‘পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব’ (বিশ্ব-বিশ্রুত ইরানি মনীষী খারেজমি -২)
গত পর্বের আলোচনায় আমরা অ্যালজাবরা ও গণিতের নানা শাখা ছাড়াও বিজ্ঞানের নানা বিভাগে বিশ্ববিশ্রুত ইরানি বিজ্ঞানী আবু জাফার বিন মুহাম্মাদ মুসা খারেজমির অবদান সম্পর্কে কিছু কথা বলছিলাম।
আমরা জেনেছি যে অস্ট্রোল্যাব বা জ্যোতির্বিদ্যা ও ভূগোল-বিদ্যার পরিমাপ সংক্রান্ত নানা যন্ত্রপাতির বিষয়েও দু’টি বই লিখেছেন তিনি। তিনি পৃথিবীর একটি মানচিত্র তৈরি করেছিলেন এবং টলেমির ভৌগলিক মানচিত্রের উন্নয়ন ঘটান। জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত খারেজমির একটি পুস্তিকার নাম ‘জিজ আল সিন্ধ হিন্দ’।
জ্যোতির্বিদ্যা ও ভৌগলিক পরিমাপ সম্পর্কিত তার অন্য দু’টি বই ছিল এ দুই বিষয়ের পরিমাপ যন্ত্রগুলোর পরিচিতি ও ব্যবহারের বর্ণনা। খারেজমি ‘আর রোখামিহ’ নামের একটি বই লিখেছিলেন। এর বিষয়বস্তু ছিল সূর্যঘড়ি। তার এই তিনটি বইয়েরই মূল কপি তথা আরবি কপি বা কিংবা সেগুলোর অনুবাদ আর পাওয়া যায় না। খারেজমির সমসাময়িক যুগের লেখকরা এ তিনটি বইয়ের কথা উল্লেখ করেছিলেন বলেই তার এই বইগুলোর কথা জানা যায়।
খারেজমির ‘আর রোখামিহ’ বইটির ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে বৃত্তাকার-ত্রিকোনোমিতি বিষয়ক শাস্ত্র। ইরানের এই মহান বিজ্ঞানী একজন জ্যোর্তিবিদ, ভূগোলবিদ ও ইতিহাসবিদ হিসেবে অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং যথাযথ মতামত রেখেছেন তার আরেকটি পুস্তকে। হাতে-লেখা এই পুস্তিকাটি বর্তমানে ভারতে সংরক্ষিত রয়েছে।
ভূগোলবিদ ও ঐতিহাসিক হিসেবেও খারেজমির নাম-ডাক রয়েছে। ‘সুরাত আল আরদ’ ও ‘আততারিখ’ নামে দু’টি বই লিখেছিলেন এই মহান বিজ্ঞানী। ‘সুরাত আল আরদ’ বইয়ে নানা অঞ্চল ও শহরের দৈর্ঘ ও প্রস্থ তুলে ধরেছেন খারেজমি। টলেমির বইতে যেসব স্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল খারেজমিও সেসব স্থানের নাম উল্লেখ করেছেন। ‘সুরাতুল আরদ’ বইটি ইতালিয় ভাষায় অনুবাদ করেছেন কার্লো আলফোনসো নালিনো। নালিনোর মতে খারেজমি যেসব মানচিত্র একেঁছেন সেগুলো টলেমির মানচিত্রের চেয়ে অনেক বেশি সঠিক, বিশেষ করে খারেজমির তৈরি-করা মুসলিম শাসনাধীন অঞ্চলের মানচিত্রগুলো টলেমির মানচিত্রের চেয়ে অনেক বেশি সঠিক ও উন্নত। এইসব মানচিত্র তিনি এঁকেছিলেন আব্বাসিয় শাসক মামুনের নির্দেশে।
খারেজমির ‘সুরাতুল আরদ’ বইটিতে রয়েছে ছয়টি অধ্যায়। এ বইয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের শহর-নগর, পাহাড়-পর্বত, সাগর, নদ-নদী ও দ্বীপের বর্ণনা রয়েছে।
খারেজমির ‘আততারিখ’ বইটির কোনো চিহ্ন আজকাল আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু বহু ঐতিহাসিক ইসলামী যুগের নানা ঘটনাবলী তুলে ধরতে এ বইয়ের বর্ণনা বা উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন। খারেজমি জ্যোর্তিবিদ্যার নানা সূত্র বা নীতিমালার চর্চা করতে গিয়ে ইতিহাসের ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন বলে মনে করা হয়। বিখ্যাত ঐতিহাসিক মাসুদি তার বইয়ে খারেজমিকে একজন খ্যাতিমান ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেছেন। আরও বেশ কয়েকজন ঐতিহাসিক খারেজমির ইতিহাস সংক্রান্ত বইয়ের নানা তথ্য তুলে ধরেছেন।
বিশ্ব-বিশ্রুত ইরানি মনীষী খারেজমি সম্পর্কে আমাদের আলোচনা আজ এখানেই শেষ করছি।
এবারে আমরা আরও একজন বড় ইরানি মনীষীর জীবনী নিয়ে আলোচনা করব। ইরানের এই মনীষী চিকিৎসা-বিজ্ঞান জগতের এক বড় তারকা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। এই মহান চিকিৎসা-বিজ্ঞানীর নাম সাইয়্যেদ ইসমাইল জোরজানি। তিনি ছিলেন হিজরি পঞ্চম শতকের মনীষী। তাঁর জন্ম হয়েছিল ইরানের জোরজানে যার বর্তমান নাম গোরগান। কাস্পিয়ান সাগরের কাছে অবস্থিত এই শহরে জোরজানির জন্ম হয়েছিল খ্রিস্টিয় ১০৪২ সনে। বলা হয় যে তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন মূলত ইস্ফাহান শহরের অধিবাসী।
সাইয়্যেদ ইসমাইল জোরজানির যুগে জোরজান শহরটির অবস্থান ছিল উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির চরম শিখরে। তাই তিনি প্রাথমিক পড়াশুনার পর্বটি শেষ করেন এখানেই। জোরজানি যৌবনের প্রাক্কালে এ শহরেই তথা প্রাচীন গোরগানেই শুরু করেছিলেন চিকিৎসা-বিদ্যা অধ্যয়ন।
বিশ্বনন্দিত ইরানি চিকিৎসা-বিজ্ঞানী ইবনে সিনা কিছুকাল জোরজান শহরে ছিলেন। এ সময় তিনি সেখানে চিকিৎসা-বিজ্ঞান সংক্রান্ত তাঁর জগত-বিখ্যাত বই ‘কানুন’ লেখার পাশাপাশি কয়েকজন শিষ্য বা ছাত্রও গড়ে তোলেন।
ইবনে সিনা ছাড়াও আরও একজন বড় বিজ্ঞানী ও চিকিৎসাবিদ সে সময় থাকতেন সেই প্রাচীন গোরগানে। এই বিজ্ঞানীর নাম আবুল ফারাজ আলী ইবনে হুসাইন। তিনি ছিলেন চিকিৎসা-বিজ্ঞান সংক্রান্ত ‘মিফতাহ আততিব’ শীর্ষক বিখ্যাত বইয়ের লেখক। ৪০০ থেকে ৪০৫ হিজরি- এই ৫ বছর তিনি ছিলেন গোরগানে। তিনি এই শহরে বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন। খুব সম্ভবত সাইয়্যেদ ইসমাইল জোরজানি ছিলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবনে সিনা ও আবুল ফারাজের শীর্ষস্থানীয় ছাত্রদের ছাত্র।
জোরজানির লেখনী থেকে জানা যায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য তিনি বেশ কয়েকটি অঞ্চলে সফর করেছিলেন। এসবের মধ্যে রয়েছে নিশাপুর, ফার্স ও খুজিস্তান। এ ছাড়াও জোরজানি একই লক্ষে ইরাকের নানা অঞ্চলে সফর করেছেন। এইসব সফরের মাধ্যমে তিনি অংশ নিতেন প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদদের ক্লাসে।
জোরজানির এইসব সফর থেকে হিজরি পঞ্চম শতকের চিকিৎসা-বিজ্ঞানের বড় ও বিখ্যাত কেন্দ্রগুলোর কথাও জানা যায়। সে যুগে উত্তরপূর্ব ইরানের নিশাপুর শহরটিও ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক বড় কেন্দ্র। এখানে ছিল বেশ কয়েকটি বড় ও বিখ্যাত হাসপাতাল। আবুল কাসেম ইবনে আবি সাদিক নিশাপুরি নামের একজন বিখ্যাত চিকিৎসকের ক্লাসে অংশ নেয়ার জন্যই জোরজানি নিশাপুরে এসেছিলেন।
জোরজানির যুগে তথা এখন থেকে প্রায় হাজার বছর আগে ইরানের রেই শহর ও ইস্ফানেও ছিল নামকরা কয়েকটি বড় হাসপাতাল। সে যুগে শিরাজের একটি হাসপাতাল কেবল অত্যন্ত দক্ষ চিকিৎসকদেরকেই নিয়োগ করতো ওই হাসপাতালের ডাক্তার হিসেবে। সেযুগে খুজিস্তান ও আহওয়াজ অঞ্চলেও থাকতেন বেশ কয়েকজন নামকরা ডাক্তার।
জোরজানি তার লেখনীতে অন্য যে শহরটির কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছেন তা হল পবিত্র ধর্মীয় শহর কোম। তার যুগে এই শহরে বসবাস করতেন বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী। তারা ছিলেন ধর্মীয় বিষয়েও বিশেষজ্ঞ। তারা ধর্মীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান ছাড়াও অন্য অনেক বিষয়ে অধ্যাপনা করতেন। জোরজানি ঠিক কবে কোম শহর সফর করেন তা স্পষ্ট নয়। তবে কোনো কোনো ইঙ্গিত থেকে মনে করা হয় যে জোরজানি ৫০৪ হিজরির কিছু আগে কোম শহরে এসেছিলেন। যৌবনের দিনগুলোতে জোরজানি মার্ভ ও বালখ শহরেও গিয়েছিলেন জ্ঞান অর্জনের জন্য।
জোরজানি জ্ঞান-বিজ্ঞান আয়ত্ত্ব করার জন্য বহু শহর সফর করেছেন। এইসব সফরের উপদেশদাতা বা গাইড ছিলেন তারই শিক্ষককুল। কিন্তু তার সেই শিক্ষকদের বেশিরভাগের নামই অজানা রয়ে গেছে।
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ১৬