ভারতীয় সেনারা মালদ্বীপে থাকতে পারবে না: প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু
ভারতের সঙ্গে বিবাদের মধ্যে চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে মালদ্বীপ: শশী থারুর
চীনের সঙ্গে মালদ্বীপের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার মধ্যে ভারতের সঙ্গে বিরোধ বৃদ্ধি পেয়েছে। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুইজ্জু ভারতকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করতে বলেছেন। আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে ভারতীয় সেনাকে মালদ্বীপ ছাড়তে বলা হয়েছে। জানা গেছে, মালদ্বীপে বর্তমানে মাত্র ৮৮ জন সামরিক কর্মী রয়েছেন।
ওই ইস্যুতে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা শশী থারুর এমপি বলেছেন, চীনের সাথে মালদ্বীপের ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে ভারতের অবশ্যই সতর্ক হওয়া উচিত। গতকাল (রোববার) শশী থারুর এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময়ে বলেন, ভারত সরকারের উচিত চীনের সাথে মালদ্বীপের ঘনিষ্ঠতার বিপদ সম্পর্কে সচেতন হওয়া। কংগ্রেস নেতা শশী থারুর বলেন, চীন ভারতের সীমান্তে তার প্রভাব বাড়াতে চাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর লাক্ষাদ্বীপ সফরের পর কূটনৈতিক বিতর্ক প্রসঙ্গে শশী থারুর বলেন, চীনের সঙ্গে মালদ্বীপ সরকারের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার দিকে আমাদের নজর রাখতে হবে। তিনি বলেন, ওরা (চীন) আমাদের সব প্রতিবেশী দেশে দ্রুত প্রভাব বিস্তার করছে। আমাদের (ভারত) অবশ্যই সতর্ক হওয়া উচিত এবং আমাদের সরকারের সেই হুমকিগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত।
কংগ্রেস আরও নেতা বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাম্প্রতিক বিতর্ক দুর্ভাগ্যজনক, আমি মনে করি না যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পররাষ্ট্র নীতি পরিচালনা করা উচিত। শশী থারুর বলেন, এটা সত্য যে মালদ্বীপে ১০০ শতাংশ মুসলিম রয়েছে, কিন্তু সত্য হল সেখানে পাকিস্তানের কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব নেই। বরং, ঐতিহাসিকভাবে আমাদের প্রভাব অনেক বেশি। ঐতিহাসিকভাবে ছোট প্রতিবেশীদের সবসময় বড় প্রতিবেশীদের সাথে সমস্যা ছিল। তারা আমাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে উদাসীন এবং ভারতের গুরুত্ব সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতে পারে না। আমরা অত্যন্ত পরিপক্বতার সাথে আমাদের নীতিগুলো পরিচালনা করছি। সেখানে বর্তমান নেতা হেরে গেলে আমাদের খুব বেশি খুশি হওয়া উচিত নয় এবং আবার জয়ী হলে আমাদের খুব বেশি নিন্দা করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেছেন কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা শশী থারুর এমপি।
এদিকে, আজ (সোমবার)মালদ্বীপ ইস্যুতে শিব-সেনা (ইউবিটি) নেতা সঞ্জয় রাউত এমপি বিজেপিকে টার্গেট করে বলেছেন, বিজেপি সরকার মালদ্বীপের সাথে ঝগড়া করছে যাতে লোকসভা নির্বাচনে তার সুবিধা নেওয়া যায়। রাউত এমনও বলেছেন যে এবার পাকিস্তানের সাথে কোন যুদ্ধ হয়নি, তাই মালদ্বীপের সাথে ঝগড়া করে তার অভাব পূরণ করা হচ্ছে। কয়েক মাসের মধ্যেই দেশে লোকসভা নির্বাচন হতে চলেছে।
গণমাধ্যমের সাথে কথা বলার সময় শিবসেনা (ইউবিটি) নেতা সঞ্জয় রাউত এমপিকে ভারত-মালদ্বীপ বিবাদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, 'এখন যেহেতু পাকিস্তানের সাথে লড়াই নেই, সেজন্য বিজেপি নির্বাচনের আগে মালদ্বীপের সাথে বিবাদ করতে চায়। যাদের সেনাবাহিনী নেই তাদের সঙ্গে আমরা লড়াই করছি, যাতে নির্বাচনে সুবিধা নেওয়া যায়।
প্রসঙ্গত, ভারত ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্পর্কে মালদ্বীপের নেতাদের বিতর্কিত মন্তব্যের পর দু’দেশের সম্পর্ক বেশ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রীর মোদীর সাম্প্রতিক লাক্ষাদ্বীপ সফরের পরেই ভারত এবং প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেন মালদ্বীপের তিন মন্ত্রী এবং বেশ কিছু রাজনীতিক। বিতর্ক এবং ঘরে-বাইরে চাপের মধ্যে তিন মন্ত্রীকেই সাসপেন্ড করেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু। তার পরেও অবশ্য দু’দেশের সম্পর্ক খুব একটা সহজ হয়নি। সমাজ-মাধ্যমে ভারতীয় নেটাগরিকদের ‘বয়কট মালদ্বীপ’-এর জেরে আগে থেকে মালদ্বীপে ঘুরতে যাওয়ার বিমান, হোটেলে টিকিট বুক করে রাখার পরেও তা বাতিল করেন একের পর এক ভারতীয়। সেই প্রবণতা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
ওই আবহে এবার মালদ্বীপ থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য ভারতকে কার্যত আল্টিমেটাম দিয়েছে সে দেশের সরকার। পাল্টা জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মালদ্বীপে বিমান চলাচল করতে পারে এমন পরিস্থিতি বজায় রাখতে পারস্পরিক সমাধান-সূত্র খোঁজার চেষ্টা করছে ভারত।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মালদ্বীপের মানুষের কাছে মানবিক সাহায্য পৌঁছে দিতে ভারতীয় বিমানগুলোর চলাচল জারি রাখা জরুরি। এবং এই কাজের পরিবেশ বজায় রাখতে উভয়পক্ষই একটি সমাধানসূত্রে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে। মালদ্বীপ এবং ভারতের সম্মতিতে একটি নির্দিষ্ট দিন বেছে নিয়ে পরবর্তী আলোচনা করা হবে বলেও জানানো হয়েছে ওই বিবৃতিতে।
প্রসঙ্গত, বিমান বাহিনীর কয়েকটি বিমান মালদ্বীপের প্রান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে ওষুধ এবং ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। মালদ্বীপ থেকে ভারতের সেনা সরানোর বিষয়ে নয়াদিল্লির সঙ্গে আলোচনা করতে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করে মালদ্বীপের মুহাম্মদ মুইজ্জুর সরকার। ওই বিষয়ে ভারতও সম্মতি জানিয়েছিল বলে জানা যায়। মালদ্বীপ সরকারের একটি সূত্রে প্রকাশ, সম্প্রতি ওই কমিটির দ্বাদশ বৈঠকে ১৫ মার্চের মধ্যে সেনা সরানোর জন্য ভারতকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুইজ্জুর সচিবালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা আবদুল্লাহ নাজিম ইব্রাহিম সে দেশের গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারতীয় সেনারা মালদ্বীপে থাকতে পারবে না। কারণ এটাই প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু এবং তার সরকারের সিদ্ধান্ত। জানা গেছে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এবং শিল্পক্ষেত্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল ভারতীয় সেনা। কিন্তু চলতি বিতর্কের আবহে মালদ্বীপের এই সময় বেঁধে দিয়ে সেনা সরাতে বলার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। #
এমএএইচ
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।