সেপ্টেম্বর ০৫, ২০২১ ১৬:৩৯ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা ইরাকের পক্ষে তৎকালীন দুই পরাশক্তির শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণের প্রেক্ষাপটে ইরানের রণকৌশল পরিবর্তন আনা প্রসঙ্গে আলোচনা করব।

১৯৮৬ সাল নাগাদ বেশ কয়েকটি অভিযানে জয়ী হয়ে ইরান রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে যুদ্ধের ভারসাম্যকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে ইরাকের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকরা। এ অবস্থায় নিজের সমর্থকদের তুষ্ট করতে ইরাক সরকার ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে তেহরানকে কাবু করার ফন্দি করে।  সাদ্দাম সরকার মার্কিন, রুশ ও ইউরোপীয় অস্ত্র দিয়ে পারস্য উপসাগরে ইরানের তেল ট্যাংকারগুলোর পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা চালায়। এ কাজে ইরাকের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব শক্তিগুলোকে পারস্য উপসাগরে টেনে এনে নিজের ওপর থেকে চাপ প্রশমন করা।            

পারস্য  উপসাগরে মার্কিন ও রুশ নৌজাহাজের উপস্থিতি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাকের অবস্থানকে শক্তিশালী করে। এ সম্পর্কে জাপানের কিজায়ি পত্রিকা এক বিশ্লেষণে জানায়: “বিগত মাসগুলোতে ইরান শক্তিশালী অবস্থানে থেকে ইরাকের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো দুই পরাশক্তি এ যুদ্ধের ব্যাপারে নিজেদেরকে নিরপেক্ষ ঘোষণা করলেও পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এসব বিশ্বশক্তি ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে চায়।” এ ব্যাপারে জাপানি পত্রিকাটি সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল কাউন্সিলের একজন প্রভাবশালী সদস্যের নেতৃত্বে দেশটির একটি শক্তিশালী প্রতিনিধিদলের বাগদাদ সফরের কথা উল্লেখ করে। ওই সফরে ইরাকের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫ বছরব্যাপী সহযোগিতা চুক্তি নবায়ন হয়।

পাশাপাশি পত্রিকাটি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের বিশেষ প্রতিনিধি রিচার্ড মরফির বাগদাদ সফরের কথাও উল্লেখ করে। এ অবস্থায় যুদ্ধের ময়দানের বিজয়কে ব্যবহার করে ইরানের পক্ষে তার রাজনৈতিক দাবি আদায় করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।  ইরানের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে যেখানে ইরানের দাবি মেনে নেয়ার কথা ছিল সেখানে উল্টো বিশ্ব শক্তিগুলো ইরানের জন্য নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি করতে থাকে।  ইরানকে নানারকম সীমাবদ্ধতা ও বিপদের সম্মুখীন করা হয়।  ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের একটি সম্পাদকীয় কলামে মন্তব্য করা হয়: “ইরান যুদ্ধের ময়দানে যত বেশি সাফল্য লাভ করছে আন্তর্জাতক সমাজ দেশটিকে ততবেশি কোণঠাসা করে ফেলছে। এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো- আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরের ঘোরতর শত্রু  হওয়া সত্ত্বেও ইরাককে সাহায্য করার ক্ষেত্রে দেশগুলো পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। ”

কাজেই দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের ময়দানে ইরানের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় তেহরানের ওপর উল্টো চাপ বেড়ে গেছে। লন্ডন থেকে প্রকাশিত টাইমস ম্যাগাজিন এ সময় এক বিশ্লেষণে জানায়: “ইরান যথার্থভাবেই মনে করছে, তেলসমৃদ্ধ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর জন্য আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এ অঞ্চলে সেনা সমাবেশ ঘটাচ্ছে। ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধ করার যে কথা তারা বলছে তা এখানে অজুহাত মাত্র। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন ও মস্কো উভয়ে ইরাক ও আরব বিশ্বের অনুকূলে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে।” প্রকৃতপক্ষে ইরান ওই যুদ্ধে শুধু ইরাকের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি বরং তাকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দুই পরাশক্তিকেও মোকাবিলা করতে হয়েছে।

কারবালা-৫ অভিযানে ইরান নিজের সমরশক্তি প্রদর্শনের পর ইরাকের সাদ্দাম সরকার তার রণকৌশলে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেয়। যুদ্ধক্ষেত্রে হতে ২০ থেকে ৩০ ব্রিগেড ইরাকি সেনা প্রত্যাহার করে তাদেরকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ইরাকের কুখ্যাত প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের তত্ত্বাবধানে এসব ব্রিগেড ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক যুদ্ধের কৌশল রপ্ত করে। এদিকে ইরানকেও পরিস্থিতি বুঝে সমর কৌশলে পরিবর্তন আনতে হয়। কারবালা-৫ ও কারবালা-৮ অভিযান পর্যালোচনা করে ইরানি সেনা কমান্ডাররা এই সিদ্ধান্ত পৌঁছেন যে, দক্ষিণ ফ্রন্টে আর কোনো অভিযান চালিয়ে তেমন সাফল্য পাওয়া যাবে না।

ইরানের সেনা কমান্ডারদের পরামর্শে দক্ষিণাঞ্চল থেকে যুদ্ধকে মধ্যাঞ্চল অর্থাৎ ইরানের পশ্চিম সীমান্তে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।  ১৯৮৭ সালের এপ্রিল মাসে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি পশ্চিম ফ্রন্টে কারবালা-১০ ও কারবালা-১৪ নামের অভিযান চালায়। অভিযানে সম্মুখ যুদ্ধ যেমন চলে তেমনি ইরাকের আগ্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধও চালানো হয়। ইরাকের সরকার বিরোধী বিদ্রোহী কুর্দি যোদ্ধাদের সহযোগিতায় দেশটির অভ্যন্তরে গেরিলা অভিযান চালায় ইরান। ইরাকের সুলাইমানি শহরের উত্তরে ইয়াগসামার নামক এলাকায় ‘ফাতহ-৫’ নামের গেরিলা অভিযান চালানো হয়। এটি ছিল কারবালা-১০ নামক বৃহৎ  অভিযানের একটি অংশ। ওই গেরিলা বাহিনীর লক্ষ্য ছিল ইরাকের দু’টি সেনা ঘাঁটি ধ্বংস করা এবং দেশটির একটি বিশাল অংশকে ইরাকের কুর্দি যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ /০৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।