ক্ষমতার অংশীদারিত্ব:
ভারতে এই প্রথম কেন্দ্রীয় সরকার ও ১৫টি রাজ্যে একজনও মুসলিম মন্ত্রী নেই
-
নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রীসভা
সম্প্রতি ভারতের ৫টি রাজ্যে নির্বাচনের পর সরকার গঠনের যে প্রক্রিয়া চলছে তাতে মুসলিমদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে না। কংগ্রেসশাসিত তেলেঙ্গানায় মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ হয়েছে। কিন্তু সেখানে একজন মুসলিমকেও মন্ত্রী করেনি কংগ্রেস। বিজেপিশাসিত মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান এবং ছত্তিশগড়েও মুসলমানদের মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। কারণ, তিনটি রাজ্যেই বিজেপির প্রতীকে জেতা কোনও মুসলিম বিধায়ক নেই।
এই প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় সরকারে একজনও মুসলিম মন্ত্রী নেই। সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের স্মৃতি ইরানির কাছে। বর্তমানে, দেশে ২৮ জন গভর্নর নিযুক্ত রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র দুই জন মুসলিম। সুপ্রিম কোর্টে বর্তমানে মোট ৩৪ জন বিচারপতি রয়েছেন, যার মধ্যে একজন বিচারপতি মুসলিম সম্প্রদায়ের। দেশে ২৮টি রাজ্যের ১৫টিতে প্রথমবারের মতো একজনও মুসলিম মন্ত্রী থাকবেন না। গুজরাট, অসম, হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, তেলেঙ্গানা এবং উত্তর-পূর্বের ছয়টি রাজ্যেও চিত্রটি সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয়ে গেছে। এই রাজ্যগুলোতে একজনও মুসলিম মুখ্যমন্ত্রী নেই। অসমে এক কোটিরও বেশি মুসলমান, যেখানে তেলেঙ্গানায় মুসলমানের জনসংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখ। অসমে ১.০৬ কোটি, গুজরাটে ৫৮ লাখ, তেলেঙ্গানায় ৪৫ লাখ, হরিয়ানায় ১৭ লাখ এবং উত্তরাখণ্ডে ১৪ লাখ মুসলিম হলেও এসব রাজ্যে মুসলিম মন্ত্রী নেই।
রাজস্থান, মধ্য প্রদেশ এবং ছত্তিশগড়ের মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ স্থগিত রয়েছে। কিন্তু এসব রাজ্যে কোনো মুসলিমের মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। এ জন্য দুটি প্রধান কারণ হল- বিজেপিশাসিত মধ্য প্রদেশ, ছত্তিশগড় এবং রাজস্থানে বিজেপির একজনও মুসলিম বিধায়ক নেই। এসব রাজ্যের নির্বাচনে দলটি একজন মুসলিমকেও টিকিট দেয়নি। এই রাজ্যগুলোতে বিধান পরিষদের কোনও ব্যবস্থা নেই। এমন পরিস্থিতিতে উত্তর প্রদেশের মতো এখানে কোনো মুসলমানকে মন্ত্রী বানানো সহজ নয়। উত্তর প্রদেশে কোনো মুসলিম বিধায়ক না থাকা সত্ত্বেও বিজেপি দানিশ আজাদ আনসারিকে মন্ত্রী বানিয়েছিল। বিধান পরিষদ কোটা থেকে তাকে বিধানসভায় পাঠানো হয়েছিল।
রাজস্থান, মধ্য প্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে সম্প্রতি বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু এসব রাজ্যে কোনো মুসলিমের মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। রাজস্থানে ৬২ লাখের বেশি মুসলিম। এখানে বিজেপির একজনও মুসলিম বিধায়ক নেই। মধ্য প্রদেশে ৪৮ লাখ মুসলিম। এখানে বিজেপির একজনও মুসলিম বিধায়ক নেই। ছত্তিশগড়ে ৫ লাখ মুসলিম। কিন্তু এখানেও বিজেপির কোনো মুসলিম বিধায়ক নেই। এভাবে এসব রাজ্যে মুসলিম বিধায়ক না থাকার ফলে কোনো মুসলিমের মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
মুখ্যমন্ত্রীর কথা বললে, বর্তমানে দেশের কোনো রাজ্যে একজনও মুসলিম মুখ্যমন্ত্রী নেই। দেশের ২৮টি রাজ্য এবং দু'টি কেন্দ্রীয় সরকারশাসিত অঞ্চলে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন। এর মধ্যে ২৫ জন মুখ্যমন্ত্রী হিন্দু, দু'জন খ্রিস্টান এবং একজন বৌদ্ধ ও একজন শিখ সম্প্রদায়ের। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন নিজেকে কোনো ধর্মের লোক বলে মনে করেন না। এক বিবৃতিতে তিনি নিজেকে নাস্তিক বলে উল্লেখ করেছেন। যদিও যে সম্প্রদায় থেকে স্ট্যালিন এসেছেন তাকে ভারতে হিন্দু ধর্ম হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে।
দেশে ১৪ শতাংশ মুসলিম কিন্তু কোনো রাজ্যে একজনও মুসলিম মুখ্যমন্ত্রী নেই। এর বিপরীতে দেশে ১.৭ শিখ সম্প্রদায়ের বাস হলেও পাঞ্জাবে তাদের মুখ্যমন্ত্রী আছে। ০.৭ শতাংশ বৌদ্ধ সম্প্রদায় থেকে আসা প্রেম সিং তামাং সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী। ভারতে ২.৩ শতাংশ খ্রিস্টানদের বাস। মেঘালয় এবং মিজোরামে রয়েছেন খ্রিস্টান মুখ্যমন্ত্রী। জম্মু-কাশ্মীরে আগে মুসলিম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকে সেখানে নির্বাচন হয়নি। বর্তমানে সেটি কেন্দ্রীয় সরকারের অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট সেখানে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্বাচন করার নির্দেশ দিয়েছে। যেভাবে নয়া ডিলিমিটেশন হয়েছে তাতে সেখানে মুসলিম মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসাদ মালিকের মতে, মুসলিমদের ক্ষমতায় অংশীদারিত্ব পাওয়ার বিষয়ে কোনো আইন নেই। আগের সরকারের ঐতিহ্য অনুযায়ী মুসলিম নেতারা রাষ্ট্রপতি বা উপরাষ্ট্রপতি বা অন্য কোনও বড় পদ পেতেন, যার কারণে তারা বড় সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ করতেন। বর্তমান সরকার ঐতিহ্য না মানলে এ বিষয়ে কিছু বলা যায় না।
বিধানসভা এবং লোকসভা আসনের পুনর্বিন্যাসের ফলে মুসলিম অধ্যুষিত অনেক আসনেও মুসলিমরা বিধায়ক ও এমপি হতে পারছেন না। যার ফলে সরকারের অংশীদারিত্বে তাদের গণিত নষ্ট হয়ে যায়। বিহারের গোপালগঞ্জ, উত্তর প্রদেশের নাগিনা ও বুলন্দশহর, গুজরাটের কচ্ছ এবং আহমেদাবাদ পশ্চিম এমন লোকসভার আসন যেখানে মুসলিমদের জনসংখ্যা দলিতদের চেয়ে বেশি। কিন্তু এই আসনগুলো ২০০৯ সালে দলিতদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
স্বাধীনতার পরে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ৩/৪ জন মুসলিম মন্ত্রী ছিলেন, যারা বড় দায়িত্বও পেয়েছিলেন। নেহরুর আমলে জাকির হুসেনকে উপরাষ্ট্রপতি করা হয়েছিল। নেহরুর মৃত্যুর পর জাকির হুসেন ভারতের রাষ্ট্রপতিও হন। ইন্দিরা গান্ধীর আমলে বরকতুল্লাহ খান রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী এবং আবদুল গফুরকে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী করা হয়। বিজেপির অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারেও মুসলিমদের অংশীদারিত্ব দেওয়া হয়েছিল। অটল সরকার ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য এপিজে আবদুল কালাম আজাদকে মনোনীত করেছিল।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফয়সাল দেবজির মতে, ১৯৯০ সালের রাজনৈতিক ঘটনাক্রম মুসলমানদের ক্ষমতা হ্রাস করেছে। ১৯৯০ সালের পর, মুসলমানরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, অন্যদিকে হিন্দুরা ধীরে ধীরে এক দলে একত্রিত হয়েছে।#
পার্সটুডে/এমএএইচ/এমআরএ/১৭