নভেম্বর ১৯, ২০১৬ ১৬:৫৫ Asia/Dhaka

‘পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব’ ধারাবাহিকের ১৫তম পর্বে আমরা বিশ্ব-বিশ্রুত ইরানি মনীষী আবু রায়হান বিরুনি সম্পর্কে  আলোচনা করব।   

ইরানি মুসলিম মনীষী আবু রায়হান বিরুনি ছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু শাখায় পারদর্শী। গণিত,  ইতিহাস, ভুগোল, ভূতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, পদার্থ-বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যাসহ বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্র তার মূল্যবান অবদানে হয়েছে সমৃদ্ধ। তিনি তার লেখনিতে প্রতিটি বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরতেন যা তার আগে আর কেউ করেননি।

১৮টি ধাতু ও মূল্যবান পাথরের ঘনত্ব আবিস্কার করেছিলেন আল-বিরুনি। এ ছাড়াও পৃথিবীর ব্যাসার্ধ ও পরিসীমা নিখুঁতভাবে নির্নয় করেছিলেন তিনি। ভৌগোলিক মানচিত্রের নকশা করার নতুন কয়েকটি পদ্ধতিও তার বড় অবদান। শহরগুলোর মধ্যকার দূরত্ব নির্নয়ের পদ্ধতিও উপহার দিয়ে গেছেন বিরুনি। এসব ছাড়াও কেবল ভারতীয় জাতিগুলোর ইতিহাস ও বিশ্বাস সম্পর্কিত তার গবেষণালব্ধ বইটি ইতিহাসে বিরুনিকে অমর করার জন্য যথেষ্ট। 

আবু রায়হান মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ বিরুনি জন্ম নিয়েছিলেন ৩৬২ হিজরির ৩ জিলহজ মোতাবেক খ্রিস্টিয় ৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রাচীন ইরানের খারেজম প্রদেশের কাস শহরে। বর্তমানে এ অঞ্চলটি মূলত উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের অংশ। বিরুনির বাবা খারেজম শাহের রাজ-দরবারের জ্যোতির্বিদ ছিলেন। গুরগাঞ্জ জেলার মানমন্দিরে কাজ করতেন তিনি। তবে তার বাবা আবু জাফর আহমাদ বিন আলী আন্দিজানি একদল পরশ্রীকাতর ব্যক্তির চক্রান্তে রাজ-দরবারের আনুকূল্য হারান বলে বিরুনির দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়। ফলে দরবার-ছাড়া হয়ে এই পরিবারকে অদূরবর্তী একটি গ্রামে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। আর ওই গ্রামের লোকদের জন্য এই পরিবার অপরিচিত বা নতুন হওয়ায় তাদেরকে বলা হত বিরুনি বা বাইরের লোক।  আবার অনেকে বলেন, বিরুনির জন্ম খারেজম প্রদেশের রাজধানী তথা কাস শহরের বাইরে হয়েছিল বলে তাকে বিরুনি বলা হত।

যৌবনের শুরুতে বিরুনি প্রখ্যাত ইরানি চিন্তাবিদ আমির নাসর মানসুর বিন আলী বিন আরাকের সঙ্গে পরিচিত হন। ফলে বাদশাহ খারেজম শাহের রাজ-দরবারের প্রবেশের ও সুলতানি স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান তিনি। আমির নাসরই ছিলেন এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা।    

খারেজমের দরবারে বিরুনির প্রবেশের কয়েক বছর পর সেখানকার শেষ বাদশাহ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আহমাদ গোরগাঞ্জের শাসক মামুন বিন মাহমুদের হাতে নিহত হন। নিহত হন আলী বিন আরাকও। ফলে বিরুনি তার সব রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকদের হারান। এ অবস্থায় দৃশ্যত বিরুনি নিজেও কিছু দিন লুকিয়ে থাকেন। এরপর ৩৮৭ হিজরিতে তিনি ফিরে যান জন্মভূমি কাস শহরে। একই বছরে তিনি সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হন। বিরুনি অন্য একজন ইরানি গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদকে বাগদাদ শহরে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করতে বলেছিলেন। আর এ দুই শহরের সূর্যগ্রহণের সময়ের ব্যবধান থেকে বিরুনি কাস ও বাগদাদ শহরের ভৌগলিক দূরত্বও নির্ণয় করতে সক্ষম হন।   

যুবক বিরুনি যৌবনেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেন যে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আবুল ওয়াফায়ি বুজজানি বৃদ্ধ বয়সেও তার সঙ্গে সহযোগিতা করতে রাজি হন।  

কিছুকাল পর আল-বিরুনি ইরানের রেই শহর সফর করেন। রেই শহরটির অবস্থান আধুনিক তেহরানের পাশেই। এখানে তিনি দু’জন প্রখ্যাত ইরানি গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি একটি প্রবন্ধ লিখেন। এই প্রবন্ধটির বিষয়বস্তু ছিল ওই দুই বিজ্ঞানীর কোনো একজনের তৈরি করা মহাকাশ-পর্যবেক্ষন যন্ত্রের ও পর্যবেক্ষনের বিবরণ। বিরুনির মতে আবু মুহাম্মাদ খাজান্দি নামের ওই  ইরানি বিজ্ঞানীর তৈরি করা মহাকাশ-পর্যবেক্ষন যন্ত্রটি ছিল সে সময়কার শ্রেষ্ঠ ও নিখুঁত পর্যবেক্ষণ-যন্ত্র।

হিজরি চতুর্থ শতকের শেষের দিকে আবু রায়হান বিরুনি ইরানের গোরগান শহরে যান এবং এখানে তিনি ‘আসার আল বাকিয়া’ নামের বইটি লেখেন। এ সময় তার বয়স ছিল ত্রিশ। এর আগে তিনি সাতটি বই লেখেন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে প্রখ্যাত ইরানি বিজ্ঞানী ইবনে সিনার সঙ্গে মত-বিনিময় করেন। আলবিরুনি ৩৯৩ হিজরিতে গোরগানে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেন।

হিজরি ৪০০ সনে প্রায় ৪০ বছর বয়সে বিরুনি আবারও ফিরে আসেন খারেজমে। সেখানে তিনি আবুল আব্বাস মামুন ইবনে মামুনের দরবারের সদস্য হন। তার উৎসাহ ও সহযোগিতায় তিনি এখানে মহাকাশ বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষন সম্পন্ন করেন। তিনি পর্যবেক্ষনের এক বড় বৃত্তাকার যন্ত্রও আবিষ্কার করেছিলেন সে সময়। ৪০৭ হিজরিতে ইবনে মামুন তার সেনাদের হাতে নিহত হন।

পরের বছর গজনির সুলতান মাহমুদ গোরগাঞ্জে হামলা চালান এবং বিরুনিসহ বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা বিজ্ঞানীকে গজনিতে তথা বর্তমান আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে নিয়ে যান। তিনি মামুন বিন মামুনের দরবারে জ্ঞানী-গুণীদের সমাবেশের বিষয়টি জানতেন। এই মনীষীদের তার রাজ্যে পাঠিয়ে দিতে তিনি মামুনকে বলদর্পি এক  চিঠি দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।  জ্ঞানী-গুণিদের হাতের নাগালে আনার জন্য হুমকি ও  হামলার এমন ঘটনা খুবই বিরল ও বিস্ময়কর। প্রখ্যাত চিকিৎসা-বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ইবনে সিনা এবং আবু সোহেল ঈসা মাসিহি সুলতান মাহমুদকে এড়ানোর জন্য পশ্চিম দিকে পালিয়ে যান। 

আবু রায়হান বিরুনি তার বাদ-বাকি জীবন তথা প্রায় তিন দশক গজনির সুলতানদের দরবারেরই অতিবাহিত করেন। দুঃখজনকভাবে বিরুনির জীবনের এই অধ্যায় সম্পর্কে স্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায় না। দৃশ্যত তিনি সে সময় জ্যোতির্বিদ হিসেবেই বেশি খ্যাত ছিলেন।

বিরুনি বেশ কয়েক বছর বা অন্তত এক যুগের এক বড় অংশ ব্যয় করেছেন ভারত সম্পর্কিত গবেষণায়।  এ সময় তিনি সংস্কৃতিসহ ভারতের নানা ভাষাও রপ্ত করেন। এ ছাড়াও এ সময় দর্শনসহ ভারতীয়দের নানা জ্ঞান সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন করেন বিরুনি।

বলা হয় সুলতান মাহমুদ ভারতে হামলার সময় বিরুনিকে নিজ সেনাদলের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। এইসব সফরে বিরুনি ভারতীয় পণ্ডিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বা তাদের সম্পর্কে জানতে পারেন।  আর এইসব অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি লিখেছেন ভারত সম্পর্কিত বিশ্বখ্যাত বই ‘তাহকিকে মেলালে হেন্দ বা ভারতীয় জাতি সম্পর্কিত গবেষণা’। ভারত সম্পর্কিত মূল্যবান নানা তথ্য তিনি তুলে ধরেছেন এ ঐতিহাসিক বইয়ে। বিরুনির এ বইটি লেখা সম্পন্ন হয়েছিল ৪২১ হিজরিতে।  এ বছরই মারা যান গজনির সুলতান মাহমুদ। মাহমুদের পর গজনির অন্যান্য সুলতানরাও বিরুনিকে বিজ্ঞান-গবেষণা চালিয়ে যেতে উৎসাহ ও সহায়তা দেন।#