবং নব্য উদীয়মান শক্তিধর ধনী দেশ কানাডা ও পাশ্চাত্যের অন্যান্য শক্তিধর দেশ সূচনালগ্ন থেকেই প্রত্যক্ষভাবে সিরিয়া সংকটের সাথে যে যুক্ত তা কারো অজানা নয়। তাই সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আন্তর্জাতিকভাবে আরোপিত সর্বাত্মক অর্থনৈতিক সামরিক অবরোধ কবলিত ইরান জনসমর্থনহীন বাশার আল আসাদ সরকারকে একা কিভাবে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে?

....আর এর সাথে বিলম্বে হলেও রাশিয়ার প্রত্যক্ষ যোগও কথিত 'গণ-বিচ্ছিন্ন' বাশার আল আসাদ সরকারের টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নয় যদি তার পর্যাপ্ত জনসমর্থন না থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাশ্চাত্য, তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলো ও পাকিস্তানের সমর্থনপুষ্ট আফগান মুজাহিদ দলগুলো দখলদার সোভিয়েত সেনাবাহিনীকে আফগানিস্তান থেকে বের করতে সক্ষম হয়েছিল তাদের প্রতি সেদেশের জনগণের পূর্ণ সমর্থন ও মদদ ছিল বলেই। জনসমর্থন না থাকলে তারা তা করতে সক্ষম হত না। আর পাকিস্তান আফগানিস্তানের সীমান্তে অবস্থিত প্রতিবেশী দেশ হওয়ার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা খুব ভালোভাবে মুজাহিদদেরকে অস্ত্র ও রসদপত্র সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছিলো।

কিন্তু সিরিয়ার সীমান্তে রয়েছে তুরস্ক, ইসরাইল ও জর্দানের মত বৈরী দেশ। অন্যদিকে ইরাক যদিও সিরিয়ার বৈরী-দেশ নয় তবুও সিরিয়া-ইরাক সীমান্ত বহুবছর ধরেই সাবেক আল-কায়দা তথা আই এস বা ‘দায়েশ’ জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন। আর ইরান ভৌগলিকভাবে সিরিয়ার সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী দেশ নয় রাশিয়াও তাই। ফলে ইরান ও রাশিয়া সিরিয়ায় জল ও বিমান-পথ ছাড়া স্থল পথে যোগাযোগ করতে সক্ষম নয়।

আর যুদ্ধে সাফল্যের অনেকটাই আবার স্থল সীমান্তের উপর নির্ভরশীল যার উৎকৃষ্ট প্রমাণ হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের অভিন্ন সীমান্ত না থাকাটা নয় মাসের মতো অতি অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সহায়ক কারণ হয়েছিলো। আর এ ক্ষেত্রে আকাশ ও সমুদ্র পথে যোগাযোগ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর জন্য সহায়ক হতে পারেনি। আর যুদ্ধের শেষের দিকে ভারতীয় নৌ ও বিমান বাহিনী এ যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আফগানিস্তানের সীমান্ত থাকার কারণে মুজাহিদদের প্রতি আফগান জনগণের অকুণ্ঠ জোরালো সমর্থন ও সহযোগিতার পরও সোভিয়েত দখলদারিত্ব থেকে আফগানিস্তানের মুক্ত হতে দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল।

রাশিয়ার তুলনায় ইরানের পক্ষে সমুদ্র পথে সিরিয়ায় যোগাযোগ বেশ কঠিন। কারণ ইরানকে এজন্য লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে ইসরাইল ও মিসরের মধ্যবর্তী সুয়েজ ক্যানেল দিয়ে ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত সিরিয় বন্দরগুলোতে পৌঁছতে হবে। আর এ বিষয়টা সত্যি কষ্টসাধ্য, বিপদসংকুল ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ লোহিত সাগরের সমগ্র পূর্ব উপকূল জুড়ে রয়েছে সৌদি আরব এবং সুয়েজ ক্যানেল ও আকাবা উপসাগরে রয়েছে মিশর, জর্দান ও ইসরাইল। তাই ইরান নয় বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, জর্দান ও তুরস্কই পারে সিরিয়া সংলগ্ন আকাশ-পথ এবং বিশেষভাবে স্থল ও জল পথ ব্যবহার করতে। আজ পর্যন্ত তারা এ পথগুলোকে ব্যাপক মাত্রায় অপব্যবহার করছে।

কিন্তু এইসব অপব্যবহারের পরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা সিরিয় যুদ্ধের ইস্পাত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তারা বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ঘটাতে পারেনি। গত ৬ বছর গত হয়ে যাওয়ার পরেও সিরিয় সেনাবাহিনীর মনোবলতো ভাঙ্গেইনি, বরং তারা বিভিন্ন রণাঙ্গনে একের পর এক বিজয় ও সাফল্য অর্জন করেই যাচ্ছে। সিরিয় সেনাবাহিনী ও সরকারের প্রতি যদি সেদেশের  জনগণের সমর্থন না থাকতো তাহলে ৬ বছর গত হয়ে যাওয়ার পরও সিরিয় সেনাবাহিনীর মধ্যে এ মনোবল থাকা ও বিজয় সাফল্য অর্জন কস্মিনকালেও সম্ভব হতো না। আর যে কোনো স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী ও দখলদার সেনাবাহিনীর মনোবল ও শক্তি যুদ্ধ ও সংঘাতের শুরুর দিকেই কেবল বজায় থাকে। কিন্তু দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর তা বজায় থাকা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণের মুখে বিশ্বের তৃতীয় শ্রেষ্ঠ সেনাবাহিনী হওয়ার দাবীদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মনোবল ও শক্তি দ্রুত লোপ পেয়েছিলো এবং কার্যত: পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা ও দেশের কিছু বিশেষ অঞ্চল ছাড়া আর কিছুই তাদের হাতে ছিল না। দেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে একের পর এক পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পরাজয় ও বিপর্যয় ঘটেই যাচ্ছিল যদিও মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র ও রসদ পত্র ভারতের কাছ থেকে পেতেন। কিন্তু তাদের প্রতি যদি অকুণ্ঠ জনসমর্থন না থাকত তাহলে এ বিজয় অর্জন সম্ভব হতো না। তাই একই কথা সিরিয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সিরিয় সরকার ও সেনাবাহিনীর প্রতি সে দেশবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন থাকার কারণেই সিরিয় বাহিনী এসব সাফল্য অর্জন করছে।

আর জনসমর্থন না থাকার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল,পাশ্চাত্য, সৌদি-কাতারি-আমিরাতি-জর্দানি-তুর্কি সরকারের সম্মিলিত ও সর্বাত্মক সাহায্য সত্ত্বেও ভাড়াটে জঙ্গি সন্ত্রাসী সালাফি-তাকফিরি-ওয়াহাবি  গোষ্ঠী ও গ্রুপগুলো বিভিন্ন ব়ণাঙ্গনে পরাজয় বরণ করেই চলছে। 

জাবহাতুন নুসরা জঙ্গি গোষ্ঠীটি ইসরাইল নিয়ন্ত্রিত গোলান মালভূমি অঞ্চল থেকে ইসরাইলের কাছ থেকে নিয়মিত অস্ত্র ও রসদপত্র লাভ করে থাকে এবং এ জঙ্গি গোষ্ঠীটির আহত যোদ্ধাদেরকে ইসরাইলি সামরিক অ্যাম্বুলেন্স ও পরিবহন যানে করে অধিকৃত গোলান অঞ্চলস্থ ইসরাইলী সামরিক হাসপাতালগুলোয় এনে চিকিৎসা দিচ্ছে ইসরাইল। সেখানে চিকিৎসাধীন আহত সন্ত্রাসীদের সাথে ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর অনেক ছবিও প্রকাশ করেছে ইসরাইল।

 সিরিয়ায় জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো অসুবিধায় পড়লে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত হতে থাকলেই তাদের মনোবল চাঙ্গা করার জন্য ইসরাইল সিরিয় সেনাবাহিনীর অবস্থানের উপর বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এ জাতীয় হামলার সামরিক কার্যকারিতার চেয়ে প্রচারণামূলক প্রভাব ও কার্যকারিতাই বেশি। সম্প্রতি (গত ২৭ এপ্রিল ভোরবেলায়) দামেস্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে এ ধরনেরই এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইসরাইল।

 সত্যিই কি অদ্ভুত সৌদি-কাতার-আমিরাত-তুরস্ক সমর্থিত উন্মাদ হিংস্র সালাফি তাকফিরি ওয়াহাবি  জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বাশার আল আসাদ বিরোধী ‘জিহাদ’ যাতে ইহুদি-জায়নবাদী ইসরাইল এবং নাসারা (খ্রিষ্টান) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য অংশ নিয়ে দুনিয়া ও আখেরাতের অশেষ কল্যাণ, সওয়াব (পুণ্য) ও রুহানি ফয়জ ও ফায়দা হাসিল করার সুযোগ পাচ্ছে!

সম্ভবত  সৌদি ওয়াহাবি ফতোয়াবাজ মুফতি ও আলেমদের মনে এ ধারণা জন্মাতেও পারে যে, ‘ইসলামের এ সুমহান খেদমত’ অর্থাৎ ওয়াহাবি সালাফি তাকফিরি মতবাদের প্রসার প্রচারে সাহায্য ও মদদ করার সুবাদে মহান আল্লাহ পাক ইহুদি ইসরাইল ও নাসারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যকে ‘ইসলামের’(ওয়াহাবি মতবাদের) ছায়াতলে স্থান দেবেন!

 এমনকি এর ফলে বিনা যুদ্ধে ও রক্তপাত    না ঘটিয়েই তেলআবিব, ওয়াশিংটন, লন্ডন, প্যারিস, মাদ্রিদ, লিসবন, রোম, বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও  ব্রাসেলস ‘ফাতহ’ বা জয় হয়ে যাবে!

 আর এই ‘ফাতহুল মুবিন’ তথা ‘মহাবিজয়ের’ পর অর্থাৎ ওয়াহাবি ইমামদের পিছনে ইহুদ বারাক, নেতানিয়াহু, কাৎসাভ, লিবারম্যান ও আমীর পিরেত্স বাইতুল মুকাদ্দাসের মসজিদুল আকসায়, টনি ব্লেয়ার, প্রিন্স চার্লস, ডেভিড ক্যামেরন ও থেরেসা মে লন্ডন জামে মসজিদে, বারাক ওবামা, জর্জ বুশ,বিল ক্লিনটন,ডোনাল্ড রামসফিল্ড ও  ট্রাম্প ওয়াশিংটনের জামে মসজিদে নামাজ আদায় করে ধন্য হবেন!  তাই ওয়াহাবিদের বন্ধু ইসরাইলের বিরুদ্ধে আর যুদ্ধ নয় বরং শান্তিচুক্তি ও সন্ধি স্থাপন করাটাই হবে ‘ইসলাম-সম্মত’!আর একারণেই ভবিষ্যতে হয়তো ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও জিহাদ ‘মহা-বিদআত’ ও ‘হারাম’ বলে ফতোয়া দেয়া হলে অবাক হওয়ার আর কিছু থাকবে না।

গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টা  আমরা সিরিয়া সংকট তথা মধ্যপ্রাচ্য,আফ্রিকা,আফগানিস্তান,পাকিস্তান,বাংলাদেশ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর মধ্যে  প্রত্যক্ষ করছি সেটা হচ্ছে এই যে আলকায়দা, তালিবান, দায়েশ বা আই এস,জাবহাতুন নুসরা,বোকো হারাম, তেহরিক-ই তালিবান পাকিস্তান, জে.এম.বি, হরকতুল জিহাদ এবং সমমনা উগ্রবাদী সালাফি তাকফিরি ওয়াহাবি জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ইহুদি জায়নবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে নয় বরং সাধারণ মুসলমানদের হত্যা করে যাচ্ছে।

টিম অ্যান্ডারসন ‘The dirty war on Syria:Washington,regime change and resistance’ শীর্ষক নিবন্ধে  লিখেছেন, ‘বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞ পাশ্চাত্যের সমর্থনপুষ্ট জিহাদি জঙ্গিদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে অথচ সিরিয় সেনাবাহিনীকে এগুলোর জন্য দোষী ও অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে। পাশ্চাত্যের সংবাদ মাধ্যম এবং এনজিওগুলো (এক্ষেত্রে) সরকারী ধারা ও নীতির  অন্ধ অনুসরণ করেছে। তাদের (সংবাদ ও তথ্যগুলোর) উৎস ছিল প্রায় অপরিবর্তিতভাবে ঐসব ব্যক্তি যারা জিহাদি জঙ্গিদের ঘনিষ্ঠ মিত্র।’

একই লেখক তার লেখার শুরুতে লিখেছেন, ‘সিরিয়ায় নোংরা যুদ্ধের ভিত্তি হচ্ছে ব্যাপক গণ তথ্য-বিভ্রাট ও তথ্য-বিকৃতি যা স্মরণকালে কখনও দেখা যায়নি।........এ ভাবে কোমল মন ও স্বভাবের সিরিয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ (চক্ষু বিশেষজ্ঞ) বিশ্ববাসীর কাছে এক নতুন দুষ্টু শয়তানে পরিণত হয়েছেন।’

বিগত দেড় থেকে দু’-বছরে ইসরাইল সীমান্তবর্তী সিনাই অঞ্চলে দায়েশ ও অন্যান্য ওয়াহাবি সালাফি জঙ্গি সন্ত্রাসী গ্রুপের বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলায় মিসরীয় সেনাবাহিনীর হাজারেরও বেশি সেনা নিহত হয়েছে। এই গত মার্চ (২০১৭)মাসেও আইএসের এ ধরণের এক হামলায় মিশরের সিনাই উপদ্বীপে ১০ জন মিশরীয় সেনা  প্রাণ হারিয়েছে। অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে এই যে এ সময়ের মধ্যে সিনাই-ইসরাইল সীমান্তে ইসরাইলী সেনা ও সীমান্ত রক্ষীদের উপর তেমন কোন হামলাই পরিচালনা করেনি আইএস বা অপর কোন সালাফি,তাকফিরি ওয়াহাবি জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং একটি ইসরাইলি সেনাও নিহত বা আহত হয়নি!

এখন প্রশ্ন: সিরিয়ার মতো এখানেও কি ইসরাইল আই,এস ও অন্যান্য সালাফি ওয়াহাবি তাকফিরি জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সিনাই ও মিশরে ওয়াহাবি সালাফি ইসলামী রাজ্য কায়েম করার লক্ষ্যে লজিস্টিক সার্ভিস এবং আহত জঙ্গিদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে? আর এ জন্যই কি এ সব তাকফিরি সালাফি ওয়াহাবি জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কৃতজ্ঞতাস্বরূপ জায়নবাদী ইহুদি ইসরাইলি সেনাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে না?

 জঙ্গি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো ইসরাইলের সাথে নিজেদের গোপন সম্পর্ক ও আঁতাত বিশ্ববাসীদের কাছে যাতে উন্মোচিত না হয় সেজন্য হয়তো ভবিষ্যতে ইসরাইলী অবস্থানের উপর  কয়েকটা দায়সারা গোছের হামলা চালিয়ে জানান দিবে যে তারা ইসরাইল বিরোধীও বটে! আর এতে করে যদি দু’চার জন ইসরাইলী সেনা হতাহত হয় তাতে হয়তো ইসরাইলের কোন আপত্তি থাকবে না! নিঃসন্দেহে এটা হচ্ছে লাশ ফেলে রাজনীতি করার এক অন্যতম নমুনা। সর্বশেষ ইসরাইলী হামলার সম্ভাব্য কারণ নিয়ে আমরা একটু পরে বিস্তারিত আলোচনা 

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ 

আর কেউ যদি বলেন, রাশিয়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি বা সুপার পাওয়ার এবং বাশার আল আসাদ সরকার এ ধরণের পরাশক্তির সাহায্য ও মদদ নিয়েই টিকে রয়েছে! – তাও সঠিক নয়। কারণ, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে অভিন্ন স্থল সীমান্ত থাকার পরেও এবং আফগানিস্তান সোভিয়েত রেড আর্মি কর্তৃক অধিকৃত হওয়া সত্ত্বেও কাবুলস্থ সোভিয়েত ইউনিয়নের পুতুল মার্ক্সিস্ট সরকারের শেয রক্ষা হয়নি। কারণ, কাবুলের পুতুল সরকারের কোন গণ-ভিত্তি ও জনসমর্থন ছিল না। কিন্তু সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ সরকারের যদি গণ-ভিত্তি ও জনসমর্থন না থাকত তাহলে কতিপয় ইরানি ও রুশ সামরিক উপদেষ্টা এবং কিছু রাশিয়ান জঙ্গি বিমান দীর্ঘ ৬ বছর গত হয়ে যাওয়ার পরও  বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ঠেকিয়ে রাখতে পারত না। 

এটাও মনে রাখা দরকার যে, রাশিয়া ও ইরানের সাথে সিরিয়ার কোনো অভিন্ন স্থল সীমান্ত নেই যে প্রয়োজন হলেই বাশার আল আসাদ সরকারের সাহায্যার্থে সৈন্য,রসদপত্র,অস্ত্র,গোলাবারুদ ও সাজ-সরঞ্জাম অনায়াসে যখন ইচ্ছা তখন সিরিয়ায় পাঠানো যাবে। তাই মিশরীয় সান্ধ্যকালীন সংবাদপত্র আলআহরাম আল মাসাঈ এক প্রতিবেদনে লিখেছে যে, বাশার আল আসাদ সরকারের টিকে থাকার কারণগুলোর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে সিরিয় সরকারের প্রতি সেদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর সমর্থন এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিদ্যমান অনৈক্য, দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়হীনতার।

 আর রাশিয়া নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী দেশ। তবে প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ঐ ধরণের পরাশক্তি নয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে এর তুলনাই চলে না। কারণ তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল সমগ্র মধ্য এশিয়া তথা কাজাখস্থান,উজবেকিস্তান,কিরঘিজিস্তান,তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান; ককেশাস অঞ্চল তথা আজারবাইজান,নাখজাভান,আর্মেনিয়া ও জর্জিয়া। বর্তমানে স্বাধীন ইউক্রেন, মোলদাভিয়া, এস্তোনিয়া, লিথুনিয়া, লাটভিয়া ও বেলারুশও ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ।  আর গোটা পূর্ব ইউরোপই ছিল সোভিয়েত বলয়ভুক্ত অর্থাৎ ওয়ার্শো প্যাক্টের অন্তর্ভুক্ত।

মহাশক্তিধর সোভিয়েত ইউনিয়ন আজ রাজনৈতিক ইতিহাসের যাদুঘরে স্থান পেয়েছে যার ভবিষ্যদ্বাণী করে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ নেতা মিখাইল গর্বাচেভের কাছে এক ঐতিহাসিক পত্রও দিয়েছিলেন ইমাম খোমেনী(রহঃ) সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতনের প্রায় দুবছর আগে। এখন না আছে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর না আছে ওয়ার্শো জোট। আর মধ্য-এশিয়া, ককেশাস এবং পূর্ব ইউরোপের ওপর বর্তমান রাশিয়ার তেমন কোন কর্তৃত্ব নেই। অথচ ন্যাটো জোট এখনও টিকে আছে এবং  দিনের পর দিন বড় হচ্ছে তার আকার ও দেহ। যেমন, সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো আর কিছু দিনের মধ্যেই ন্যাটো জোটভুক্ত হচ্ছে, যদিও এ ব্যাপারে রাশিয়ার প্রবল আপত্তি রয়েছে।

আর পোল্যান্ড, বুলগেরিয়ার মতো বেশ কিছু প্রাক্তন ওয়ার’শ  জোটভুক্ত দেশ ইতোমধ্যে ন্যাটোর সদস্যপদ লাভ করেছে। ইউক্রেন, জর্জিয়ার মত বেশ কিছু দেশের সাথে বর্তমানে রাশিয়ার যে বিরোধ আছে তা হয়েছে মূলত: পাশ্চাত্য ও বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অযাচিত হস্তক্ষেপ আর উস্কানির কারণেই। রাশিয়াও ইউক্রেন সমস্যার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে অবরোধ কবলিত যদিও তা ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মত তীব্র নয়।

সন্ত্রাসবাদ ও ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচী বজায় থাকার অজুহাতে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পূর্বাঞ্চলকে তাক করে পোল্যান্ডে যে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বসিয়েছে তার প্রকৃত লক্ষ্য যে রাশিয়া ও ইরান তাতে কোন সন্দেহ নেই। ফলে এর প্রবল বিরোধিতা করছে রাশিয়া। প্রাক্তন জার-শাসিত রাশিয়া আর সোভিয়েত ইউনিয়নের দখল-করা ও অধীনস্থ মুসলিম অঞ্চল এবং দেশগুলো আজ স্বাধীন হলেও এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশে  নানা প্রভাবের মাধ্যমে ইসরাইল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য অনুপ্রবেশ করেছে যা রাশিয়া ও ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।

আর ওয়ার’শ জোটের বিলুপ্তির পরও ন্যাটো জোটের অস্তিত্ব থাকা ও দিনের পর দিন তার সম্প্রসারণ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, নিষিদ্ধ মারণাস্ত্র ধ্বংস ও সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তথাকথিত সংগ্রাম করার বাহানায় নানা দেশ বিশেষকরে মুসলিম দেশগুলো আক্রমণ ও জবরদখল করা থেকে প্রমাণ হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী রক্ত-চোষা চেহারা ও ড্রাকুলা চরিত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরও মোটেও পাল্টায়নি বরং প্রতিদিনই তা নতুন রূপে প্রকাশ পাচ্ছে।

বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে রাশিয়ার কোন উপনিবেশ নেই। বরং আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়া ইসরাইল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ন্যাটো জোটের নব্য ঔপনিবেশিক-সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, উপস্থিতি ও দখলদারিত্ব-কবলিত। সৌদি আরব,কাতার, কুয়েত, আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ওমানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনের বেশকিছু সামরিক স্থল, বিমান ও নৌ-ঘাঁটি। ফিলিস্তিন তো এখনও বর্ণবাদে বিশ্বাসী জায়নবাদী শোষক-চক্র তথা ইহুদিবাদী ইসরাইলের দখলে।

রেডিও তেহরান: ‘নীল থেকে ফুরাত-ব্যাপী বৃহত্তর ইসরাইল’ গঠনের এক মহা-ষড়যন্ত্রের কথা এক সময় শোনা যেত। সিরিয়ায় সংকট জিইয়ে রাখাসহ মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে রাখার পশ্চিমা প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটে সেই মহা-ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন কী এখনও  বজায় রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান: হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস, জিহাদ-ই ইসলামীর কাছে বেশ কয়কটি যুদ্ধে পরাজিত ও ব্যর্থ হওয়ার পর বাহ্যত: ‘নীল থেকে ফুরাত’ পর্যন্ত বৃহত্তর ইসরাইল গঠন প্রক্রিয়া মুখ থুবড়ে পড়ে। কিন্তু আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়াসহ এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশে মার্কিন সরকার ও তার মিত্রদের দখলদারিত্বমূলক উপস্থিতি,সামরিক আগ্রাসন ও হামলা হচ্ছে ‘নয়া মধ্যপ্রাচ্যের’ শিরোনামে যেন সেই নীল থেকে ফুরাত-ব্যাপী বৃহত্তর ইসরাইল গঠনের পুরনো নীল-নকশা বাস্তবায়নের পূর্ব প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ।  আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় আলকায়দা, দায়েশ ইত্যাদি জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রামের ধুয়ো তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অহরহ ড্রোন ও বিমান হামলা এই পূর্ব-প্রস্তুতিরই কিছু অংশ। এইসব ড্রোন হামলায় বহু বেসামরিক নারী পুরুষ ও শিশু হতাহত হচ্ছে।

 সৌদি আরব, কাতার, আরব আমিরাত, তুরস্ক এবং এদের সমর্থিত ও মদদপুষ্ট সালাফি তাকফিরি ওয়াহাবি জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যেমন: আলকায়দা,তালিবান,আই.এস (দায়েশ),জাবহতুন নুসরা, বোকো হারাম, তাহরিক-ই তালিবান পাকিস্তান ইত্যাদি মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ইসলাম ও মুসলমানদের মহাশত্রু মার্কিন সরকার, পাশ্চাত্য ও ইসরাইলের পাকানো সেই বৃহত্তর ইসরাইল গড়ার মহা-ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের কাজ করছে।

 এটা স্পষ্ট যে, সৌদি–কাতার-আমিরাত-তুরস্ক কর্তৃক ইরাকে আইএস (দায়েশ) সমস্যার সৃষ্টি, সিরিয়ায় জাবহাতুন নুসরা,আহরারুশ শাম,আলকায়দা,দায়েশ (আইএস) প্রভৃতি উগ্র, হিংস্র, চরম রক্তপিপাসু সালাফি তাকফিরি ওয়াহাবি জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে দিয়ে গোলযোগ, যুদ্ধ ও সংঘাত জিইয়ে রাখা, ন্যায্য গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামরত বাহরাইনের জনগণকে সৌদি সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দমিয়ে রাখা- এসবই বৃহত্তর ইসরাইল গড়ার ওই মহা-ষড়যন্ত্রেরই সহায়ক তৎপরতা। (অসমাপ্ত) #

পার্সটুডে/মু.আ. হুসাইন/১৯