মে ০৬, ২০১৭ ১২:২৭ Asia/Dhaka

বিশ্ববিশ্রুত ইরানি বিজ্ঞানী আবু জাফার বিন মুহাম্মাদ মুসা খারেজমি পৃথিবীর মানচিত্র তৈরির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়। তিনি পৃথিবীর ব্যাসার্ধ মাপারও কার্যক্রমেও অংশ নিয়েছিলেন অন্য কয়েকজন বিজ্ঞানীর মত।

আব্বাসীয় শাসক মামুনের রাজদরবারের বিজ্ঞানী হওয়ার আগে খারেজমি ভারতীয় বীজগণিতের ক্যালকুলাস শেখার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় সহায়তায়। ভারতীয় ক্যালকুলাস সম্পর্কে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছিলেন তিনি। গ্রিক ও ভারতীয়দের গণিতের সমন্বয় করেছিলেন খারেজমি। এভাবে তিনি বীজগণিতে অনেক নতুন আবিষ্কার উপহার দেন। তার উদ্ভাবনগুলো পরবর্তী যুগের গণিতেও ওপর প্রভাব রেখেছিল।

খারেজমি আধুনিক বীজগণিতের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন তৃতীয় হিজরিতে। বীজগণিতের মাধ্যমে তিনি সে যুগে প্রচলিত সব দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান দিয়েছিলেন। ফলে উচ্চতর সমীকরণগুলোর সমাধানের পথও প্রশস্ত হয়েছিল।  একজন ফরাসি গবেষক এ অনস্বীকার্য বাস্তবতা স্বীকার করেছেন যে খারেজমিই ছিলেন ইউরোপীয় জাতিগুলোর বীজগণিত শাস্ত্রের প্রকৃত শিক্ষক।

প্রাচীন যুগের ভারতীয় বিজ্ঞানীদের বই থেকে জানা যায় ব্যাবিলন ও ভারত কোনো কোনো দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান বের করেছিল। এই সমাধানগুলোকে কাজে লাগানো হত মানুষের দৈনন্দিন নানা চাহিদা পূরণের কাজে এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির লক্ষে সমীকরণের ওই সমাধানগুলো উপস্থাপন করা হয়নি। ওই সমাধানগুলোর বৈজ্ঞানিক কোনো যুক্তিও ছিল না। 

খারেজমির উদ্ভাবনগুলোর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল তার যুগের সব দ্বিঘাত সমীকরণের ওপর গবেষণা চালানো। দ্বিতীয় পর্যায়ে তিনি এইসব সমীকরণের সমাধান তুলে ধরেন। আর তৃতীয় পর্যায়ে তিনি জ্যামিতির মাধ্যমে এইসব সমাধানগুলোর যথার্থতা প্রমাণ করেন। বীজগণিতের হিসাব সংক্রান্ত তার এই উদ্ভাবনগুলো আধুনিক বীজগণিতের ভিত্তি উপহার দেয়। খারেজমির বইগুলো ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হওয়ায় এই বিজ্ঞান মধ্যযুগের ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ে এবং তা গণিত শাস্ত্রের বড় ধরনের নানা অগ্রগতির মাধ্যমে পরিণত হয়।

ষোড়শ শতকে ইতালিয় গণিতবিদ নিকোলো টর্টাগলিয়া ও জেরোলামো কার্দানো খারেজমির অ্যালজাবরা বইটির ল্যাটিন অনুবাদ পড়েন। তারা খারেজমির ওই বইয়ের দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধানগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান বের করতে সক্ষম হন। এভাবে খারেজমির বীজগণিত আধুনিক গণিতের উন্নয়নে বড় ধরনের প্রভাব রেখেছে।

পরবর্তী যুগে ওমর খৈয়াম অ্যালজাবরাকে ক্যালকুলাস থেকে পৃথক করেন। এভাবে বীজগণিত শাস্ত্রের অগ্রগতি ঘটতে থাকে।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক জর্জ সার্টন তার লেখা  ‘বিজ্ঞানের ইতিহাস’ শীর্ষক বইয়ে খ্রিস্টীয় নবম শতকের প্রথম ৫০ বছরকে খারেজমির যুগ বলে এই বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

খারেজমির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ইরানে অনুষ্ঠিত হয় বিজ্ঞান মেলা এবং এই মেলায় বিজ্ঞানের নানা শাখায় সৃষ্টিশীল গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য পুরস্কার দেয়া হয় দু’জন ছাত্রকে। এ ছাড়াও খারেজমির অমূল্য অবদানগুলোর স্মরণে ২৬ অক্টোবরকে ইরানে পালন করা হয় অ্যালজাবরা দিবস হিসেবে। উল্লেখ্য, আমরা আগেও হয়তো বলেছি যে খারেজমিকে বলা হয় আধুনিক বীজগণিতের জনক।

গণিত সংক্রান্ত খারেজমির একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম ‘ক্যালকুলাস বিষয়ের একটি প্রাথমিক রচনা’।  এই বইটিতেই প্রথমবারের মত সংখ্যার স্থানগত মূল্য পদ্ধতির ব্যাখ্যা দেয়া হয় অত্যন্ত যৌক্তিক ও সুশৃঙ্খল পন্থায়। এ বইটির কেবল একটি ল্যাটিন অনুবাদ আজও টিকে রয়েছে। বইটি রাখা হয়েছে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে। এই বইটিতে খারেজমি সংখ্যার যোগ, বিয়োগ, দ্বিগুণন, বহুগুণন, ভাগ, অর্ধায়ন এবং পূর্ণ সংখ্যার বর্গায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি এ বইয়ে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের ভারতীয় গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ আর্যভট্টের পদ্ধতির আলোকে  পূর্ণ বা মৌলিক সংখ্যাগুলোর বর্গমূল তুলে ধরেছেন। ল্যাটিন ভাষায় খারেজমির এ বইটির অনুবাদ করেছিলেন  ‘রবার্ট অফ চেষ্টার’।

খারেজমির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল মুসলিম বিশ্বে গ্রিক ও ভারতীয় বিজ্ঞানগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন। ইসলামের ইতিহাসে তিনিই প্রথম এই কাজ করেছেন। প্রাচ্য ও প্রাচ্যের মধ্যে বিপুল দূরত্ব এবং বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি স্থানান্তরে নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও এই অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছিলেন খারেজমি।

বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন খারেজমি। যেমন, অস্ট্রোল্যাব বা জ্যোতির্বিদ্যা ও ভূগোল-বিদ্যার পরিমাপ সংক্রান্ত নানা যন্ত্রপাতির বিষয়ে দু’টি বই লিখেছেন তিনি। তিনি পৃথিবীর একটি মানচিত্র তৈরি করেছিলেন এবং টলেমির ভৌগলিক মানচিত্রের উন্নয়ন ঘটান। জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত খারেজমির একটি পুস্তিকার নাম ‘জিজ আল সিন্ধ হিন্দ’। এ বইটির মূল টেক্সট ছিল সংস্কৃতি ভাষায়। বইটি ইসলামী বিশ্বে প্রথমবারের মত এনেছিলেন একজন কূটনীতিবিদ। সে সময়টা ছিল আব্বাসিয় শাসক মানসুরের শাসনামল। ‘জিজ’ বলতে বোঝায় জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত নানা সারণি বা তালিকার টেবিল। খারেজমির এ বইয়ের অনুবাদের ভিত্তিতে মুহাম্মাদ ইবনে ইব্রাহিম ফাজারি ও ইয়াকুব ইবনে তারিখ নামের দু’জন বিজ্ঞানী দ্বিতীয় শতকের শেষের দিকে কয়েকটি পুস্তিকা লিখেছেন। খারেজমি এ বই লিখেছিলেন আরবি ভাষায়। জ্যোতির্বিদ্যার বিষয়ে এটাই প্রথম আরবি বই যা আজোও পুরোপুরি অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে। খারেজমি জ্যোতির্বিদ্যার সারণীগুলো তৈরির সময় অন্যান্য ইরানি বিজ্ঞানীদের লেখনীকেও গুরুত্ব দিয়েছেন।

 খারেজমির ‘জিজ আল সিন্ধ হিন্দ’ শীর্ষক বইটিকে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগিয়েছিলেন বিশ্ববিশ্রুত ইরানি বিজ্ঞানী আবু রায়হান আলবিরুনি। তিনি খারেজমির বক্তব্যগুলোর ব্যাখ্যাও দিয়ে গেছেন। খারেজমির এই বই তথা ‘জিজ আল সিন্ধ হিন্দ’ ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয় ১১২৬ সালে। ল্যাটিন অনুবাদটিতে খারেজমির গাণিতিক কাঠামো ও সারণীগুলোর বৈজ্ঞানিক মূল্য সম্পর্কেও  গবেষণামূলক ব্যবহারিক পর্যালোচনা দেয়া হয়েছে। এ বইয়ে উল্লেখিত খারেজমির গাণিতিক উপাত্তগুলো থেকে তার সারণীগুলোর উৎসকেও সনাক্ত করা সম্ভব। #

 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ৬