নভেম্বর ০৬, ২০২২ ২১:১৩ Asia/Dhaka

সুস্থ–স্বাভাবিক শিশু খানিকটা চঞ্চল হবেই। সুস্থ শিশু মানেই হাসিখুশি ও দুরন্তপনা। তবে অতিচঞ্চল শিশুর সমস্যাকে বলা হয় অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার (এডিএইচডি)। বাংলায় এ সমস্যাকে বলে অতিচঞ্চল অমনোযোগিতা।

যদি আপনার শিশু অতিচঞ্চল হয় এবং তার আচরণগত সমস্যা থাকে তখন সে এডিএইচডিতে আক্রান্ত বলেই ধরে নিতে হবে। আর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ শিশুটিকে ডায়াগনোসিস করে যদি নিশ্চিত হন যে এডিএইচডিতে আক্রান্ত তাহলে ওষুধসহ বিশেষ কিছু থেরাপি দিতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী। কোনো অবস্থাতে ঐ শিশুকে মারধর করা কিংবা বকাঝকা করা যাবে না। তো চলুন এ বিষয়ক মূল সাক্ষাৎকারে যাওয়া যাক।

শ্রোতা/পাঠকবন্ধুরা! স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান স্বাস্থ্যকথার আসরে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশীদ। আশা করি আপনারা সবাই ভালো আছেন সুস্থ আছেন। দেহের মতো মনেরও রোগ হয় এবং তা দেহের রোগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কখনও কখনও দেহের রোগের চেয়ে বেশি মারাত্মক হতে পারে। মনের বহু রকম রোগ আছে। আর সেই রোগ হতে পারে বড়দের শিশুদের সবার। আমরা আমাদের শিশু সন্তানের মনের রোগ নিয়ে এডিএইচডি নিয়ে আলোচনার দ্বিতীয় পর্বের আলোচনায় যাব। তার আগে বলে নিচ্ছি, সুস্থ–স্বাভাবিক শিশু খানিকটা চঞ্চল হবেই। সুস্থ শিশু মানেই হাসিখুশি ও দুরন্তপনা। তবে অতিচঞ্চল শিশুর সমস্যাকে বলা হয় অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার (এডিএইচডি)। বাংলায় এ সমস্যাকে বলে অতিচঞ্চল অমনোযোগিতা। এটি শিশুর একধরনের স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা। আর বিষয়টি নিয়ে আমরা বাবা মায়েরা খুবই দুঃশ্চিন্তায় থাকি যদি আমাদের শিশু অতি চঞ্চল ও অমনোযোগী হয়। তো চলুন আজ এ বিষয়ক আলোচনার দ্বিতীয় পর্বে যাওয়া যাক। আমাদের সঙ্গে আরও অতিথি হিসেবে আছেন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিস্টিউটের সাবেক বিভাগীয় প্রধান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা.তাজুল ইসলাম।

স্বাস্থ্যকথার আসরটির সাক্ষাৎকার গ্রহণ, উপস্থাপনা ও সম্পাদনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম রেডিও তেহরানের স্বাস্থ্যকথার আসরে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক তাজুল ইসলাম, প্রথম পর্বের আলোচনায়  শিশুর অতিরিক্ত চঞ্চলতা বা এডিএইচি কি এবং এর লক্ষণগুলো নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। আপনি খুব মেধাবী শিশু-কিশোরের কথা বলছিলেন সেই আলোচনার সূত্র ধরেই বলব- দেখু গেল কোনো বাচ্চা খুবই মেধাবী অথচ এত বেশি পরিমাণে চঞ্চল যে কোন কিছুতে স্থির থাকতে পারছে না। আজ এটা তো কাল সেটা, এখন একটি কাজ একটু পরেই তা ছেড়ে অন্যকাজ। চঞ্চলতার কারণে কোনো কিছুই শেষ করতে পারছে না। এটাও কি এডিএইচডির মধ্যে পড়ে?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: হ্যাঁ আপনি যেভাবে বললেন-এডিএইচডির বাচ্চাদের তাইই হয়ে থাকে। তারা মেধাবী হয়ে থাকে। তাদের মা –বাবাকে বলতে শোনা যায় আহারে আমার ছেলেটা কিংবা মেয়েটা মেধাবী ছিল, ওর মাথা ভালো ছিল একটু যদি মনোযোগ দিয়ে পড়ত বা পড়াতে পারতাম তাহলে খুব ভালো হতো। এ বিষয়ে একটি জিনিষ মনে রাখা ভালো। যদি এই এডিএইচডি শিশুকালে হয় সেটি কিন্তু কৈশর পর্যন্ত চলমান থাকতে পারে। তবে শৈশবের অবস্থাটা বেশি মারাত্মক। কারণ শিশুদের বিকাশ হবে শৈশবে। আর সেই শৈশবে যদি মানসিক বিকাশ, পেশী সঞ্চালন বিকাশ, সামাজিক বিকাশ, আবেগিয় বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ যদি না হয় অর্থাৎ এই এডিএইচডির কারণে সব ধরনের বিকাশ ব্যহত হচ্ছে। অতএব এডিএইচডি আক্রান্ত ঐ শিশু তো পরিপূর্ণভাবে, উৎপাদনশীল-মেধাবী নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠতে পারছে না। সেজন্যেই এটি অবশ্য শিশুর জন্য মারাত্মক সমস্যা।  অ্যাডোলেসন হলেও কিছু সমস্যা থাকে। কোনো শিশুর শিশু অবস্থায় হয় আবার কিছু কিছু শিশুর কৈশরেও হতে পারে। সেজন্য অ্যাডাল্টদের ক্ষেত্রেও এই ধরণের সমস্যা কিছু কিছু থেকে যেতে পারে।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম, ধরুন কোনো শিশু মানসিক রোগ- এডিএইচডিতে আক্রান্ত। তো করণীয় কী?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: দেখুন, এখানে করণীয় সম্পর্কে বলতে গেলে অবশ্যই এডিএইচডির আক্রান্ত বাচ্চাদের চিকিৎসায় ওষুধ প্রয়োজন হবে। এই  রোগটি কিন্তু এমনতেই হয় না। আমরা এজন্য বলি মাইক্রো লেভেলে কিছু ডিফিসিয়েন্সি হয়। যারফলে তার অ্যাটেনশানগুলো এমন হয়ে থাকে। এটা ঐ আক্রান্ত বাচ্চাটি ইচ্ছে করে করে না। এটা ব্রেনের রোগ। ফলে এর চিকিৎসায় ওষুধের প্রয়োজন হয়। আর ওষুধ ব্যবহারের ফলে তার চঞ্চলতা অনেকটা কমিয়ে আনে। তবে বলে রাখা ভালো শুধু ওষুধ দিয়ে কাজ হবে না বা পরিপূর্ণ চিকিৎসা হবে না। এরজন্য কিছু থেরাপিও আছে। আর এটা শুধু এই ক্ষেত্রে না সব শিশুরু জন্যই কিন্তু প্রয়োজ্য। যেসব শিশু একটু বখাটে হয়ে যায়, মারধর করে, মিথ্যাকথা বলে- যেটাকে কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার বলা হয়ে থাকে বা আচরণগত সমস্যা হিসেবে আমরা চিহ্নিত করে থাকি।

শ্রোতাবন্ধুরা! শিশুর অতিরিক্ত চঞ্চলতা বা এডিএইচডি নিয়ে দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা শুনছেন, ফিরছি শিগগিরি আমাদের সাথেই থাকুন।

রেডিও তেহরান: মিউজিক বিরতির পর আবারও ফিরে এলাম আলোচনায়। ডা. তাজুল ইসলাম, আচ্ছা যেসব শিশু একটু বখাটে হয়ে যায়, মিথ্যা কথা বলে, মারামারি করে করে সেটাকে কি আচরণগত সমস্যা বলা যায়? এক্ষেত্রে করণীয় কী?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: জ্বি এটাকে আচরণগত সমস্যার ভেতরেও ফেলা যায়। সেজন্য মা বাবাকে ঐ বাচ্চার জন্য কিছু স্কেজুয়াল দিয়ে রাখতে হবে। অথ্যাৎ যে কাজটি সে অতিরিক্ত করছে কিংবা বাড়াবাড়ি করছে সেকাজ থেকে তাকে বিরত রাখার জন্য মারধর করলে কোনো লাভ হবে না। বকাঝকা করলে কোনো লাভ হবে না। বরং উল্টোটা হবে। এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হচ্ছে- পুরস্কার এবং শাস্তিটা একটু ভিন্নভাবে দিতে হবে। বাচ্চাটিকে বলতে হবে- তুমি একটু শান্ত হয়ে ৫/১০ টা মিনিট বসে যদি এইটুকু পড়াশুনা করে নাও তাহলে সেই শিশুর চাহিদা অনুযায়ী বিশেষ একটা পুরস্কার ঘোষণা করতে হবে। তার সামনে ঝুলিয়ে রাখতে হবে যে তুমি তোমার কাজটুকু শেষ করলে এই গিফটটা তুমি পাবে। আমাদের পরামর্শ থাকে ঐ সব শিশুকে স্বাভাবিকভাবে সবকিছু দেবেন না। কিছু বিষয় আপনাদের হাতে রাখবেন। তাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শর্ত হিসেবে ওগুলো রাখবেন। আর বাচ্চাটি ঐ কাজটি করার সাথে সাথে কিন্তু কথা অনুযায়ী গিফটি দিতে হবে।

করণীয় বিষয়গুলোকে যদি পয়েন্ট আকারে বলা হয়।

■ যদি শিশুর মধ্যে অতিচঞ্চলতার লক্ষণ থাকে, তাহলে একজন মনোরোগ চিকিৎসকের সাহায্য নিন।

■ শিশুর জন্য একটি রুটিন তৈরি করুন। বাড়ির সবাই সঠিক নিয়ম মেনে চলুন। যেমন নিদি৴ষ্ট সময়ে ঘুমানো, সঠিক সময়ে খাবার খাওয়া ও খেলার সময়ে খেলা ইত্যাদি।

■ শিশুকে কোনো নির্দেশ দিলে সেটি তাকে বুঝিয়ে বলবেন। রূঢ় আচরণ করবেন না।

■ শিশুর ভালো কাজের প্রশংসা করুন, কখনো তাকে পুরস্কৃত করুন।

■ শিশুর খাদ্যতালিকায় কৃত্রিম রং ও মিষ্টির পরিমাণ কমিয়ে তাজা ফলমূল যুক্ত করুন।

রেডিও তেহরান: ডা. তাজুল ইসলাম, কখনও কখনও দেখা যায় শিশুর অতিরিক্ত চঞ্চলতা, বখাটে হয়ে যাওয়া, মিথ্যা কথা বলা, মনোযোগ না দেয়ার কারণে বাবা মায়েরা বকাঝকা দিয়ে থাকেন কখনও কখনও মারধরও করে থাকেন-এটা কি ঠিক?

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম: না, একদম ঠিক না। মারধর করা যাবে না বকাঝকা করা যাবে না। এডিএইচডি আক্রান্ত বাচ্চাটি লাফালাফি, দৌঁড়াদৌঁড়ি করে কিন্তু প্রচুর ক্ষতি করে থাকে। জিনিষপত্র ভাঙে এমনকি নিজের হাত পাও ভাঙে। এসব কাজের সময় তাকে যদি ভয় দেখানো হয় যে তুমি এগুলো করো তাহলে কিন্তু আমরা তোমার সঙ্গে নাই। তুমি একা থাকবে। তাকে আলাদা একটা রুমে ৫ মিনিটের জন্য রেখে দেওয়া- এইটা বোঝানোর জন্য যে তোমার কাজটি ভালো হয় নি। কাজটি খারাপ হয়েছে। এটা আমরা পছন্দ করিনি যেকারণে আমরা তোমার সঙ্গে নেই। অর্থ্যাৎ মা বাবার যে স্নেহ ভালোবাসা থেকে তাকে দূরে রাখা। সব বাচ্চাই তো বাবা মায়ের ভালোবাসা স্নেহ পেতে চায়। আর যখন এটা তেকে বঞ্চিত হবে তখন তার খুব বেশি খারাপ লাগবে। তারমধ্যে খুব কষ্ট হবে। তখন সে বুঝবে যে না আমার এসব কাজ করা ঠিক হবে না।  ফলে তার আচরণগত পরিবর্তনের জন্য দুটো জিনিষ করতে হবে। কিছু পুরস্কার দিয়ে ম্যানেজ করা অপরটি হচ্ছে হালকা ধরনের কোনো শাস্তির ব্যবস্থা করা।  এভাবে বাচ্চাটির আচরণ পরিবর্তনের চেষ্টা করতে হবে।

অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম। আমাদের হাতে আজ আর সময় নেই। এতক্ষণ শিশুর অতিচঞ্চলতা বা এডিএইচডি নিয়ে দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা করায় আপনাকে আবারও অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি। 

আর শ্রোতা/পাঠকবন্ধুরা! শিশুর অতিচঞ্চলতা একটি রোগ যাকে এডিএইচডি বলা হয়। চিকিৎসায় ওষুধ এবং নানারকম থেরাপির মাধ্যমে এটি ভালো হয়ে যায়। তবে শিশুকে মারধর করা যাবে কিংবা বকাঝকা করা যাবে না।# 

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৬

ট্যাগ