পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব (আবু রায়হান বিরুনি-২)
‘পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব’ শীর্ষক আলোচনার ১৬তম পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। গত পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা বিশ্ব-বিশ্রুত ইরানি মনীষী আবু রায়হান বিরুনি সম্পর্কে আলোচনা করব।
গত পর্বে আমরা সুলতান মাহমুদের দরবারে আলবিরুনির অবস্থান ও ভারতে এই সুলতানের অভিযানের সুবাদে সেখানে বিরুনির সফরসহ তার জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকের কথা শুনেছি। বিরুনি ভারত বিষয়ে বহু বছর ধরে গবেষণা করেছেন। আর এ গবেষণার ফসল হিসেবেই তিনি ভারতীয় জাতি সম্পর্কিত অমূল্য বইটি লিখেছিলেন। বিরুনি গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কেও বই লিখেছেন। আল-বিরুনি যে শহরেই যেতেনে সেই শহরের ভৌগলিক পরিমাপ বের করতেন। তিনি ৪১৬ হিজরিতে নন্দানা দূর্গে থাকার সময় কাছাকাছি এলাকার একটি পাহাড় ব্যবহার করে পৃথিবীর ব্যাস মাপেন। আর এইসব গবেষণার ফল তিনি তুলে ধরেন পৃথিবীর পরিমাপ সম্পর্কিত একটি বইয়ে।
সুলতান মাহমুদের পর নতুন সুলতান হয়েছিলেন মাসুদ গজনাভি। তিনিও বিরুনিকে জ্ঞান-গবেষণার কাজে মদদ যুগিয়ে যান। মাসুদের শাসনামলে বিরুনি জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে ‘কানুনে মাসুদি’ নামের অত্যন্ত মূল্যবান এক বই লেখেন। কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে মাসুদ বিরুনিকে কয়েক ব্যাগ-ভরা স্বর্ণ ও রোপ্য মুদ্রা উপহার দেন। কিন্তু বিরুনি সেসব সোনা-রূপা রাজকোষে ফিরিয়ে দেন এবং সুলতান মাসুদকে জানান যে তিনি চিরকাল সাদামাটা জীবনেই অভ্যস্ত; আর এই অভ্যাস ভাঙ্গা তার জন্য খুবই কষ্টকর।
৪১৫ হিজরিতে ভলগা অঞ্চলের এক তুর্কি প্রতিনিধিদল গজনি আসেন। মেরু অঞ্চলের লোকদের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য-যোগাযোগ ছিল। বিরুনি ওই অঞ্চল সম্পর্কে তাদের কাছে জানতে চাইলে সুলতান মাহমুদের সামনে তাদের একজন জানান যে উত্তর মেরু-অঞ্চলে অনেক দিন ধরে সূর্যাস্ত ঘটে না। সুলতান মাহমুদ এ কথা শুনে রেগে যান। তিনি এ ধরনের কথাকে খোদাদ্রোহী বলে অভিহিত করেন। কিন্তু বিরুনি বলেন যে ওই ব্যক্তির বক্তব্য বিজ্ঞান-সম্মত ও সঠিক এবং তিনি সুলতানের কাছে এই বৈজ্ঞানিক বিষয়ের ব্যাখ্যা তুলে ধরে তাকে শান্ত করেন।
আবু রায়হান বিরুনি খনিজ-বিদ্যা এবং চিকিৎসা ও ঔষধ-শিল্প সম্পর্কেও কয়েকটি বই লিখেছেন। বিরুনি মারা যান ৪৪০ হিজরিতে ৭৭ বছর বয়সে। প্রখ্যাত ইসলামী আইনবিদ আবুল হাসান আলী বিন ঈসা বিরুনির মৃত্যুর আগের মুহূর্তে তার শয্যার পাশে ছিলেন। বিরুনির নিঃশ্বাস যখন বন্ধ হয়ে আসছিল তখনও জ্ঞানপ্রেমিক এই মনীষী আবুল হাসানের কাছে ইসলামী আইন বিষয়ে একটি প্রশ্ন করেন। আবুল হাসান এমন সংকট মুহূর্তেও এমন প্রশ্ন শুনে বিস্মিত হয়ে বলেন: এখন কি আর এমন প্রশ্ন করার সময়? বিরুনি বলেন: এমন প্রশ্নের উত্তর জেনে মারা যাওয়া কি তা না জেনেই মারা যাওয়ার চেয়ে ভালো নয়? ফলে আবুল হাসান ওই বিষয়টি তার কাছে খুলে বলেন ও বিরুনিও তা শিখে নেন। এরপর বিরুনির ঘর থেকে বের হয়েই আবুল হাসান শুনতে পান যে ওই ঘর থেকে কান্নার রোল উঠেছে। অর্থাৎ ইন্তেকাল করেছেন আল বিরুনি।
ভিয়েনায় জাতিসংঘ দপ্তরের সামনে রয়েছে জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থ-বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিশ্ববিশ্রুত চার ইরানি মনীষীর প্রতিকৃতি-তুলে-ধরা ভাস্কর্য। এদের একজন হলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের কিংবদন্তী ইবনে সিনা। দ্বিতীয় ভাস্কর্যটি হল চতুর্থ ও পঞ্চম হিজরির বিখ্যাত গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ ও ইতিহাসবিদ বিরুনির। তৃতীয় ভাস্কর্যটি হল বিখ্যাত গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক ও কবি ওমর খৈয়ামের। আর চতুর্থ ভাস্কর্যটি হল বিখ্যাত চিকিৎসাবিদ, দার্শনিক ও রসায়নবিদ জাকারিয়া রাজির।
বিরুনি জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও ভূগোল ছাড়াও ভূতত্ত্ব, পদার্থবিদ্যা এবং নৃতত্ত্বেও বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ইউরোপীয় গবেষকদের মতে, আল-বিরুনি ১৮০টি বই লিখেছিলেন। এর মধ্যে ১১৫ টি বই ছিল গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ের। এসবের মধ্যে বর্তমানে কেবল ২৮ টি বই বর্তমান যুগে টিকে আছে। অ্যাডওয়ার্ড যাখাও মনে করেন, বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিভাবান মনীষী হলেন আল বিরুনি। কারণ তিনি ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, গণিত, জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিদ্যাসহ বহু শাস্ত্রেই পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।
দুঃখজনকভাবে আরবী বইয়ের ল্যাটিন অনুবাদ আন্দোলন চলাকালে তথা ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে বিরুনির কোনো বইই ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করা হয়নি। সম্ভবত ইসলামী যুগের জীবনীকাররা বিরুনি সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন। বিরুনি টলেমি যুগের জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে সমালোচনামূলক বই বা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। কিন্তু সেই লেখা এখন আর পাওয়া যায় না। অথচ একই বিষয়ে বিরুনির সমসাময়িক যুগের বিজ্ঞানী ইবনে হাইথাম ও খাজা নাসিরউদ্দিন তুসির লেখা আজও পাওয়া যায়। এইসব লেখনী ইসলামী যুগে সপ্তম ও অষ্টম শতকের জ্যোতির্বিদ্যার খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং এই লেখাগুলো কোপার্নিকাসকে করেছে প্রভাবিত। বিরুনি বৈজ্ঞানিক সূত্র বা তত্ত্বের বিশুদ্ধতা নির্নয়ের জন্য ব্যবহারিক পরীক্ষা পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছিলেন যা ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে আজ বিজ্ঞান-গবেষণার মূল বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
আবু রায়হান বিরুনি আলোক-বিদ্যা বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি এটা আবিষ্কার করেন যে শব্দের গতির চেয়েও আলোর গতি বেশি। বিরুনির এ আবিস্কারের কয়েক শত বছর পর পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা এ বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন।
বিরুনি পৃথিবীর আয়তন বা ক্ষেত্রফল নির্ণয় করেছিলেন এবং তিনি পৃথিবীর ব্যাসার্ধ মাপার সমীকরণও উপহার দিয়েছেন। তিনি কয়েকটি দেশের ইতিহাস সম্পর্কেও বই লিখেছেন। বিরুনিই ছিলেন প্রথম বিজ্ঞানী যিনি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভুগোল বিষয়ে গবেষণা করেছেন এবং বিজ্ঞান-চর্চাকে গণিতের ভিত্তির ওপর দাঁড় করান। মানচিত্র তৈরির যে নতুন পদ্ধতি তিনি উপহার দেন তার ভিত্তি ছিল গণিত ও জ্যামিতির মিশ্রণ। বালখ শহরের যে ভৌগলিক পরিমাপ বিরুনি নির্ণয় করেছিলেন তা আধুনিক পরিমাপের খুব কাছাকাছি হয়েছিল। বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের এক হাজার বছর আগে বিরুনি বলেছিলেন, বস্তুর মধ্যে রয়েছে অতি ক্ষুদ্র কণিকা। বর্তমান যুগে একে বলা হয় ফোটোন।
আল-বিরুনি ক্যালেন্ডার বা দিন-পঞ্জির হিসাবেও পরিবর্তন যা ছয় শতক পরে তৈরি গ্রেগরির পঞ্জিকার চেয়েও অনেক বেশি উন্নত ছিল। বিরুনি পৃথিবীর ঘুর্ণন-গতি, মাধ্যাকর্ষণ ও গোলাকৃতি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি নির্দিষ্ট অক্ষকে ঘিরে পৃথিবীর আবর্তন, সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর বৃত্তাকার ঘূর্ণন নিয়েও গবেষণা করেন। কোপার্নিকাস, নিউটন ও কেপলার বিরুনির ছয়শ’ বছর পরে এসব বিষয়ে গবেষণা করেন।#
পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/১৫