জুন ০৩, ২০২৩ ১৮:৫৭ Asia/Dhaka

সন্তানের অধিকারী হওয়া মানুষের কাছে অত্যন্ত সুখ ও সৌভাগ্যের বিষয়। সন্তান বাবা-মায়ের স্মৃতি ও উত্তরাধিকার বহন করে।

নারী ও পুরুষের বিয়ের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হল বংশধর রেখে যাওয়া তথা মানব প্রজন্ম অব্যাহত রাখা। কিন্তু পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে অনেক মুসলিম পরিবার বা দম্পতি এখন সন্তান নেয়ার বিষয়ে অনীহা দেখাচ্ছেন। আবার অনেকে সন্তান নিতে চাইলেও কেবল এক সন্তান নিতে চান এবং একের বেশি সন্তান নেয়াকে অর্থনৈতিক দিকসহ নানা দিক থেকে ঝামেলার বিষয় বলে মনে করেন। ফলে দেশগুলোর জনসংখ্যা নানা ধরনের সংকট ও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। অথচ প্রকৃতির অন্য কিছুর মধ্যে যেমন গাছপালা ও পশুপাখির মধ্যে জনসংখ্যাগত এ ধরনের সমস্যা নেই। বাস্তবে দেখা গেছে যারা সন্তানহীন তাদের তুলনায় সন্তানের অধিকারী দম্পতিরা বেশি সুখী এবং যাদের সন্তান সংখ্যা বেশি তারা এক সন্তানের অধিকারী পরিবারের চেয়ে বেশি সুখী।

পবিত্র ইসলাম ধর্ম বেশি সন্তান নিতে মুসলমানদের উৎসাহ দেয়। মহানবী (সা) বলেছেন, হে নারী ও পুরুষেরা! তোমরা বিয়ে কর ও বংশধর বা সন্তানের অধিকারী হয়ে জনসংখ্যা বাড়াও! কিয়ামতের দিন আমি অন্যান্য উম্মতের সামনে আমার উম্মতের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গৌরব করব, এমনকি গর্ভে মরে যাওয়া সন্তানের সংখ্যা যোগ করে হলেও! 

ইসলামী বর্ণনায় সন্তানকে বাবা মায়ের হৃদয়ের ধন বা ফল, বেহেশতি সুগন্ধি ফুল, জীবনের ফসল ও জীবন ইত্যাদি নামে উল্লেখ করা হয়েছে। সন্তানের অধিকারী হলে মানুষ মানসিক ও আত্মিক দিক থেকে প্রশান্তি অনুভব করে এবং মানসিক অস্থিরতা ও হতাশা থেকে মুক্তি পায়। সন্তান থাকলে পারিবারিক বন্ধনও বেশি সুদৃঢ় হয়। সন্তান-সন্ততি ও তাদের ভরণ-পোষণ নিয়ে মানুষ যখন ব্যস্ত থাকে তখন তারা জীবনের ছোটখাটো অনেক সমস্যা ও সংকটের কথা ভুলে যায় বা সেসব সংকট তাদেরকে দুর্বল করে না। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তানের বাবা-মা হওয়া একটি পবিত্র ও বরকতময় বিষয়।

আর্থিক দৈন্যতার ভয় করে কম সন্তান নেয়া বা কেবল এক সন্তান নেয়া অত্যন্ত অযৌক্তিক। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেন, এমন কোনো প্রাণী বা জীব নেই যার রিজিকের ব্যবস্থা মহান আল্লাহ করেন না। (সুরা হুদ-৬) সুরা আনআমের ১৫১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, তোমরা দারিদ্রের ভয়ে সন্তানদের হত্যা করো না। তোমাদেরকে ও তাদেরকে আমিই রিজিক দিয়ে থাকি।–এ থেকে স্পষ্ট মহান আল্লাহই সব মানুষ ও জীবের রিজিক সরবরাহের গ্যারান্টি দিয়েছেন।

পবিত্র কুরআন সন্তান গ্রহণকে উৎসাহ দিয়ে বলেছে, সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য। ‘স্থায়ী সৎকর্ম’ তোমার রবের কাছে পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য শ্রেষ্ঠ এবং আশান্বিত হওয়ার জন্যও সর্বোৎকৃষ্ট। (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৪৬) 

সন্তান-সন্ততি পরিবারে বয়ে আনে আনন্দ ও প্রশান্তি। মার্কিন গবেষক ব্রিগহাম ইয়ং বিশ্বের ৮৬টি দেশের দুই লাখ পরিবারের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখেছেন যে সন্তানের অধিকারী হওয়ার পর বাবা-মায়েদের উচ্চ-রক্তচাপ কমে গেছে এবং তাদের মধ্যে কোনো কিছু শেখার আগ্রহ বেড়ে যায়। এ ছাড়াও সন্তানের অধিকারী হওয়ার পর বুদ্ধিবৃত্তির ব্যবহার বাড়ে ও বাড়ে আত্মবিশ্বাস এবং ছোটখাটো কাজেও মনোযোগ বা দক্ষতা বাড়ে। বাবা-মা হওয়ার পর তারা নানা ধরনের সৌন্দর্যকে আগের চেয়েও বেশি উপলব্ধি করেন বলে এই মার্কিন গবেষকের গবেষণায় দেখা গেছে।

সন্তান-সন্ততি পরিবারে সব ধরনের বরকত নিয়ে আনে। যেমন, সন্তানের অধিকারী হওয়ার পর প্রাচুর্য, সৌভাগ্য, মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা এবং সমৃদ্ধির মত বিষয়গুলো বাড়ে। জীবনকে উৎসাহ ও উদ্দীপনায় ভরিয়ে দেয় সন্তানসন্ততির আগমন। মুসলিম পরিবারে সন্তান সন্ততির আগমন সমাজবদ্ধ জীবনের আনন্দ ও সুমিষ্টতা বাড়িয়ে দেয় বলে তারা মনে করেন।

সুশিক্ষিত নতুন প্রজন্ম বা জনশক্তির অভাবে একটি জাতি ধ্বংসের শিকার হতে পারে। তাই সুশিক্ষিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য বিয়ের সংস্কৃতির প্রসারের পাশাপাশি সন্তানের সুশিক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। সুশিক্ষিত সন্তান গড়ে তোলার কারণে মহান আল্লাহ সেই সন্তানের বাবা-মায়ের নানা দোষ-ত্রুটি ও পাপ ক্ষমা করে দেন। এ ছাড়াও সন্তান পরিবারের জন্য নানা ধরনের বরকত নিয়ে আসে। সন্তানদের জন্য বাবা-মা হচ্ছেন প্রথম শিক্ষক ও পরিবার হচ্ছে প্রথম বিদ্যালয়। তবে বাবা-মা যদি সৎ ও সুশিক্ষিত হন তাহলে তাদের সন্তানদের সৎ ও সুশিক্ষিত করা সহজ হয়। সন্তানের প্রতিপালন মানে কেবল তার বৈষয়িক চাহিদার যোগান দেয়া নয়। সন্তানের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক চাহিদার যোগান দেয়াও তাদের জরুরি কর্তব্য। এ জন্য তারা সন্তানকে নানা ধরনের প্রশিক্ষণমূলক ক্লাসে ভর্তি করে দিতে পারেন।  সন্তানরা যদি সুশিক্ষিত না হয় তাহলে সে সমাজে দেখা দেবে দুর্নীতি ও নানা ধরনের সহিংসতা।  

সুস্থ সন্তান লাভের জন্য বাবা-মায়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা জরুরি। অনেক দেশেই দেখা যায় পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বিয়ের প্রচলন রয়েছে। পরিচিত ও একই সংস্কৃতির অনুসারী হওয়ার সুবিধা নিতেই এ ধরনের বিয়ের রীতি চালু হয়েছিল। কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন এ ধরনের বিয়ের ফলে সন্তানদের মধ্যে বংশগতির বা জেনেটিক নানা রোগ ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের মধ্যে প্রায় ছয় হাজার জেনিটিক রোগ দেখা যায়। পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের ফলে যেসব সন্তান জন্ম নেয় তাদের মধ্যে এ ধরনের রোগ অন্যদের তুলনায় দশগুণ বেশি দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন পরিবারের আত্মীয় স্বজনের মধ্যে বিয়ের প্রথা রোধ করা সম্ভব হলে নানা ধরনের প্রতিবন্ধী বা বিকলাঙ্গ সন্তানের জন্ম নেয়ার সংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগের চেয়েও কমিয়ে আনা সম্ভব। #

পার্সটুডে/এমএএইচ/০৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ