অক্টোবর ৩১, ২০১৬ ১৭:৩৩ Asia/Dhaka

গত পর্বের আলোচনার ধারাবাহিকতায় আজও আমরা বিশ্ব-বিশ্রুত ইরানি মনীষী আবু নাসর মুহাম্মাদ ফারাবির পরিচিতি সম্পর্কে আরও কিছু কথা বলব।   

পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব (পর্ব-১৩)

গত পর্বের আলোচনায় আমরা বলেছিলাম, ফারাবি খ্রিস্টিয় ৯৪১ সনে বা ৩৩০ হিজরিতে দামেস্কে যান এবং আলেপ্পোর শাসক সাইফুদদৌলা হামেদানির দরবারের আলেম হন। আবু নাসর ফারাবি খ্রিস্টিয় ৯৫০ সনে তথা ৩৩৮ হিজরিতে দামেস্কের কাছে ইন্তেকাল করেন। সে সময় তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। কেউ কেউ মনে করেন, আবু নাসর ফারাবি দামেস্ক থেকে আসকালান শহরে যান যা বর্তমানে  বর্ণবাদী ইসরাইলের দখলে রয়েছে। সেখানে একদল দস্যুর হাতে আক্রান্ত হন তিনি। ফারাবি তাদের বলেছিলেন, আমার অর্থকড়ি, অস্ত্র, জামা-কাপড় ও অন্যান্য সাজ-সরঞ্জাম সবই নিয়ে যাও, কিন্তু আমার ওপর হামলা কোরো না। কিন্তু দস্যুরা তার এই অনুরোধ উপেক্ষা করে তাকে হত্যা করতে চায়। ফলে ফারাবি তাদের সঙ্গে লড়াই করেন ও  নিহত হন। সিরিয়ার রাজ-দরবারের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ঘটনা জানতে পারেন এবং তাকে অত্যন্ত সম্মান জানিয়ে দামেস্কে দাফন করেন। আর ওই দস্যুগুলোকে ফারাবির কবরের সামনেই ফাঁসি দেয়া হয়।

মুসলিম ঐতিহাসিকরা মনে করেন ফারাবি ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক সাধক এবং গভীর ধ্যানমগ্ন ও চিন্তাশীল ধার্মিক ব্যক্তি। তিনি দরবেশদের মতই জীবন-যাপন করতেন। গবেষণা ও লেখালেখি ছাড়া অন্য কিছুর দিকেই তার কোনো আগ্রহ ছিল না। পার্থিব বিষয়াদিকে তিনি এতটাই এড়িয়ে চলতেন যে আলেপ্পোর তৎকালীন শাসক সাইফুদদৌলা হামেদানি ফারাবির জন্য বিপুল অংকের অর্থ ভাতা হিসেবে বরাদ্দ করা সত্ত্বেও তিনি বায়তুল মাল থেকে দৈনিক কেবল চার দিরহাম নিতেন। আর এতেই তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন।  

ফারাবি জ্ঞানের অনেক বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। তিনি সে যুগে প্রচলিত জ্ঞানের সব বিষয়ের ওপর বই লিখেছিলেন। আর সেইসব বই থেকেও বোঝা যায় যে তিনি গণিত, রসায়ন বিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সমরবিদ্যা, প্রকৃতি-বিদ্যা, সঙ্গীত, খোদা-তত্ত্ব, ইসলামী আইন, সমাজ-বিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।

এটা ঠিক যে ইয়াকুব বিন ইসহাক কিন্দিকে ইসলামী যুগের প্রথম দার্শনিক বলা হয় এবং তিনিই দর্শনের রাজ্যে অন্যদের জন্য পথ খুলে দিয়েছিলেন, কিন্তু কিন্দি দর্শনের ক্ষেত্রে নিজস্ব কোনো ধারা সৃষ্টি করতে পারেননি। তিনি দর্শনের বিদ্যমান বিষয়গুলোর মধ্যে কেবল সংহতি বা সমন্বয় সাধন করেছিলেন। কিন্তু ফারাবি দর্শনের ক্ষেত্রে এক পরিপূর্ণ স্বতন্ত্র ধারা উপহার দিয়ে গেছেন।

কিন্দি যে মহতী কাজ শুরু করেন ফারাবি তা আন্তরিক চিত্তে ও শক্তিমত্তা নিয়ে চালিয়ে যান। গ্রিসের দার্শনিক মতবাদ বা  দার্শনিক চিন্তাধারা সম্পর্কিত তত্ত্বগুলো অনুদিত হয়েছিল আরবি ও সুরিয়ানি ভাষায়। কিন্তু দর্শন শাস্ত্র  তখনও আরবি ভাষার সঙ্গে খুব একটা ঘনিষ্ঠ হতে পারেনি। দর্শন ও আরবি ভাষার মধ্যে একটা ব্যবধান বা দূরত্ব থেকেই যায়।  ফারাবি আরবি ভাষাকে দর্শনের উপযোগী করে উপস্থাপন করতে সক্ষম হন। ফলে দর্শন ও আরবি ভাষা পরস্পরের আপন হয়ে যায়। (বাজনা)

প্রখ্যাত ইরানি দার্শনিক, চিকিৎসাবিদ ও বিজ্ঞানী ইবনে সিনা ফারাবিকে নিজের শিক্ষক বলে মনে করতেন। ইবনে রোশদ ও অন্যান্য মুসলিম এবং পশ্চিমা দার্শনিকরাও ফারাবির প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ইবনে সিনা লিখেছেন, সক্রেটিসের  অতি-প্রাকৃতিকতা বা বস্তুর উর্ধ্ব-জগত সম্পর্কিত একটি বই ৪০ বার পড়েও লেখকের বক্তব্যের মর্ম বুঝতে পারছিলাম না। এরপর বাজারে আবু নাসর ফারাবির একটি বই পেলাম। সেখানে এ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা ছিল। আর এই বই পড়ার পর এ বিষয়টি বুঝতে পারি ও খুবই আনন্দিত হই। মুসলিম দার্শনিকরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনে অনন্য অবদানের জন্য সক্রেটিসকে ‘প্রথম শিক্ষক’ ও ফারাবিকে ‘দ্বিতীয় শিক্ষক’ বলে  সম্মান দেখিয়েছেন।

ফারাবি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সোনালী যুগে আবির্ভূত হন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা দিক ও দর্শন-বিদ্যাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। তাকে বলা হয় ইসলামী দর্শনের জনক। সেই থেকে আজও ইসলামী দর্শনের বিকাশ ও অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে।

ফারাবির যুগ থেকে হিজরি নবম শতক পর্যন্ত তথা খ্রিস্টিয় নয় শতক থেকে উনবিংশ শতক পর্যন্ত বা অন্য কথায় ফারাবি থেকে  হাকিম মোল্লা হাদি সাবজেওয়ারির যুগ পর্যন্ত ‘বিশ্বজগতের সৃষ্টি-রহস্য’ ছিল ইসলামী দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ফারাবি গ্রিক দর্শন পুরোপুরি অধ্যয়ন ও আয়ত্ত্ব করেছিলেন। সক্রেটিসের চিন্তাধারা তাকে প্রভাবিত করেছিল। ‘আদর্শ সমাজ বা রাষ্ট্র’ বিষয়ক তার একটি তত্ত্ব ‘ আদর্শ সমাজের নাগরিকদের চিন্তা-ভাবনা’ শীর্ষক একটি বইয়ে বিধৃত হয়েছে।  তার দৃষ্টিতে এই আদর্শ সমাজের ওপর ইসলামী বিধানের কর্তৃত্ব থাকবে এবং জনগণ ও শাসকবর্গ এই ইসলামী বিধানের আলোকেই তাদের  পারস্পরিক সম্পর্ক সমন্বিত করবেন।  

ফারাবির মতে দার্শনিকরাই সমাজের নেতৃত্ব দেন। বিশ্ব-জগত যেমন পরিচালনা করেন মহান আল্লাহ তেমনি সমাজের নানা দিক পরিচালনা করেন দার্শনিকরা। রাজনৈতিক দর্শনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন ফারাবি। তিনি বেশ কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন যে বিষয়গুলোর মাধ্যমে তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ের মধ্যে গড়ে তুলেছেন দার্শনিক বন্ধন।

ফারাবির মতে রাজনীতির রয়েছে নৈতিক ও সুশীল বিভাগ। নৈতিক রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতি হল একত্ববাদ এবং পুনরুত্থান বা বিচার-দিবসের প্রতি বিশ্বাস ও আসমানি প্রত্যাদেশ-ভিত্তিক।  সামাজিক নানা চাহিদা, সমাজের সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা হচ্ছে সুশীল রাজনীতির ভিত্তি। ফারাবি মনে করতেন সুশীল সমাজের সমৃদ্ধি নির্ভর করে নৈতিক রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গতি বা মিল রাখার মাত্রার ওপর। ইরানি দার্শনিক ডক্টর ইব্রাহিম দিনানির মতে, ফারাবির সামাজিক চিন্তার রয়েছে নানা দিক। তারা চিন্তাধারার আওতায় রয়েছে প্রকৃতি ও অতি-প্রাকৃতিক জগত। তাই তাকে বলা হয় সংস্কৃতির দার্শনিক। সংস্কৃতির বিষয়ে রয়েছে ফারাবির নানা বক্তব্য যা তার লেখনীতে দেখা যায়। গত ১৪০০ বছরের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বে অন্য কোনো দার্শনিক ফারাবির মত এত বেশি মাত্রায় সামাজিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেননি।

বলা হয় ফারাবি জ্ঞানের নানা বিষয়ে ১০০টিরও বেশি বই লিখেছিলেন যার মধ্যে কোনো কোনো বই আজও পাওয়া যায়। দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও অধিবিদ্যা তার লেখনী আর চিন্তাধারার মূল তিন উপাদান।

এটা ঠিক যে ফারাকি গ্রিক দর্শন শিখে নিজস্ব দর্শন উপহার দিয়েছেন। কিন্তু তার দর্শনের চিন্তাধারাগুলো ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।  তিনি প্লেটো, অ্যারিস্টটল ও সক্রেটিসের দর্শনসহ গ্রিক দর্শনগুলোকে এবং নানা বিদ্যাকে ইসলামী দর্শনের কাঠামার মধ্যে সমন্বিত করেন।

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/৩১