অক্টোবর ২৫, ২০১৬ ১২:৩৭ Asia/Dhaka

গত কয়েক পর্বে বিশ্বের নানা অঞ্চলে ইরানি সংস্কৃতির প্রভাব ও  ফার্সি ভাষা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ পর্বে বিশ্ব-বিশ্রুত ইরানি মনীষী আবু নাসর মুহাম্মাদ ফারাবির জীবনী সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।

পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব (পর্ব-১২)

আমরা আগেই বলেছিলাম পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব শীর্ষক আলোচনার মূল অধ্যায়ে আমরা এমন সব ইরানি মনীষীদের জীবনী তুলে ধরব যারা প্রাচীন ইরানের বা প্রাচীন ইরানের সাংস্কৃতিক বলয়ের মধ্যে জীবন যাপন করেছেন। তাদের মাজার বর্তমান ইরানের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে রয়েছে। গোটা বিশ্বের ওপর প্রভাব রেখে-যাওয়া এ ধরনের বিশ্ব-বিশ্রুত ও প্রথম সারির ইরানি মনীষীদের মধ্যে মাওলানা জালালউদ্দিন বালখি রূমি, নিজামি গাঞ্জাভি, শেখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি, আবু রায়হান বিরুনি, আবু নাসর মুহাম্মাদ ফারাবি ও খাজা নাসিরুদ্দিন তুসির নাম উল্লেখ করা যায়। যাই হোক, এ পর্বে হিজরি তৃতীয় ও চতুর্থ শতকের বিশ্বখ্যাত দার্শনিক ফারাবির জীবনী তুলে ধরা হবে।

আবু নাসর মুহাম্মাদ ফারাবি প্রায় ২৫৭ হিজরির দিকে তথা ৮৭০ খ্রিস্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। তার জন্মস্থান নিয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। অনেকেই মনে করেন কাজাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে আধুনিক আত্রাই শহরের কাছে ফারাব অঞ্চলে জন্ম নিয়েছিলেন ফরাবি।  আবার কেউ কেউ মনে করেন তিনি প্রাচীন ইরানের বৃহত্তম খোরাসানের ফারিয়াব বা বারিয়াব অঞ্চলে জন্ম নিয়েছিলেন। এ অঞ্চল বর্তমানে আফগানিস্তানের অংশ। ইরানি ও অ-ইরানি নির্বিশেষে বেশিরভাগ গবেষক ও বিশ্লেষকের মতে ফারাবি ছিলেন ইরানি বাবা-মায়ের ইরানি সন্তান। ফারাবির বাবা ছিলেন ইরানের একজন সেনা।

প্রখ্যাত আরব ঐতিহাসিক ইবনে আবি উজাইবাহ তার ‘ইনসানুল উয়ুন’ বা ‘মানব-চোখ বা মানব-দৃষ্টি’ শীর্ষক বইয়ে ফারাবিকে ইরানি বংশধারার ব্যক্তি বলে উল্লেখ করেছেন।  ইবনে নাদিম তার ‘আলফিহরিস্ত’ শীর্ষক বইয়ে এবং  মনীষী আশশাহরুজিও ফারাবিকে ইরানি বলে উল্লেখ করেছেন। আশশাহরুজি খ্রিস্টিয় ১২৮৮ সালের দিকে জীবিত ছিলেন।

ফারাবি তার রচনাবলীর অনেক স্থানেই ফার্সি, সুগদি বা সুগদিয়ান ভাষায় ও কখনও কখনও গ্রিক ভাষায় তথ্য-সূত্র বা টিকা দিয়েছেন। কিন্তু তার লেখায় কোনো তুর্কি শব্দ দেখা যায় না। অনেক গবেষক মনে করেন ফারাবির মায়ের ও ফারাব অঞ্চলের জনগণের ভাষা ছিল সুগদিয়ান। এই ভাষা ছিল ইরানিদের ভাষাগুলোর অন্যতম ও উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় ইরানি ভাষাগুলোর অংশ।

এ ছাড়াও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম অধ্যাপক ডক্টর ক্লিফোর্ড এডমান্ড বসওয়ার্থও লিখেছেন, উৎসাহী তুর্কি গবেষকদের কেউ কেউ ফারাবি, বিরুনি ও ইবনে সিনার মত বড় মাপের ব্যক্তিত্বদেরকে তুর্কি বলে দাবি করেছেন। এই গবেষকদের মধ্যে যিনি সর্বপ্রথম ফারাবিকে তুর্কি বলে দাবি করেছেন তিনি হলেন ইবনে খাল্লাকান। ডক্টর গুয়াতাস এনসাইক্লোপেডিয়া ইরানিকাতে ইবনে খাল্লাকানের এই দাবির নিন্দা জানিয়েছেন।  তিনি বলেছেন, ফারাবির ইরানি হওয়ার বিষয়ে আরব ঐতিহাসিক ইবনে আবি উজাইবাহ খাল্লাকানের আগেই নানা দলিল-প্রমাণ তুলে ধরেছেন। আর তাই খাল্লাকান তাকে তুর্কি হিসেবে প্রমাণ করার জন্য নানা দলিল-প্রমাণ বানানোর চেষ্টা করেছেন। খাল্লাকান ফারাবির নামের আগে আততুর্ক শব্দটি যুক্ত করেছেন। অথচ ফারাবির নামের সঙ্গে কখনও এই শব্দের সম্পর্ক ছিল না। 

বিশিষ্ট ইরানি গবেষক আলী আকবর দেহখোদা ফার্সি সাহিত্যের অধ্যাপক বদিউজ্জামান ফুরুজানফারকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, ফারাবির শৈশব ও যৌবন সম্পর্কে বইপুস্তকে প্রামাণ্য কিছু দেখা যায় না। হিজরি সপ্তম শতকের পণ্ডিত ইবনে আবি উসাইবা দু’টি পরস্পর-বিরোধী তথ্য দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ফারাবি প্রথমদিকে দামেস্কের একটি বাগানের প্রহরী ছিলেন। আবার অন্যত্র লিখেছেন, ‘ফারাবি যৌবনের মধ্য-পর্যায়ে বিচার-কাজে মশগুল ছিলেন। আর যখন তিনি অন্যান্য জ্ঞানের পরিচিতি অর্জন করেন তখন বিচার-কাজ ছেড়ে সেইসব জ্ঞান হাসিলে মনোনিবেশ করেন। যৌবনেই গবেষণা ও দর্শনের দিকে আগ্রহী ছিলেন ফারাবি। শিক্ষক ও গাইডদের সহায়তা নিয়ে তিনি জ্ঞানের এক জগত থেকে আরেক জগতে ভ্রমণ করতেন। পড়াশুনা ও গবেষণা ছাড়া তার আর অন্য কোনো লক্ষ্যই ছিল না।’

বলা হয় ফারাবি প্রায় ৪০ বছর বয়সে পড়াশুনার জন্য বাগদাদ যান। এর আগে তিনি আরবি ব্যাকরণ, ফিকাহ বা ইসলামী আইন শাস্ত্র ও হাদিস বিষয়ে পড়াশোনা করেন। তবে যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন সম্পর্কে তিনি তেমন কোনো পড়াশুনা তখনও করেননি।  বাগদাদে যাওয়ার পর ফারাবি মাত্তা বিন ইউনুসের কাছে যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন পড়া শুরু করেন। এরপর তিনি বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে হাররান শহরে যান। সেখানে তিনি ইউহানা বিন হাইলানের ছাত্র হন। প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও অধ্যবসায়ের সুবাদে তিনি সব বিষয়ই খুব ভালোভাবে শিখতে সক্ষম হন। ফলে খুব শিগগিরই তিনি বড় দার্শনিক ও পণ্ডিত হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ফারাবি যখন  বাগদাদে ফিরে আসেন তখন তার চারদিকে ছাত্ররা ভিড় জমায়। এইসব ছাত্রের মধ্যে ইয়াহিয়া বিন উদাই নামের খ্রিস্টান দার্শনিকও ছিলেন।

এরপর ফারাবি ৯৪১ খ্রিস্টাব্দে বা ৩৩০ হিজরিতে দামেস্কে যান এবং আলেপ্পোর শাসক সাইফুদদৌলা হামেদানির দরবারের আলেম হন।#