মার্কিন জনগণের নানা ক্ষোভ ও এবারের সহিংস নির্বাচন
https://parstoday.ir/bn/radio/world-i24889-মার্কিন_জনগণের_নানা_ক্ষোভ_ও_এবারের_সহিংস_নির্বাচন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ বছরের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নজিরবিহীন মাত্রায় সহিংস হয়ে উঠেছে। দেশটির অতীতের কোনও নির্বাচনই আর কখনও এতোটা সহিংস হয়নি।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
নভেম্বর ০৫, ২০১৬ ১৭:৩১ Asia/Dhaka
  • মার্কিন জনগণের নানা ক্ষোভ ও এবারের সহিংস নির্বাচন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ বছরের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নজিরবিহীন মাত্রায় সহিংস হয়ে উঠেছে। দেশটির অতীতের কোনও নির্বাচনই আর কখনও এতোটা সহিংস হয়নি।

সম্প্রতি উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় রিপাবলিকান দলের দপ্তরে হামলা হয়েছে। লস এঞ্জেলসের বেভারলি হিলে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সহিংস প্রতিবাদের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়াও কোনও কোনও নির্বাচনী সমাবেশে আমেরিকার দুই প্রধান দলের সমর্থকদের মধ্যে ঘটেছে রক্তাক্ত সংঘর্ষ। এমনকি দলীয় নির্বাচনেও একই দলের দুই প্রার্থী পরস্পরের ওপর চড়াও হন। আর দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ট্রাম্প ও হিলারির বিতর্ক বা বাক-যুদ্ধ বার বার ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি তুলে ধরার ও পরস্পরকে নোংরা ভাষায় অপমান করার লড়াইয়ে পরিণত হয়।

এইসব ঘটনা থেকে বোঝা যাচ্ছে মার্কিন সমাজের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের সমাজ-কর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীসহ জনগণের মধ্যে জমে থাকা সুপ্ত ক্ষোভ ও অসন্তোষ এবারের এই নির্বাচনে বিস্ফোরণন্মুখ হয়ে উঠেছে।  অসন্তোষের এই আগুন   ছাইচাপা হয়ে জমেছিল কয়েক দশক ধরে।

মার্কিন সমাজের নানা জরিপ ও গবেষণায় স্পষ্ট যে দেশটির জনগণ গত শতকের শেষের দিকেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী ছিল। কথিত ‘মার্কিন স্বপ্ন’ বুকে ধরে মার্কিনিরা নানা সংকট ও সমস্যায় ধৈর্য ধরার চেষ্টা করেছে। কারণ, তখনও মার্কিন অর্থনীতি মন্দার শিকার হয়নি এবং দেশটিতে ছিল গ্রহণযোগ্য মাত্রায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

সে সময় আমেরিকার জনগণ কর দিত খুব কম পরিমাণে এবং কাজ বা চাকরির সুযোগও ছিল অনেক বেশি। মনে করা হত মার্কিন সমাজে বর্ণবাদী উত্তেজনার অবসান ঘটেছে এবং দেশটির নানা বর্ণ ও সংস্কৃতির মধ্যে অপোস-রফা হয়েছে। সে সময় শীতল যুদ্ধের অবসানকে আমেরিকার নৈতিক ও রাজনৈতিক বিজয় বলে মনে করা হত। মার্কিনিরা বিশ্বের অন্যান্য জাতির চেয়ে উন্নত-এমন ধারণাও আমেরিকানদের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে পড়ছিল।

২০০০ সাল শুরু হওয়ার আগেও অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও আভিজাত্যবোধ ছিল মার্কিনিদের মধ্যে।  মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান হবেন না ডেমোক্রেট হবেন তা নিয়ে দুই দলের অল্প কিছু অন্ধ সমর্থক ছাড়া বেশিরভাগ মার্কিনির মধ্যেই কোনও দুশ্চিন্তা ছিল না। এমনকি ২০০০ সালের নির্বাচন নিয়ে আইনি বিতর্ক দেখা দিলেও মার্কিন সমাজে দেখা দেয়নি রাজনৈতিক অস্থিরতা। 

কিন্তু মার্কিন সমাজের বিংশ শতাব্দীর সুখ আর আনন্দের যুগ শেষ হয়ে যায় একবিংশ শতকের প্রথম বছরটিতেই। এ বছরের ১১ সেপ্টেম্বর রহস্যময় হামলার শিকার হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। টুইন টাওয়ারের পতনের মধ্য দিয়ে মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তার অনুভূতি ও অক্ষত থাকার আশাও বিলীন হয়ে যায়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে মার্কিনিদের মধ্যে। মার্কিন জনগণ বুঝতে পারে যে শত শত বিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেটও নিউইয়র্ক বা ওয়াশিংটনে মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে সক্ষম নয়।

মার্কিন সরকার সন্ত্রাসী হামলার পুনরাবৃত্তি সম্পর্কে জনগণের আতঙ্কের জবাবে পুলিশি নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। শুরু হয় জনগণের ওপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিবিড় নজরদারি ও হয়রানি। টেলিফোনে পাতা হয় আড়ি এবং যে কোনও সন্দেহজনক আচরণকে সন্ত্রাস-বান্ধব পদক্ষেপ বলে ধরা হয়।

আর সীমান্তের বাইরে বহু দূরের দুই মুসলিম দেশ আফগানিস্তান ও ইরাকের জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় ব্যয়বহুল ও হতাহতে ভরপুর রক্তাক্ত যুদ্ধ। জনগণের দেয়া করের অর্থ থেকে এক হাজার বিলিয়নেরও বেশি ডলার খরচ করা হয় এইসব যুদ্ধে। অথচ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আমেরিকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ব্যয় করা যেত। বাতাসে ওড়ানো এইসব অর্থ মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য কোনও কাজেই আসেনি। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহায়ন বা আবাসন শিল্পের সংকটও প্রকট হয় ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর। ব্যাংকগুলো একের পর এক দেউলিয়া হতে থাকে। মার্কিন জনগণের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার গচ্চা যায়। গৃহঋণ শোধ করতে না পেরে মিলিয়ন মিলিয়ন মার্কিন নাগরিক গৃহহারা হয়। মার্কিন কারখানাগুলো থেকেও শ্রমিক ছাটাই শুরু হয় ব্যাপক মাত্রায়। ফলে বেকারত্ব দশ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। 

মার্কিন সরকার শত শত বিলিয়ন ডলার অর্থ অর্থনৈতিক বাজারে ছেড়ে দেয় তারল্য সৃষ্টির জন্য। ফলে সরকারি দেনার হার দ্বিগুণ বেড়ে যায়। এরপর শুরু হয় কৃচ্ছতা বা ব্যয়সংকোচনের নীতি। আর জনকল্যাণ খাতের বাজেট কমে যাওয়ায় মিলিয়ন মিলিয়ন মার্কিন নাগরিক হঠাৎ দরিদ্র হয়ে পড়ে। এভাবে হারিয়ে যায় ‘মার্কিন স্বপ্ন’। ভবিষ্যৎ মার্কিন প্রজন্মের অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার ব্যাপারে আতঙ্ক দেখা দেয় অভিভাবকদের মধ্যে। 

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট জটিল হওয়ার পাশাপাশি মার্কিন সমাজে বর্ণবাদ আবারও চাঙ্গা হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক সুদিনের সময় কৃষ্ণাঙ্গ ও বিদেশী অভিবাসীদের স্বাগত জানানো হলেও অর্থনৈতিক মন্দার বর্তমান যুগে অভিবাসীদের ওপরই দেশের সব সংকটের দায় চাপিয়ে দিতে চায় মার্কিন শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীরা। আর মার্কিন মুসলমানদের অভিযুক্ত করা হচ্ছে সন্ত্রাসীদের সহযোগী হিসেবে।  

বর্ণবাদ গ্রাস করছে মার্কিন পুলিশ ও বিচার বিভাগকেও। ‘অভিবাসীদের তাড়াও’-এ শ্লোগান জোরদার হয়ে উঠছে শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের মধ্যে। ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে মার্কিন অভিবাসীরাও। মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর নির্যাতন, নৃশংসতা ও হয়রানি বেড়ে যাওয়ায় তারাও সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করে। 

মার্কিন সমাজে এখন তিনটি প্রতিবাদী আন্দোলন চলছে। এক দল মার্কিন নাগরিক বলছে, ওবামার সরকার সমাজতন্ত্র-ঘেঁষা অর্থনীতির মাধ্যমে মুক্ত-বাজার অর্থনীতিকে ধ্বংস করছেন। তারা ওবামার বীমা আইনকে উপহাস করে বলছেন, ওবামা-কেয়ার! এই গ্রুপ রক্ষণশীল মনোভাব নিয়ে গড়ে তুলেছে টি-পার্টি।

অন্য একটি গ্রুপ শাসক-শ্রেণীর নিয়ন্ত্রক ধনীদের মুনাফাকামীতা ও বৈষম্যমূলক অর্থনীতির প্রতিবাদে গড়ে তুলেছে ‘ওয়াল-স্ট্রিট দখল আন্দোলন’। মুষ্টিমেয় ধনকুবেরদের একটি গ্রুপ গোটা মার্কিন সমাজ ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করায় তাদের উৎখাতের দাবি জানায় ‘ওয়াল-স্ট্রিট দখল আন্দোলন’। 

বর্তমান মার্কিন সমাজের তৃতীয় প্রতিবাদ আন্দোলন হল ‘কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনের মূল্য আছে’ শীর্ষক আন্দোলন। তারা মার্কিন নিরাপত্তা ও বিচারবিভাগ থেকে বর্ণবাদ দূর করার ও সবার জন্য সমানাধিকারের দাবি জানাচ্ছে। 

মার্কিন সমাজের এইসব ক্ষোভ ও প্রতিবাদকে পুঁজি করে প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছিলেন ডেমোক্রেট রাজনীতিবিদ বার্নি স্যান্ডার্স। কিন্তু তিনি ডেমোক্রেট নেতাদের বাধার শিকার হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান। এদিকে ট্রাম্প আমেরিকাকে আবারও গৌরবের শীর্ষে পৌঁছে দেয়ার শ্লোগান দিয়ে রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন পান। ট্রাম্প একজন সুপারম্যানের মতই মার্কিন সমাজের সংকটগুলোর সমাধান করবেন ও আবারও সুখ-সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনবেন বলে দেশটির ভোটারদের অনেকেই আশা করছে।  ট্রাম্প বলছেন, ২০১৬’র এই নির্বাচনই আমেরিকাকে উদ্ধারের সর্বশেষ সুযোগ।  

অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের শিকার অনেক মার্কিন নাগরিকই ট্রাম্পের শ্লোগানের মধ্যে তাদের আশার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছেন। অন্যদিকে হিলারির সমর্থকরা বলছেন আমেরিকায় গণতন্ত্রকে রক্ষার এটাই শেষ সুযোগ। তারা প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি সহিংস হয়ে উঠছেন। ফলে এবারের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কেবল ভাষায় নয়, শারীরিক ক্ষেত্রেও হয়ে উঠছে নজিরবিহীন মাত্রায় সহিংস।#

পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/৫