পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব (পঞ্চম পর্ব)
গত কয়েক পর্বের আলোচনায় আমরা প্রাচীন ইরানের ভৌগলিক পরিচিতি তথা হাখামানেশীয় ও পার্থিয়ান সাম্রাজ্যের সীমানা এবং বিশ্বের প্রায় অর্ধেক অঞ্চলের ওপর ইরানের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে কথা বলেছি। সাসানিয় যুগেও একই অবস্থা বিরাজ করছিল। বাকি অর্ধেক বিশ্বের ওপর কর্তৃত্ব করতো রোমান সাম্রাজ্য।
সাসানিয় যুগে ইরানের সঙ্গে রোমের সামরিক সংঘাত জোরদার হয়। এই দুই সভ্যতার মধ্যে সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক লেনদেনও ঘটত। ইরানিরা প্রকৌশল বিদ্যায় দক্ষ রোমান বন্দিদের দিয়ে বড় বড় স্থাপনার ভিত্তি তৈরি করত এবং রোমান পণ্ডিত ও বিশেষ করে চিকিৎসক বন্দিদেরকে জুন্দিশাপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বিজ্ঞান-কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষাদানের কাজে ব্যবহার করত।
হিজরি দ্বিতীয় দশক থেকে ইরানি সাম্রাজ্যের পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে মুসলমানদের হামলা শুরু হয়। ত্রিশ হিজরিতে শেষ সাসানিয় সম্রাট পরাজিত হলে সাসানিয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। এই আকস্মিক পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, দরবারের আমির-ওমরাহদের মধ্যে দুর্নীতি এবং জনগণের ওপর জুলুম-অত্যাচার ও অবিচার বেড়ে যাওয়া। এ অবস্থায় ইসলামের সাম্য ও ন্যায়-বিচার এবং সত্য-প্রীতি ইরানিদের মুগ্ধ করে। ফলে মুসলমানরা ইরান জয় করার পরপরই ইরানি জাতি ও গোত্রগুলো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক বেশি গতিশীল ও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
রোমান সাম্রাজ্যের শাসনামলে পাশ্চাত্যে বিরাজ করছিল অনৈক্য। প্রাচীন জার্মান জাতিগুলো যেমন, অ্যাংলোসেক্সন (ব্রিটিশ) এবং স্ক্যান্ডেনিভিয়ান ও ভাইকিংরা ইউরোপকে সভ্যতার কাফেলা থেকে দূরে রেখেছিল। বর্বর এই জাতিগুলোই রোমান সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং মধ্যযুগের পর এরাই বিশ্বের নানা অঞ্চলে উপনিবেশ তৈরি করে জাতিগুলোর ওপর গণহত্যা ও লুণ্ঠন চাপিয়ে দেয়। অন্যদিকে ইরানি জাতিগুলো ইসলামী সভ্যতার মশাল নিয়ে বিশ্বের উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতি রক্ষার দায়িত্ব পালন করে। খ্রিস্টিয় চতুর্থ শতক থেকে ১৪ শতক পর্যন্ত সময় তথা প্রায় এক হাজার বছর ছিল ইউরোপের জন্য অন্ধকার বা মধ্যযুগ। কিন্তু ইরানিরা প্রাচ্য ও এশিয়াকে সেই অজ্ঞতা আর বর্বরতার আঁধারে ডুবে থাকতে দেয়নি।
ইরানি ও ইসলামী সভ্যতার বিকাশে আরব মুসলমানরাও প্রধান সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে। এই ইরানি-ইসলামী সভ্যতা ছড়িয়ে পড়েছিল উত্তর দিকে ট্রান্স-অক্সিয়ানার তুর্কিস্তান ও পশ্চিমে এশিয়া মাইনর এবং সুদূর স্পেন পর্যন্ত।
ইরানিরা ইসলামের আগমন ও মুসলিম বিজয়ের পর তেমন একটা প্রতিরোধ গড়ে তুলেনি এই নতুন সভ্যতার বিরুদ্ধে। বরং তারা শিগগিরই ইসলাম গ্রহণ করে। কারণ, ইসলামী সভ্যতাকে তাদের কাছে অন্য সভ্যতাগুলোর চেয়ে অনেক বেশি উন্নত বলে মনে হয়েছে। ইরানিরা খুবই শিগগিরই ইসলামী সাম্রাজ্যের প্রশাসনের বড় বড় পদে ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়। ফলে তারা ছড়িয়ে পড়ে নানা অঞ্চলে। ইসলামের এই বিশাল সাম্রাজ্য ছিল হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের মতই ব্যাপক-বিস্তৃত। এই সভ্যতার ছায়াতলে ধর্ম-প্রচার ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ইরানি মনীষীরা।
প্রায় এক হাজার বছর ধরে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্য ছিল ইরানি সাম্রাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বি। ফলে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক অঞ্চলের ওপর তথা পাশ্চাত্যের ওপর প্রভাব ফেলা প্রাচীন ইরানের জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু ইসলামী সভ্যতা জোরদার হওয়ায় ও মুসলমানদের সামরিক চাপের মুখে রোমানরা আরো বহু অঞ্চল মুসলমানদের কাছে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। রোমান সাম্রাজ্য কেবল এশিয়া মাইনর ও ইউরোপের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ে।
মুসলিম সেনারা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য বা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল তথা আধুনিক ইস্তাম্বুল পর্যন্ত দখলের চেষ্টা চালায়। কিন্তু নজিরবিহীন প্রতিরোধসহ নানা কারণে আরো বহুকাল পর্যন্ত তা মুসলমানদের হস্তগত হয়নি। অবশ্য মুসলিম বাহিনী সিরিয়া ও লেবানন দখল করতে সক্ষম হয়। ফলে তাদের জন্য খুলে যায় ভূমধ্য-সাগরের উপকূলীয় পথগুলো। এভাবে এশিয়া মাইনরে মুসলিম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথ খুলে যায় এবং এরই সুবাদে তারা স্পেন জয় করে ইউরোপের প্রাণকেন্দ্রের কাছাকাছি চলে আসে।
উত্তর আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরের আফ্রিকান উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ছিল রোমান সাম্রাজ্যের দখলে। কিন্তু অবশেষে এইসব অঞ্চলও জয় করে মুসলিম বাহিনী। ফলে এই অঞ্চলগুলোতেও ইরানি-ইসলামী সভ্যতা ছড়িয়ে পড়ার পথ প্রশস্ত হয়।
একদল গবেষকের মতে, ইসলামের চিন্তাধারা বিশ্বজনীন, বিশ্ব-কেন্দ্রীক ও বিশ্ব-রাষ্ট্র গঠন-ভিত্তিক ছিল বলে ইরানিরা খুব সহজেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কারণ, ইরানিদের প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতিও ছিল এই চিন্তাধারার সঙ্গে মানানসই।
হিজরি দ্বিতীয় শতকের শুরুতে ইরানিদের আধ্যাত্মিক ও সামরিক সমর্থনের সুবাদে উমাইয়া বিরোধী আন্দোলন সফল হয় এবং উমাইয়াদের পতনের পর আব্বাসীয়রা খিলাফত দখল করে। এ যুগে গোটা আব্বাসীয় সাম্রাজ্যে ইরানিদের শিল্প, সংস্কৃতি ও বাণিজ্য তৎপরতার পথ উন্মুক্ত থাকে। ফলে মুসলিম বিশ্বসহ বিশ্বের নানা অঞ্চলে তাদের সাংস্কৃতিক সৃষ্টিশীলতা এবং ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক ভূমিকা আবারও জোরদার হয়।
ইরানের নেতৃস্থানীয় অনেকেই ইসলামের প্রাথমিক যুগের খলিফাদেরকে বিচ্ছিন্নভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। কিন্তু আব্বাসিয় যুগে এই সহযোগিতা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিকসহ নানা দিকে জোরদার হয়ে ওঠে। ইরানি জাতিগুলো তাদের প্রাচীন ধর্ম ত্যাগ করে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করলেও তারা ইসলাম-পূর্ব যুগের অনেক প্রথা বহাল রাখে। তারা আব্বাসীয়দের মন্ত্রী বা পরামর্শদাতা হয়ে এবং ইসলামী আইন, শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতিসহ নানা ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রেখে ইসলামী-ইরানি সংস্কৃতিকে বিশ্বের বহু অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়। মুসলিম জাতিগুলোর সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ফলে ও ইরানিদের সৃষ্টিশীলতার সুবাদে ইরানি সংস্কৃতির নানা উপাদানও জোরদার হয়।
আব্বাসীয়রা তাদের রাজধানী হিসেবে দামেস্কের পরিবর্তে বাগদাদকে বেছে নিয়েছিল। ফলে তাদের সঙ্গে আরবদের পরিবর্তে ইরানিদের যোগাযোগ বেড়ে যায় এবং ইরানি প্রভাব জোরদার হয়। ইরানিরা তৎপর হয়ে ওঠে সিরিয়া ও লেবাননেও যা অতীতে সম্ভব ছিল না। ফলে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল-অঞ্চলে গড়ে ওঠে ইরানি বসতি।
উমাইয়াদের নৌ-বাহিনীর মধ্যেও প্রাধান্য ছিল দক্ষ ইরানি নাবিকদের। তাদের অনেকেই স্থায়ীভাবে থেকে যান লেবাননের উপকূলীয় নানা শহরে ও এমনকি ত্রিপোলীতেও। নৌ ও সাগর-বিদ্যায় ইরানিরা ইসলাম-পূর্ব যুগ থেকেই দক্ষ ছিল। ভারত মহাসাগর, পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর এবং ওমান সাগরসহ নানা সাগরে তারা ঘুরে বেড়াতো। ইসলামী যুগে তাদের সাগর-অভিযান জোরদার হয়। ইরানিরা ভূমধ্য সাগর থেকে জিব্রাল্টার প্রণালী পর্যন্ত বিস্তৃত সাগর পথে যাতায়াত করতো।
মোট কথা মুসলমান হওয়ার পর ইরানিরা আরো শক্তিশালী ও বেশি সম্মানের অধিকারী হয়। পরবর্তী যুগগুলোতেও ভূমধ্য-সাগরের উত্তরাঞ্চলীয় উপকূল- যা ছিল ইউরোপীয়দের দখলে- তাছাড়া বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ উপকূলগুলোতেই ইরানিদের অবস্থান ও তাদের সংস্কৃতি জোরদার হয়। #
পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/২০