ট্রাম্প কেন এমন সব পদক্ষেপ নিচ্ছেন যা বারবার ব্যর্থ হয়েছে?
-
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প
পার্সটুডে- ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত বলে জানানোর মাত্র কয়েকদিন পরেই ইরানের অভ্যন্তরে বেসামরিক অবকাঠামোসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা চালানো হয়।
ইরানের প্রতিক্রিয়াও ছিল দ্রুত ও সরাসরি। বাহরাইন, কুয়েত এবং জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এই পুনরাবৃত্তিমূলক চক্র একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে আর তা হচ্ছে, বারবার ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও ট্রাম্প কেন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সমাধানের আশ্রয় নিতে থাকেন? এর উত্তর খুঁজতে হবে রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মানসিকতা এবং মার্কিন ক্ষমতার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে।
মূল সমস্যা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পররাষ্ট্রনীতিকে ভূ-রাজনৈতিক জটিল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে ক্ষমতার প্রদর্শনী হিসেবে দেখেন। তার মতে, প্রতিটি সংকটের শেষে একজন বিজয়ী এবং একজন পরাজিত থাকবে। তার ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় প্রোথিত এই দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সামরিক চাপকে রাজনৈতিক ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার একটি উপায় হিসেবে দেখতে পরিচালিত করেছে।
তবে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান গত চার দশকে বারবার দেখিয়েছে যে তারা এমন চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। চল্লিশ দিনের যুদ্ধ এবং তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির ক্ষেত্রে পূর্বে পরিলক্ষিত একই ফল দিয়েছে। সামরিক হামলাগুলো ইরানকে শুধু পিছু হটাতেই ব্যর্থ হয়নি, বরং দেশটির অভ্যন্তরীণ সংহতি, সামাজিক একাত্মতা এবং প্রতিরোধের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের ব্যর্থ নীতির পুনরাবৃত্তির আরেকটি কারণ হলো মার্কিন শক্তির প্রকৃত সীমাবদ্ধতা। ওয়াশিংটন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি, কিন্তু সামরিক শক্তির অর্থ এই নয় যে রাজনৈতিক ফলাফল চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ এবং এখন ইরানের সাথে সংঘাত এই সত্যকে আবারও উন্মোচিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্যবস্তুতে বোমা ফেলতে পারে, কিন্তু কোনো দেশের রাজনৈতিক ইচ্ছাকে ধ্বংস করতে পারে না। বিশেষ করে ইরানের ক্ষেত্রে তা প্রমাণিত হয়েছে।
এদিকে, ইরানের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল জ্বালানি সংকটপথ হিসেবে রয়ে গেছে। এই অঞ্চলে উত্তেজনার যেকোনো বৃদ্ধি তাৎক্ষণিকভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং এমনকি মার্কিন সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানকেও প্রভাবিত করবে। একারণেই অনেক মার্কিন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো নতুন সামরিক পদক্ষেপ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং মার্কিন নাগরিকদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে।
তবে, ট্রাম্প বারবার এই পথেই ফিরে আসেন, কারণ এর বিকল্পগুলোর জন্য তাকে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়। সামরিক চাপ ইরানের আচরণ পরিবর্তন করতে অক্ষম—এই সত্যটি মেনে নেওয়ার অর্থ হবে তার নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ভিত্তির ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়া। তাই, হোয়াইট হাউস তার ধারণাগুলো পুনর্বিবেচনা না করে, কখনও কখনও আরও তীব্রতার সাথে একই নীতির পুনরাবৃত্তি করার চেষ্টা করে।
কিন্তু মূল সমস্যা হলো, এই অঞ্চলের আজকের কৌশলগত পরিবেশ অতীতের চেয়ে ভিন্ন। সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোর পর, ইরান শুধু তার প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখেনি, বরং অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এমন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে যেখানে এটি নিছক প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানকে ছাড়িয়ে গেছে এবং সংকট ব্যবস্থাপনায় আরও বেশি উদ্যোগী হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি নতুন হামলা তেহরানের আচরণে কোনো পরিবর্তন আনবে না, বরং ওয়াশিংটনের ব্যয়ভারই বাড়িয়ে দেবে। এ কারণে, মূল প্রশ্নটি এখন আর এটা নয় যে ইরান কেন আত্মসমর্পণ করছে না; বরং প্রশ্নটি হলো, ট্রাম্প কেন এমন একটি কৌশল আঁকড়ে ধরে আছেন, যেটিকে মাঠপর্যায়ের প্রমাণ, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের একাংশ রাজনৈতিক মহলও ব্যর্থ বলে মনে করে। যতক্ষণ না এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হচ্ছে, ততক্ষণ হামলা, পাল্টা জবাব এবং সংকট বৃদ্ধির এই চক্র চলতেই থাকবে। এই চক্রটি কেবল শক্তির প্রতীকই নয়, বরং ইরানের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অচলাবস্থারই প্রতিফলন।#
পার্সটুডে/এমআরএইচ/১২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।