কেন বেশিরভাগ মার্কিনী ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিরোধী?
পার্সটুডে-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে যে দেশটির নাগরিকদের বেশিরভাগই ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে।
পার্সটুডে অনুসারে, আমেরিকার সিবিএস নিউজ নেটওয়ার্কের একটি নতুন জরিপ ইঙ্গিত দেয় যে এই দেশের বেশিরভাগ নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের যেকোনো সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করে। বেশিরভাগ মার্কিনী বিশ্বাস করেন যে ইরানের সাথে সম্ভাব্য মার্কিন সংঘাত দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল হবে। রোববার প্রকাশিত জরিপের ফলাফল দেখায় যে ৬৭ শতাংশ ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে এবং মাত্র ৩২ শতাংশ এই ধরনের আক্রমণকে সমর্থন করেছে।
এছাড়াও, কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপ অনুসারে, প্রায় ৭০ শতাংশ মার্কিন ভোটার বলেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের সাথে সামরিক সংঘাতে জড়ানো উচিত নয় এবং মাত্র ১৮ শতাংশ সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন। এই ব্যাপক বিরোধিতার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে, ৭৯ শতাংশ ডেমোক্র্যাট, ৮০ শতাংশ স্বাধীন এবং ৫৩ শতাংশ রিপাবলিকান এই বিষয়টির বিরোধিতা করেছেন। এই জরিপে,৭০ শতাংশ ভোটার জোর দিয়ে বলেছেন যে ট্রাম্পের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর মধ্যে একটি হল পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে আমেরিকার জনগণের সাধারণ ক্লান্তি। আফগানিস্তান এবং ইরাকে দুই দশকের সামরিক উপস্থিতির অভিজ্ঞতা, ভারী আর্থিক ব্যয় এবং মানুষের ক্ষয়ক্ষতি আমেরিকার জনগণের একটি বড় অংশকে যে কোনও নতুন সামরিক হস্তক্ষেপ সম্পর্কে সন্দিহান করে তুলেছে। অনেক নাগরিক বিশ্বাস করেন যে একটি নতুন যুদ্ধে প্রবেশ আমেরিকার নিরাপত্তা স্বার্থের নিশ্চয়তা তো দেবেই না বরং দেশটিকে অস্থিতিশীলতা এবং অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের একটি নতুন চক্রের মধ্যেও নিমজ্জিত করতে পারে। এই উদ্বেগ জরিপেও প্রতিফলিত হয়েছে,যা দেখায় যে মানুষ পছন্দ করে যে আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতি উত্তেজনা হ্রাস এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে মনোনিবেশ করার দিকে অগ্রসর হোক।
আরেকটি কারণ হল ইরানের সাথে সামরিক সংঘাতের আঞ্চলিক এবং বিশ্বব্যাপী পরিণতি সম্পর্কে উদ্বেগ। প্রকাশিত জরিপে,অনেক উত্তরদাতা বলেছেন যে সামরিক পদক্ষেপ পশ্চিম এশিয়ায় আরও বিস্তৃত যুদ্ধের দিকে পরিচালিত করতে পারে এবং বিশ্ব নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। প্রতিবেদনগুলো দেখায় যে আমেরিকার জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিশ্বাস করে যে সামরিক পদক্ষেপ আমেরিকার নিরাপত্তা তো বৃদ্ধি করবেই না,বরং দেশটিকে আরও বড় ঝুঁকির মুখেও ফেলতে পারে। এই উদ্বেগ ইরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন বিমান হামলার প্রতি জনগণের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতেও প্রতিফলিত হয়েছে, অপারেশন মিডনাইট হ্যামার যা মিডিয়াতে হ্যামার স্ট্রাইকস নামে পরিচিত যেখানে অনেক মার্কিনী বলেছেন যে এই পদক্ষেপগুলো আমেরিকাকে কম নিরাপদ করে তুলেছে।
অন্যদিকে,দলীয় বিভাজনও একটি ভূমিকা পালন করেছে। যদিও বেশিরভাগ ডেমোক্র্যাট এবং স্বাধীনরা সামরিক পদক্ষেপের দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করে, এমনকি রিপাবলিকানদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন। এটি দেখায় যে ইরানের সাথে যুদ্ধের বিরোধিতা কেবল একটি পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান নয়,বরং এটি একটি জাতীয় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক রিপাবলিকান ভোটারও বিশ্বাস করেন যে একটি নতুন যুদ্ধে প্রবেশ করা দেশের জন্য ভারী রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি বয়ে আনতে পারে।
এছাড়াও,আমেরিকার জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সামরিক সমাধানের কার্যকারিতা সম্পর্কে সন্দিহান। অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে সামরিক আক্রমণ অগত্যা সরকারের আচরণে পরিবর্তন বা রাজনৈতিক অবস্থার উন্নতির দিকে পরিচালিত করে না। ইরানের ক্ষেত্রে, অনেক নাগরিক দাবি করেন যে কূটনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা বা আলোচনা সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি জরিপে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, যেখানে বেশিরভাগ মানুষই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলা এবং বেসামরিক উপায় ব্যবহার করাকে পছন্দ করেছেন।
পরিশেষে, পররাষ্ট্র নীতিতে তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্তের পরিণতি সম্পর্কে অবিশ্বাসও জনসাধারণের বিরোধিতার অন্যতম কারণ। আমেরিকার জনগণের একটি অংশ বিশ্বাস করে যে যুদ্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্তগুলো সতর্কতা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি বিবেচনা করে নেওয়া উচিত। জরিপগুলো দেখায় যে অনেক ভোটার মনে করেন যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ সমাধানের পরিবর্তে একটি নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে,ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের প্রতি আমেরিকানদের বেশিরভাগের বিরোধিতা ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ, অর্থনৈতিক ব্যয়, রাজনৈতিক বিভাজন এবং সামরিক সমাধানের কার্যকারিতা সম্পর্কে সংশয়বাদের উপর ভিত্তি করে। একসাথে,এই কারণগুলো মার্কিন জনমতের একটি স্পষ্ট চিত্র প্রদান করে। এমন একটি সমাজ যা আগের চেয়েও বেশি যুদ্ধ এড়াতে এবং কূটনৈতিক সমাধানের উপর মনোনিবেশ করতে চায়।
শেষ বিষয়টি হল ইরানে আক্রমণের বিষয়টি থেকে পিছু হটার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অজুহাত। যদিও তিনি দাবি করেছেন যে তিনি নিজেই ইরানে আক্রমণ না করার জন্য নিজেকে রাজি করিয়েছিলেন,একটি মার্কিন মিডিয়া আউটলেট অন্যান্য কারণও তুলে ধরেছে। অ্যাক্সিওস,আমেরিকার কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে স্বীকার করেছে যে, ট্রাম্পের ইরান আক্রমণ না করার সিদ্ধান্তটি এই অঞ্চলে সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্রের অভাব এবং হোয়াইট হাউসের মিত্রদের সহঅঞ্চল এবং এর দেশগুলোর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য যেকোনো মার্কিন সামরিক অভিযানের ধ্বংসাত্মক পরিণতি সম্পর্কে মিত্রদের সতর্কীকরণের কারণে নেওয়া হয়েছিল। ইরান আক্রমণের অকার্যকরতা এই বিকল্প থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার আরেকটি কারণ ছিল। অ্যাক্সিওস নেতানিয়াহুর উপদেষ্টার উদ্ধৃতি দিয়ে স্বীকার করেছে যে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বলেছিলেন যে (যেকোনো মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে) ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে ইসরায়েল নিজেকে রক্ষা করতে প্রস্তুত নয়। পরিশেষে,এটা বলা উচিত যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জনসমর্থন এবং ইরানি সেনাবাহিনীর দাঁতভাঙা জবাব দেয়ার হুমকি ট্রাম্পকে ইরানে আক্রমণ থেকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে।
পার্সটুডে/এমবিএ/১৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।