ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০১৭ ১৫:০৩ Asia/Dhaka

পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব’ শীর্ষক আলোচনার ১৮তম পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। আমরা বিশ্ব-বিশ্রুত ইরানি মনীষী আবু রায়হান বিরুনি সম্পর্কে আলোচনা করব ও সময় থাকলে ইরানের আরো একজন বিশ্বখ্যাত মনীষীর পরিচিতি সংক্রান্ত আলোচনা শুরু করব।

আবু রায়হান বিরুনি সম্পর্কে এটাও বলা হয়ে থাকে যে তিনি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কথাও বলে গেছেন। তিনি বলেছেন যে এই শক্তির আকর্ষণ বা টানের কারণেই পৃথিবীর বাতাসে নিক্ষিপ্ত বস্তু মহাবিশ্বে ছিটকে পড়ে না ও পৃথিবীর কোনো  স্থির বস্তুও মহাশূন্যে পড়ে যায় না।

বিরুনির এই বক্তব্যের শত শত বছর পর নিউটন আপেল পড়ার ঘটনা থেকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিষয়টি উপলব্ধি করেন। বিরুনি পশ্চিমা বিজ্ঞানী কোপার্নিক ও গ্যালিলিও’র শত শত বছর আগে সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘূর্ণনের কথা বলে গেছেন। বিরুনি বিনা বাধায় ও স্বাধীনভাবে তার এইসব বৈজ্ঞানিক মত ব্যক্ত করতে পেরেছিলেন এবং অন্যান্য মুসলিম বিজ্ঞানীরা বিরুনির এইসব বক্তব্য মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু শত শত বছর পর গ্যালিলিওসহ পাশ্চাত্যের অনেক বিজ্ঞানী একই ধরনের মত ব্যক্ত করতে গিয়ে সেখানকার ক্ষমতাধর গির্জার রোষানলের শিকার হয়েছিলেন এবং অনেকেই এ কারণে মৃত্যুদণ্ডের শিকার হয়েছেন! ইতালির এক বিজ্ঞানীকে বৈজ্ঞানিক সত্য মত প্রকাশের কারণে কথিত আদালতের বিচারকদের রায়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়!

বিরুনি সন ও তারিখের গণনা তথা পঞ্জিকার গণনায়ও সংস্কার এনেছিলেন। তার সংস্কার-করা পঞ্জিকা ছিল ছয়শত বছর পরে পোপ গ্রেগরির সংস্কার-করা পঞ্জিকার চেয়েও বেশি উন্নত ও শুদ্ধ। তিনি সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘূর্ণন ও নিজ অক্ষকেন্দ্রীক পৃথিবীর ঘূর্ণন,পৃথিবীর গোলাকার হওয়া ও বার্ষিক গতির কথা বলে গেছেন কোপার্নিক,কেপলার ও নিউটনের মত পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের ছয়শত বছর আগেই! গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যাসহ বিজ্ঞানের নানা বিষয়ের ওপর অভিধান বা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যার বইও লিখে গেছেন আলবিরুনি। পরবর্তীকালে তার সেই বই সব সময়ই ব্যবহার করেছেন পশ্চিমা পণ্ডিতরা।  

বিরুনি জ্যামিতিক গুণোত্তর ধারার যোগফল গণনার পদ্ধতিসহ নানা ধরনের পরিমাপ পদ্ধতি ও ফোয়ারার পানি উত্তোলন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি পৃথিবীর ব্যাসার্ধ ও সমভূমির বরাবরে সূর্যের অক্ষকেন্দ্রীক কোনের পরিমাপ করেছেন আজ হতে প্রায় হাজার বছর আগে যখন আধুনিক পরিমাপ যন্ত্র বলতে কিছুই ছিল না। বিরুনির হিসেবে সমভূমির বরাবরে সূর্যের অক্ষকেন্দ্রীক কোনের পরিমাপ হয়েছিল ২৩ ডিগ্রি ৩৫ মিনিট। আর আধুনিক পদ্ধতিতে এর পরিমাপ হল ২৩ ডিগ্রি ২৭ মিনিট। বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে এতসব অমূল্য অবদানের জন্য আলবিরুনিকে বলা হয় আধুনিক যুগের মানুষ।

এবার আমরা আলোচনা করব বিখ্যাত ইরানি গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক, ভূগোলবিশারদ ও ইতিহাস-বিশেষজ্ঞ আবু জাফার মুহাম্মাদ ইবনে মুসা খারেজমি সম্পর্কে। তার জন্ম ও মৃত্যুর সুস্পষ্ট তারিখ পাওয়া যায়নি। তবে এটা স্পষ্ট যে তিনি আব্বাসিয় শাসনামলে জীবন যাপন করেছেন। তার জন্ম হয়েছিল খারেজমে ১৮৫ হিজরিরও আগে। খারেজম অঞ্চলটি বর্তমানে উজবেকিস্তান নামে পরিচিত।

বিজ্ঞানী হিসেবে খারেজমির খ্যাতি মূলত গণিতে ও বিশেষ করে বীজগণিতে তার অমূল্য অবদানের কারণে। তাকে বলা হয় বীজগণিত বা অ্যালজ্যাবরার জনক। খারেজমি সে সময়কার গণিতবিদ্যায় যতটা প্রভাব ফেলেছিলেন আর কেউই সে যুগে ততটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। মার্কিন ইতিহাসবিদ জর্জ সার্টন ‘বিজ্ঞানের ইতিহাসের একটি ভূমিকা’ শীর্ষক বইয়ে হিজরি নবম শতককে খারেজমির যুগ বলে অভিহিত করেছেন।

বিশ্ববিশ্রুত ইরানি গণিতবিদ খারেজমির লেখনীকে গবেষকরা আধুনিক যুগেও ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। মধ্যযুগের প্রখ্যাত অনেক অনুবাদকই বীজগণিত সম্পর্কে খারেজমির লেখা বই অনুবাদ করেছেন।  

খারেজমি মূলত বীজগণিতের রৈখিক ও দ্বিঘাত সমীকরণ সম্পর্কিত সূত্র বা প্রতিজ্ঞাগুলোতে বেশি দক্ষ ছিলেন।  ভারতীয় সংখ্যার যোগ ও বিয়োগ সম্পর্কে তার লেখা বইয়ের অনুবাদের সুবাদেই ইউরোপে গৃহীত হয়েছে ভারতীয়-আরবীয় সংখ্যা পদ্ধতি যা আজও ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিন্ন।   

অ্যালজ্যাবরা শব্দ বা পরিভাষাটিই ইউরোপীয়রা চালু করেছিল খারেজমির বই থেকেই। আর গণিতের ‘লগারিদম’ শাখাটির নামকরণই করা হয়েছে খারেজমির নামে। আব্বাসিয় শাসক মামুনের শাসনামলে খারেজমি রাজ-দরবারের সদস্য হন। তিনি বাগদাদের বিজ্ঞানী-সভারও সদস্য ছিলেন।  

বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে অনেক বই লিখেছেন খারেজমি। কিন্তু খারেজমির জীবন সম্পর্কে খুব কম তথ্যই জানা যায়। কারণ খারেজমি সম্পর্কিত বেশিরভাগ বইয়ে মূলত তার বৈজ্ঞানিক অবদানগুলোই তুলে ধরা হয়েছে। মনে করা হয় যে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন ১৬৪ থেকে ১৮৪ হিজরির মধ্যে। আর সম্ভবত তার মৃত্যু ঘটেছিল ২৩২ হিজরিতে।

অ্যালজ্যাবরা সম্পর্কিত খারেজমির বইয়ের ভূমিকা পড়লে বোঝা যায় যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক মুসলমান। দৃশ্যত তার পরিবার ছিল ট্রান্স-অক্সিয়ানা ও খোরাসান অঞ্চলের অধিবাসী। আব্বাসিয় শাসক মামুন যখন বাগদাদ শহর নির্মাণ করাচ্ছিলেন তখন খারেজমি বাগদাদকে নিজের আবাসস্থল হিসেবে বেছে নেন।  

উমাইয়া রাজবংশের পতন ঘটেছিল ১৩২ হিজরিতে। এরপর শুরু হয় আব্বাসিয় রাজতান্ত্রিক শাসন। এই নতুন রাজবংশের ক্ষমতা জোরদারে সহায়তা করেছিল ইরানিরা। আব্বাসিয় দরবারের গুরুত্বপূর্ণ নানা পদে আসীন ছিল ইরানিরা।

ইরানিরা গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার চর্চাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিত। ফলে ইরানি মন্ত্রীদের উৎসাহে বিজ্ঞান-চর্চায় সক্রিয় বিজ্ঞানীদের সহায়তা দিতে আগ্রহীন হন আব্বাসীয় শাসকরা।

খারেজমির জন্মের কিছু আগে আব্বাসিয় শাসক হন হারুন। তার শাসনামলে ইরানের বার্মাকি বংশ প্রধানমন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পালন করেছে। এই বংশ বিজ্ঞানী ও জ্ঞানী-গুনিদের সহায়তা দেয়ার ঐতিহ্য বজায় রাখে। বার্মাকিরা গ্রিক ও সুরিয়ানি ভাষায় লেখা বিজ্ঞান ও দর্শন সম্পর্কিত বইগুলোকে আরবিতে অনুবাদের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাত। খারেজমি মামুনের শাসনামলে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। মামুনের রাজদরবারের প্রধান গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ হিসেবেই খারেজমি এই সম্মান অর্জন করেন। তিনি ভারতবর্ষের নানা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রথার সঙ্গেও পরিচিত ছিলেন। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ৭