জুন ১৫, ২০২০ ১৮:১৮ Asia/Dhaka

গত কয়েক পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা হিজরি নবম শতকের তথা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি মনীষী কামালউদ্দিন হুসাইন বিন আলী সাবজাওয়ারি তথা মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির অবদান ও চিন্তাধারা সম্পর্কে আলোচনা করব। বহুমুখী প্রতিভাধর লেখক ও বক্তা হিসেবে খ্যাত এই মহান চিন্তাবিদ সম্পর্কিত আলোচনার আজই শেষ দিন।

হিজরি নবম বা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি মনীষী কামালউদ্দিন হুসাইন বিন আলী সাবজাওয়ারি তথা মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির বিখ্যাত বই রওজাতুশ শুহাদা নিয়ে আমরা গত পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আজ আমরা তার আরও কয়েকটি বিখ্যাত বই নিয়ে কথা বলব। এ বইগুলো হল ফুতুওয়াতনামেহ সুলতানি, আখলাকে মুহ্‌সিনি, তাফসিরে হুসাইনি বা মাওয়াহিবুল আলিয়্যাহ ও আনওয়ারে সুহাইলি। 

'ফুতুওয়াতনামেহ সুলতানি' শীর্ষক বইটির ফুতুওয়াত শব্দের অর্থ হচ্ছে দয়া, মহানুভবতা বা পৌরুষত্য ইত্যাদি। আদিতে এটি একটি ব্যক্তিগত গুণ হলেও সুফিবাদের মাধ্যমে তা সামাজিক রংও ধারণ করেছে। তাই এর সঙ্গে মিশে আছে ধর্মীয় আদব-কায়দাও এবং ফুতুওয়াতনামা লিখতে গিয়ে ধর্মীয় সাহিত্যের একটি বিশেষ স্বতন্ত্র ধারাও সৃষ্টি হয়েছে। ফুতুওয়াতনামাগুলোকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস বা দলিল হিসেবে ধরা হয়। ইরানে সাফাভি শাসনামল ও তার পরের যুগ থেকে যেসব ফুতুওয়াতনামা লেখা হয়েছে সেসবের বেশিরভাগই অতি সাধারণ মানের লেখকদের হাতে লেখা হয়েছে বলে সেগুলো ব্যাপক ভুল-ভ্রান্তি ও জড়তায় পরিপূর্ণ গদ্য সাহিত্যের দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

যাই হোক ফুতুওয়াতনামাগুলোর ইতিহাসে মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির লেখা 'ফুতুওয়াতনামেহ সুলতানি'কে  এ ধারার বইগুলোর মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের বা শ্রেষ্ঠ বই বলা যায়। বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে সম্পর্ক ও নৈতিকতা নিয়ে এ বইয়ের তথ্যগুলো খুবই দুর্লভ।  এ বইয়ের নবম অধ্যায়ে অনুষ্ঠান বা কোনো আসরের সমাপ্তি টানার শিষ্টাচার সম্পর্কে বক্তব্য রয়েছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে দু'টি বক্তৃতা তুলে ধরা হয়েছে। এ দুটি বক্তৃতা থেকে মনে হয় কাশেফি বারো ইমামি শিয়া মুসলমান ছিলেন।

অধ্যাপক মুহাম্মাদ জাফর মাহজুব 'ফুতুওয়াতনামেহ সুলতানি' শীর্ষক বইটির সম্পাদনা করেছেন আধুনিক যুগে। তার মতে ফুতুউয়াত তথা মহানুভবতার বিষয়ে কাশেফির এ বইটি ছাড়া আরবি বা ফার্সি অন্য কোনো বইয়ে এত বিস্তারিত, নিখুঁত ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও ব্যাখ্যা দেখা যায় না। এ যেন মহতী নানা গুণ বর্ণনার একটি পরিপূর্ণ বিশ্বকোষ। নিজের নানা অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা ছাড়াও এ বই লিখতে গিয়ে তিনি অনেক বিখ্যাত বইকে উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যেমন, ইমাম গাজ্জালির এহই্‌য়ায়ে উলুমে দীন ও কামালউদ্দিন আবদুর রাজ্জাক কাশির ফুতুউয়াতনামেহ। 

কুরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতি এবং হযরত আলীসহ মহানবীর (সা) আহলে বাইতের বারো ইমামের বাণীর ব্যবহার কাশেফির 'ফুতুওয়াতনামেহ সুলতানি' শীর্ষক বইটিকে করেছে সমৃদ্ধ। সুন্দর ও প্রাঞ্জল ভাষা এবং নানা পরিভাষার ব্যাখ্যা, পটভূমি ও দর্শনের বিশ্লেষণ থাকায় বইটি ফুতুউয়াত সংক্রান্ত বইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে।

মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির আরেকটি বিখ্যাত বইয়ের নাম হল আখলাকে মুহসিনি বা উন্নত নৈতিক চরিত্র। বইটির আরেকটি নাম হল জাওয়াহিরুল আসরার বা রহস্যের মুনি-মুক্তা। ব্যবহারিক কর্মকাণ্ড ও রাজনীতি বিষয়ে লেখা হয়েছে এ বই। কাশেফি বইটি লিখেছিলেন হিজরি ৯০০ সালে। খন্দমিরের মতে আখলাকে মুহসিনি কাশেফির  সাতটি বিখ্যাত বইয়ের অন্যতম। ফার্সি ভাষায় এর আগে লেখা দুটি বিখ্যাত বইয়ের নাম নাসিরুদ্দিন তুসির আখলাকে নাসিরি ও জালালউদ্দিন মুহাম্মাদ দাওয়ানির আখলাকে জ্বালালি। এ দু'জন ব্যক্তিত্ব দার্শনিক হওয়ায় নৈতিকতা সংক্রান্ত তাদের বইয়ে দর্শনের প্রভাব দেখা যায়। কিন্তু কাশেফি দার্শনিক ছিলেন না বলে তার বইটি সাধারণ জনগণের মধ্যে বেশি প্রচলিত হয়েছে।

কাশেফির  আখলাকে মুহসিনি বইটিতে রাজনৈতিক নৈতিকতা ও শরিয়ত বা ধর্মীয় বিধি-বিধান সংক্রান্ত নৈতিকতার আদর্শও তুলে ধরা হয়েছে। রাজনীতি ও শরিয়ত বিষয়ে শাসকদের জন্য নানা ধরনের উপদেশ-সমৃদ্ধ এ বইয়ে রাজা-বাদশাহদেরকে মহানবীর স্থলাভিষিক্ত বলে ধরা হয়েছে এবং ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করাকে তাদের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদের ওপর ইসলামী আইন বাস্তবায়নের আগে রাজা-বাদশাহকে এই আইনের অনুসারী হতে হবে বলে কাশেফি উল্লেখ করেছেন। তিনি শাসকদের  জন্য ৪০টি গুণ থাকা দরকার বলে উল্লেখ করে সেসবের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এসব গুণের মধ্যে রয়েছে আন্তরিকতা, ইবাদত, ধৈর্য, পরামর্শ, সাহসিকতা, সুযোগের ব্যবহার, আল্লাহর ওপর নির্ভরতাসহ আরও কিছু জরুরি গুণ। 

মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির আরেকটি বিখ্যাত বইয়ের নাম হল 'মাওয়াহিবুল আলিয়্যাহ' বা তাফসিরে হুসাইনি। এটি তাফসিরে মোল্লা নামেও পরিচিত। হাতে-লেখা এ বইটির শত শত কপি ইরান, মধ্য এশিয়া ও পাক-ভারত উপমহাদেশের নানা লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তাফসির বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও কাশেফি অন্যান্য তাফসির গ্রন্থের বক্তব্য ও সুফিবাদী তরিকতপন্থীদের ব্যাখ্যাকেই তার এ বইয়ে সহজ ফার্সি ভাষায় সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন।

মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি 'মাওয়াহিবুল আলিয়্যাহ' বা তাফসিরে হুসাইনি লিখেছিলেন খ্রিস্টীয় ১৪৯১ থেকে ১৪৯৪ সনে তথা হিজরি ৮৯৭ থেকে ৮৯৯ সনে। তিনি এই তাফসির আমির আলীশির নাওয়ায়ির নামে উৎসর্গ করেন। কাশেফি তার এই তাফসিরে  ইবনে আরাবি ও আবদুররাজ্জাক কাশানিসহ অনেক প্রখ্যাত সুফিবাদী ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়াও তিনি খাজা আবদুল্লাহ আনসারি, রুমি, আত্তার, সানায়ি ও জামির মত প্রখ্যাত সুফিবাদী কবিদের কবিতাও ব্যবহার করেছেন 'মাওয়াহিবুল আলিয়্যাহ' বা তাফসিরে হুসাইনিতে। কাশেফির কাব্যময় এই তাফসির পরবর্তী যুগের আরবি ও ফার্সি তাফসির গ্রন্থগুলোতেও ব্যবহৃত হয়েছে। নানা ধরনের শিক্ষণীয় কাহিনী তার এই তাফসিরের বাড়তি আকর্ষণ। ফার্সি ভাষার এই তাফসিরে আরবি উদ্ধৃতি বা বাক্যের ব্যবহার নেই বললেই চলে। এই তাফসিরে শিয়া ও সুন্নির প্রসঙ্গ না থাকায় সুফিবাদী শিয়া ও সুন্নি মুসলমানরা কাশেফিকে তাদের আপনজন বলেই ধারণা করে থাকেন।

মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির আরেকটি খুবই জনপ্রিয় ও বিখ্যাত বই হল আনোয়ারে সুহাইলি। এ বইটিকে বিখ্যাত আরবি গল্প-গ্রন্থ কালিলা ও দিমনারই নতুন ও সহজ-সরল সংস্করণ বলা যায়। তার এ বই আফগানিস্তান ও ভারত উপমহাদেশে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। বইটি ছিল ভারতে ও ব্রিটেনে ফার্সি ভাষা শিক্ষার অন্যতম বড় মাধ্যম।  ভারত ও তেহরানের নানা ধরনের ছাপাখানা থেকে এ বই মুদ্রণ করা হয়েছে ত্রিশ বারেরও বেশি। ভারত ও ইউরোপের নানা ভাষায় এ বইয়ের অনুবাদ দেখা যায়। কালিলা ও দিমনার গল্পগুলো ছাড়াও কাশেফি আনোয়ারে সুহাইলি শীর্ষক তার এ বইয়ে ৬০ টি রূপকথা যোগ করেছেন।  এ বইয়ে শেখ সাদির গুলিস্তান ও বোস্তানের কিছু গল্পও  তিনি ব্যবহার করেছেন। পশু-পাখীর গল্পের মাধ্যমে নানা ধরনের নৈতিক শিক্ষণীয় বিষয় এ বইয়ে তুলে ধরেছেন কাশেফি। পরবর্তীকালে কাশেফির এই বই অনুসরণ করে ভারতে অনেক গল্পের বই লেখা হয়েছে।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।