অভিষেক হল নতুন রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের
৫২ বছরের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি হিসেবে জমকালো বিদায় সংবর্ধনা পেলেন আবদুল হামিদ
টানা দুই মেয়াদে ১০ বছরের বেশি সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শেষে বঙ্গভবন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়েছেন মো. আবদুল হামিদ। বাংলাদেশের ৫২ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাষ্ট্রপতিকে এমন জমকালো বিদায় জানানো হলো। আজ (সোমবার) দুপুরে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে বিদায় জানান বঙ্গভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
কিশোরগঞ্জের সন্তান আবদুল হামিদ ২০১৩ সালের মার্চ মাসে অস্থায়ী ও ২৪ এপ্রিল প্রথম দফায় দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। এরপর ২০১৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ২১তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বঙ্গভবনে ১০ বছরেরও বেশি সময় কেটেছে আবদুল হামিদের। রোববার (২৩ এপ্রিল) ছিল তার শেষ কর্মদিবস।
সোমবার বেলা ১১টায় বঙ্গভবনের ঐতিহাসিক দরবার হলে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর দুপুরে বঙ্গভবন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন ২১তম রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
বিদায় অনুষ্ঠানের শুরুতেই আবদুল হামিদকে বঙ্গভবনের ক্রেডেনশিয়াল গ্রাউন্ডে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়। পরে ফুলে সজ্জিত একটি খোলা জিপে ফোয়ারা এলাকা থেকে প্রধান ফটকের দিকে যাত্রা করেন তিনি। বঙ্গভবনের কর্মকর্তারা তার গাড়ির সামনে বাঁধা লাল রশি টেনে মূল ফটক পর্যন্ত নিয়ে আসেন। এ সময় সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে আবদুল হামিদকে বিদায় জানান বঙ্গভবনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তার গাড়ির সামনে ছিল পুলিশের বিশেষ অশ্বারোহী দল।
বাংলাদেশের ৫২ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাষ্ট্রপতির বিদায়ের দিনে এমন সংবর্ধনাপূর্ণ আয়োজন করা হয়। এর আগে, কোনো রাষ্ট্রপতিকে এমন রাজসিকভাবে বিদায় জানানো হয়নি।
বিদায় বেলায় আবদুল হামিদ বলেন, এখন সাধারণ নাগরিক হিসেবে একটু ফ্রিলি মুভ করতে পারব আমি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দের।
বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে রাজধানীর নিকুঞ্জে নিজ বাসা ‘রাষ্ট্রপতি লজে’ উঠছেন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি। এর মধ্য দিয়ে টানা ১০ বছরেরও বেশি সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা আবদুল হামিদের বঙ্গভবনের অধ্যায় শেষ হলো।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পূর্ণ করার পর আইন অনুযায়ী অবসর ভাতা, চিকিৎসাসুবিধাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন তিনি।
‘রাষ্ট্রপতির অবসর ভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা আইনে’ সাবেক রাষ্ট্রপতিরা কী কী সুযোগ-সুবিধা, কীভাবে পাবেন তা নির্ধারণ করা আছে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে সর্বশেষ যে মাসিক বেতন পেতেন, তার ৭৫ শতাংশ হারে মাসিক অবসর ভাতা পাবেন আমৃত্যু।
রাষ্ট্রপতি অবসর ভাতা গ্রহণ করে মারা গেলে তার বিধবা স্ত্রী অথবা ক্ষেত্র অনুযায়ী বিপত্নীক স্বামী তার প্রাপ্য অবসর ভাতার দুই-তৃতীয়াংশ হারে মাসিক ভাতা পাবেন আমৃত্যু। অবসর ভাতা পাওয়ার যোগ্য একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি অবসর ভাতার পরিবর্তে আনুতোষিকও (এককালীন অর্থ) নিতে পারেন।
‘দ্য প্রেসিডেন্টস (রেম্যুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজেস) অ্যাক্ট অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। অবসরে যাওয়ার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে একজন ব্যক্তিগত সহকারী এবং একজন অ্যাটেনডেন্ট (সাহায্যকারী) পাবেন আবদুল হামিদ। একজন মন্ত্রীর প্রাপ্য চিকিৎসাসুবিধার সমপরিমাণ চিকিৎসাসুবিধা পাবেন তিনি।
আবাসস্থলে একটি টেলিফোন সংযোগ, সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে একটি কূটনৈতিক পাসপোর্ট, দেশের ভেতর ভ্রমণকালে সরকারি সার্কিট হাউস বা রেস্টহাউসে বিনা ভাড়ায় থাকার সুবিধা পাবেন আবদুল হামিদ। তিনি দাপ্তরিক ব্যয়ও পাবেন, এর পরিমাণ সরকার নির্ধারণ করে দেবে।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন কাটিয়ে আসা কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কামালপুর গ্রামের সন্তান মো. আবদুল হামিদ প্রথম দফায় ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। এরপর ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার ২১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
এর আগে, আবদুল হামিদ সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত মো. জিল্লুর রহমান বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকার সময় জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে কিছুদিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালে ময়মনসিংহ-১৮ আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এরপর আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকা থেকে সাতবার আওয়ামী লীগের হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
একজন সফল রাজনীতিবিদ হিসেবে রাষ্ট্রের এক নম্বর ব্যক্তি হয়ে বঙ্গভবন ছাড়ছেন তিনি। তবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে গেলেও আইন অনুযায়ী অবসর ভাতা, চিকিৎসাসুবিধাসহ অন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা পাবেন তিনি।
এর আগে, চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন। আর কোনো প্রার্থী না থাকায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
পাবনার সন্তান মো. সাহাবুদ্দিনের জন্ম ১৯৪৯ সালে। ছাত্রজীবনে তিনি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী সাহাবুদ্দিন ১৯৮২ সালে বিসিএস (বিচার) ক্যাডার হিসেবে যোগ দেন। বিচারকের বিভিন্ন পদে চাকরি শেষে ২৫ বছর পর ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর নেন। পরবর্তীতে ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। #
পার্সটুডে/বাদশাহ রহমান/আশরাফুর রহমান/২৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।