আগস্ট ২৩, ২০১৭ ১৬:৩২ Asia/Dhaka

গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানির সমরকন্দের জীবন ও তৎপরতা নিয়ে আমরা কথা বলছিলাম গত পর্বে।

সমরকন্দে মাত্র দুই বছর ছিলেন জামশিদ কাশানি। কিন্তু এ সময়ে তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞানে যেসব অমূল্য অবদান রেখেছেন তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরতেও অনেক কাগজের পাতা দরকার হবে। যেমন, কাশানি সমরকন্দে থাকার সময়  ‘মিফতাহুল হিসাব’ বা পাটিগণিতের চাবিকাঠি নামে প্রাথমিক পাটিগণিতের বিশ্বকোষ রচনা করেছিলেন। তিনি তার এই বইয়ে প্রথমবারের মত দশমিক ভগ্নাংশের বিষয়টি তুলে ধরেন ও এর ব্যাখ্যা দেন। এ ছাড়াও এ বইয়ে তিনি পূর্ণ বা মৌলিক সংখ্যা বের করার উপায় তুলে ধরে এর ব্যাখ্যা দেন। তার এসব উদ্ভাবন ইউরোপে দশমিক ভগ্নাংশের প্রসারে বিস্ময়কর ভূমিকা রেখেছিল। কাশানির এই বইটি ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাটিগণিতের গাইড-বই হিসেবে শত শত বছর ধরে পড়ানো হয়েছে এবং ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও কাশানির এইসব তত্ত্বের প্রয়োগ করা হত।  

 

গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানি সমরকন্দে থাকার সময় ‘রিসালাত আল মুহিতিইয়্যাহ’ বা ‘বৃত্তের পরিধি সম্পর্কিত গবেষণা-পত্র’ নামের একটি বই লিখেছেন। এ বইয়ে তিনি গণিতের বিশিষ্ট সংখ্যা তথা বৃত্তের কোণের পরিমাপে ব্যবহৃত ‘পাইয়ের’ মান ১৬ দশমাংশ পর্যন্ত নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এ ছাড়াও তিনি ‘বৃত্তের জ্যা এবং সাইন সম্পর্কিত গবেষণা-পত্র’ শীর্ষক তার বইয়ে সাইনের এক ডিগ্রির পরিমাপকে সঠিক মানের কাছাকাছি দশ সংখ্যা পর্যন্ত নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। গণিতের তত্ত্বীয় গবেষণা ছাড়াও বিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও তিনি ব্যাপক উদ্ভাবনী ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছিলেন। জামশিদ কাশানি জ্যোতির্বিদ্যার পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত ৮টি যন্ত্র উদ্ভাবন করেছিলেন। ‘জ্যোতির্বিদ্যা বা মহাকাশ পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত যন্ত্রপাতির বিশদ বর্ণনা’ শীর্ষক নিজের এক বইয়ে তিনি ওই ৮ টি যন্ত্রের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। এ বইয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় সংযোজনীতে তিনি কোনো কোনো বিষয়ের পরিমাপ ও পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং বুধ ও চাঁদের কক্ষপথের ডিম্বাকৃতি হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন।

 

জামশিদ কাশানির লেখা ‘পাটিগণিতের চাবি’ বা ‘মিফতাহুল হিসাব’ শীর্ষক বইটি রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বইটির ভূমিকায় লেখা হয়েছে, ‘কাশানি ছিলেন খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের সবচেয়ে বড় গণিতবিদ ও মহাকাশ-বিশেষজ্ঞ। বিভিন্ন বিষয়ে তার আবিষ্কারগুলো মধ্য যুগে জ্ঞানের পরিপূর্ণতার স্বাক্ষর বহন করছে। কাশানির পরীক্ষা-নিরীক্ষার নানা উন্নত পদ্ধতি ও বিস্ময়কর দক্ষতাপূর্ণ কলা-কৌশল আধুনিক যুগের বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিও তার প্রতি আকৃষ্ট করেছে।’

 

জামশিদ কাশানি কেবল এইসব সাফল্য ও অবদানের জন্যই চির-স্মরণীয় হওয়ার যোগ্য। কিন্তু তার আরও এক বড় অবদান হল সমরকন্দের বিশাল মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা।  অনন্য ওই পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি মানবজাতির বিজ্ঞান-গবেষণার ইতিহাসে সূর্যের মত দেদীপ্যমান হয়ে আছে। পরবর্তী যুগের মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। সমরকন্দের সেই মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটির অংশ-বিশেষ আজও টিকে রয়েছে পূর্ব উজবেকিস্তানের সমরকন্দ শহরের পূর্বাঞ্চলে ‘আবে রাহমাত’ নদীর কাছে।

 

বহু বই ও জীবনী গ্রন্থে জামশিদ কাশানির আবিষ্কারগুলোর উল্লেখ দেখা যায়।

 হিজরি নবম শতকের ইরানের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ গিয়াসউদ্দিন খান্দমির ‘হাবিব আসসিয়ার’ শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, মাওলানা গিয়াসউদ্দিন জামশিদ হলেন দ্বিতীয় টলেমি। তিনি আর মানবীয় গুণে পরিপূর্ণ মাওলানা মইনউদ্দিন কাশানি সমরকন্দের সেই মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রেখেছিলেন বলেও খান্দমির উল্লেখ করেছেন। মইনউদ্দিন কাশানি ছিলেন জামশিদ কাশানির ভাগিনা ও তার সহযোগী। তিনি অত্যন্ত সুন্দর হস্তাক্ষরে মামার বইগুলো লিখে গেছেন।

 

সমরকন্দের সেই মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ শুরুর সময় নিয়ে মতভেদ রয়েছে ইতিহাসবিদদের মধ্যে। তবে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্যগুলোকে সমন্বিত করে বলা যায় সমরকন্দের সেই মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ৮২৩ থেকে ৮৩০ হিজরির মধ্যে। ‘চুপান-অ’তা’ বা ‘কুহাক’ নামের একটি ছোটো পাহাড়ের ওপরে ছিল তিন-তলা বিশিষ্ট সেই মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভবন। এর ডিজাইন বা নক্সা তৈরি করেছিলেন জামশিদ কাশানি নিজেই। আর এর যন্ত্রপাতিগুলো কাশানির নির্দেশে তৈরি করেন ওস্তাদ ইব্রাহিম সাফফার।

 

সমরকন্দের মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটির নির্মাণ শেষ হওয়ার পর পর্যবেক্ষণের কাজ পরিচালনা ও এ সংক্রান্ত সারণী বা তথ্য-উপাত্তের গাইড তৈরির দায়িত্ব পেয়েছিলেন জামশিদ কাশানি। কিন্তু তিনি এ সংক্রান্ত কাজ শেষ করার আগেই মারা যান বা নিহত হন। কাশানির বইয়ের হাতে লেখা কপি থেকে জানা যায় তিনি সমরকন্দের সেই মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রেই মারা যান ৮৩২ হিজরিতে। সম্ভবত ‘চুপান-অ’তা’ পাহাড়েই দাফন করা হয় তাকে। অবশ্য কোনো এক বর্ণনা মতে, সমরকন্দের শাহ জান্দ গোরস্তানে দাফন করা হয় কাশানিকে। এ গোরস্তানটি সে যুগের জ্যোতির্বিদ কাজিজাদেহ রুমির কবরের কাছেই অবস্থিত।

 

বিশ্ববিশ্রুত ইরানি বিজ্ঞানী গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানির মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা অস্পষ্টতা রয়েছে। কেউ কেউ বলেন সম্রাট উলুগ বেগই তাকে হত্যা করেছিলেন। কারণ উলুগ বেগ কাশানির ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং মহাকাশ গবেষণা ও জ্যোতির্বিদ্যার সারণি তৈরির কাজে তার সঙ্গে সহযোগিতা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন উলুগ বেগ।

 

যদিও কাশানি তার দু’টি বইয়ে এক ডিগ্রি সাইনের পরিমাপ অত্যন্ত সঠিক মানের কাছাকাছি পর্যায়ে নির্ণয় করতে পেরেছিলেন, কিন্তু উলুগ বেগ তার জ্যোতির্বিদ্যার সারণি সংক্রান্ত বইয়ে এ আবিষ্কারকে নিজের বলে দাবি করেছেন। অনেকেই মনে করেন জামশিদ কাশানির অসাধারণ প্রতিভা, জ্ঞান ও যোগ্যতা তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে হিংসা জাগিয়ে তুলেছিল। ফলে তারা কাশানির সব কাজেই নানা দোষ-ত্রুটি ধরার চেষ্টা করত এবং তার কাজে নানা বাধার পাহাড় গড়ে তুলত। তারা কাশানির নামে নানা অপবাদ প্রচার করত যাতে উলুগ বেগের কাছে কাশানির সম্মান বিলুপ্ত হয়। উলুগ বেগ প্রথম দিকে এসব কথায় কান না দিলেও পরে তাদের প্রচারণায় প্রভাবিত হন এবং কাশানির বৈজ্ঞানিক তৎপরতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান। এভাবে জন্মভূমি থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে-আসা ইরানের এই মহান বিজ্ঞানী কোণঠাসা ও একঘরে হয়ে পড়েন। সর্বত্র তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকানো হচ্ছিল। ফলে কাশানির বাবাও তার ছেলের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পিতা ও পুত্রের চিঠিতে এই উদ্বেগের  বিষয়টি ফুটে উঠেছিল।  

 

১৪২৯ খ্রিস্টাব্দে তথা ৮৩২ হিজরি ১৯ রমজানের ভোরবেলায় সমরকন্দের সেই মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রেই অজ্ঞাত-পরিচয় ব্যক্তিদের হামলায় নিহত হন  ৪২ বছর বয়স্ক গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানি। যে বিজ্ঞান-গবেষণা ও মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ এবং তার উন্নয়নের জন্য জামশিদ কাশানি নিজেকে করেছিলেন পুরোপুরি নিবেদিত সেই অনন্য প্রতিষ্ঠানেই লুটিয়ে পড়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা এই বিজ্ঞানীর নিষ্প্রাণ শরীর।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২১