পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব (আল ফারাবি-৩)
গত পর্বের আলোচনার ধারাবাহিকতায় আজও আমরা বিশ্ব-বিশ্রুত ইরানি মনীষী আবু নাসর মুহাম্মাদ ফারাবির পরিচিতি সম্পর্কে আরও কিছু কথা বলবো।
পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব (পর্ব-১৪)
গত দুই পর্বের আলোচনায় আমরা জেনেছি আবু নাসর মোহাম্মাদ ফারাবি ছিলেন প্রাচীন ইরানের ফারিয়াব অঞ্চলে জন্ম-নেয়া একজন ইরানি মনীষী। তার জন্মস্থানটি বর্তমানে আফগানিস্তান বা কাজাকিস্তানের অংশ। তার বাবা ছিলেন একজন ইরানি সেনা। তিনি তার রচনায় ফার্সি ও সুগদি ভাষায় টিকা দিয়েছেন। এ দু’টি ভাষাই ইরানিদের ভাষা। তার লেখায় কোনো তুর্কি শব্দ দেখা যায় না। বহু বিষয়ে পাণ্ডিত্যের অধিকারী ফারাবি ছিলেন দর্শন শাস্ত্রের পুনরুজ্জীবনকারী ও ইসলামী দর্শন শাস্ত্রের জনক। যদিও ইসলামী দর্শনের মূল উৎস হল কুরআন ও হাদিস এবং বিশ্বনবীর (আ) পবিত্র আহলে বাইতের ইমামগণের চিন্তাধারা। ফারাবির কবর রয়েছে দামেস্কের কাছে।
আমরা আরও জেনেছি, দর্শনসহ বহু বিষয়ে বই লিখেছিলেন ফারাবি। ফারাবির দর্শন ইসলামী হলেও তাতে অ্যারিস্টটলসহ অনেক গ্রিক দার্শনিকের প্রভাব ছিল। তার মতে অস্তিত্ব-বিদ্যা দর্শনের আলোচনার মূল বিষয়।
ফারাবিই ছিলেন প্রথম মুসলিম দার্শনিক যিনি সক্রেটিস ও অ্যারিস্টটলের বহু চিন্তাধারা পুরোপুরি হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন এবং নিজের নানা বইয়ে এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন ও সমালোচনা করেছেন। গ্রীক দর্শনকে পুনরায় বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়া ছিল ফারাবির কৃতিত্ব। গ্রীক দর্শন, তাদের যুক্তিবিদ্যা ও প্রকৃতি-উর্ধ্ব-জগত সম্পর্কিত ধারণাগুলোকে তিনিই প্রথম ইসলামী দর্শনের কাঠামার মধ্যে সমন্বিত করেন। দর্শনের সঙ্গে তিনি চিন্তার যে নিজস্ব জগতকে তুলে ধরেছেন তার সঙ্গে প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের চিন্তাধারার মিল থাকলেও তা পুরোপুরি এক নয়। ফারাবির দর্শনের মূল-কথা বা সারাংশ হল সত্যিকারের দর্শন কেবল একটি। তার মতে দর্শনের মহান দিকপালরা মতভেদের শিকার হতে পারেন না। কারণ, তাদের লক্ষ্য হল অভিন্ন এবং তারা সবাই হলেন সত্য-সন্ধানী। ফারাবির দর্শনের বৈশিষ্ট্যগুলো ইসলামী শিক্ষা ও চিন্তাধারা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
ফারাবি জনগণের ধর্মীয় চিন্তাধারা ও দর্শনের মধ্যে যে দূরত্ব রয়েছে তা কমিয়ে আনার চেষ্টা করেন। অন্য কথায় তিনি দর্শনের নীতি ও যুক্তি দিয়ে ধর্মীয় চিন্তাধারা থেকে নানা কুসংস্কার ও অলীক কল্পনা দূর করার চেষ্টা করেছেন। যেমন, ফারাবি সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে ধর্মীয় বর্ণনাগুলোকে দর্শনের বক্তব্যের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট ও জোরালো করার চেষ্টা করেছেন। এ ছাড়াও তিনি দর্শনকে জনপ্রিয় করার জন্য এর ভাষা আর পরিভাষাগুলোকে ধর্মীয় পরিভাষা ও শব্দগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা চালান। তার এ কাজটি মধ্যযুগে ইখওয়ান আস সাফ্ফা বা সাফ্ফা ভ্রাতৃগোষ্ঠীর জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের তৎপরতায়ও গুরুত্ব পেয়েছিল। (বাজনা)
ইরানি দার্শনিক ডক্টর দেভারি বলেছেন, ‘ফারাবি দর্শনের ক্ষেত্রে ইজতিহাদের পর্যায়ে তথা বিধান প্রণয়ন ও আহরণের মত যোগ্যতায় উপনীত হয়েছিলেন। তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানকে নানা শাখায় শ্রেণীবদ্ধ করেন এবং ইসলামী বিজ্ঞানগুলোকেও তাতে যুক্ত করেন। সব শাস্ত্র বা বিজ্ঞানের এক যৌক্তিক অবস্থান তিনি তুলে ধরেন। তিনি ছিলেন ইসলামী দর্শন শাস্ত্রের জনক। ফারাবির মতে দর্শনের সত্য আল্লাহকে চেনার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এই দিক থেকে দর্শন ও ধর্মের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আর ধর্মের ভিত্তি হল একত্ববাদ ও এক আল্লাহয় বিশ্বাস। ধর্ম ও দর্শনের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হল পদ্ধতিগত পার্থক্য। এ দুয়ের মধ্যে বিষয়গত কোনো পার্থক্য নেই। এর একটি যুক্তিকে ও অন্যটি চিন্তার শক্তিকে কাজে লাগায়। ফারাবির কাঙ্ক্ষিত আদর্শ মানব হলেন, প্রধান নেতা তথা নবী ও ইমাম। ’
যুক্তিবিদ্যায়ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবদান রেখেছেন ফারাবি। তিনি যুক্তিবিদ্যার গুরুত্বও নানা সময় তুলে ধরেছেন তাদের কাছে যারা এই বিদ্যাকে অস্বীকার করত। তার মতে যুক্তিবিদ্যা হচ্ছে এমন এক শিল্প যা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে করে প্রখর ও শক্তিশালী। এ বিদ্যা গবেষককে ভুলভ্রান্তি ও অলীক কল্পনার হাত থেকে রক্ষা করে সঠিক পথ দেখায়।
ফারাবির মতে বুদ্ধিবৃত্তিক বা যৌক্তিক বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে মতামত বা তাত্ত্বিক বক্তব্য ও সুস্পষ্ট বা প্রতিষ্ঠিত সত্য। তিনি বলেছেন, সুস্পষ্ট মত বা প্রতিষ্ঠিত সত্যের ক্ষেত্রে মানুষ ভুল করে না। যেমন, এটা সবাই স্বীকার করে যে কোনো একটি সমগ্র বিষয়ের অংশ বা খণ্ডের তুলনায় পুরো বিষয়টি বড় হয়ে থাকে। অন্যান্য যৌক্তিক বিষয়কে চিন্তা বা পর্যবেক্ষণ ও তুলনার মাধ্যমে বোঝা উচিত। আর এ জন্যই যুক্তি-বিদ্যার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ফারাবি যুক্তিবিদ্যাকে ব্যাকরণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে যুক্তিবিদ্যার সম্পর্ক হচ্ছে বাক্য-প্রকরণের সঙ্গে শব্দ প্রকরণের সম্পর্কের মত।
ফারাবি অন্য যে ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তা হল প্রকৃতির উর্ধ্ব জগত সম্পর্কিত বিষয় বা মেটাফিজিক্স। ফারাবির মতে সমস্ত সৃষ্টি এগিয়ে যাচ্ছে পূর্ণতার দিকে। কিন্তু পরিপূর্ণতার ক্ষেত্রে কেউই আল্লাহর সমকক্ষ হতে পারবে না। আর এ জন্যই মহান আল্লাহ হচ্ছেন অদ্বিতীয় ও অনন্য। এভাবে ফারাবি দর্শনকে একত্ববাদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। অ্যারিস্টটল খোদা-তত্ত্বকে দর্শনের ক্রিম বা মুকুট বলে মনে করতেন। আর এই বিদ্যাকে আরও উন্নত করেছেন ফারাবি। দর্শনের সঙ্গে যে ধর্মের সংঘাত নেই তা তুলে ধরেন ফারাবি। ফলে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে দর্শনের আলোচনা ও যুক্তিগুলো ধর্মের বক্তব্যেরই নির্যাস বা আত্মিক রূপ মাত্র।#
পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/৭