'তেহরান আরও বেশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব অর্জন করতে পারে'
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিশ্বকে বদলে দিল চিরতরে: ফরেন পলিসি
-
ছবি: কুয়েতে অবস্থিত ক্যাম্প বুয়েরিংয়ে ইরানের হামলার পরের দৃশ্য। ছবিটি তোলার তারিখ উল্লেখ করা হয়নি।
পার্সটুডে: ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরায়েলের যুদ্ধ এমন সব পরিবর্তনের সূচনা করেছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত হয়েছে। এই যুদ্ধ পশ্চিম এশিয়া তথা মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য নতুন করে গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
সব পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে চীনের সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা, স্থায়ী সীমান্তযুদ্ধের কৌশল গ্রহণের দিকে ইসরায়েলের অগ্রসর হওয়া এবং ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও প্রতিপক্ষকে হুমকি দেয়ার ক্ষেত্রে তেহরানের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
ফরেন পলিসি পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের নীতিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেনেথ পোলাক বলেছেন, এই যুদ্ধ ইতিহাসের এমন এক সন্ধিক্ষণ হয়ে উঠতে পারে, যা ভূরাজনীতির নিয়মকানুন নতুন করে নির্ধারণ করবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধটির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিণতি তাৎক্ষণিক সামরিক প্রভাবের চেয়েও গুরুতর হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ)-এর সাবেক সামরিক বিশ্লেষক পোলাকের মতে, এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে পশ্চিমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো ইরানের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে কার্যকর। তবে যেসব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরক্ষা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছেছে, তার সামান্য অংশই উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোতে অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উদ্বেগ সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
পোলাকের যুক্তি, আকাশপথে আসা হামলার প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিহত করলেও তা পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করে না। কারণ, অবশিষ্ট হামলাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও পর্যটন খাতকে হুমকির মুখে ফেলে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থিতিশীলতার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের যে ভাবমূর্তি রয়েছে, তা ক্ষুণ্ন করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল থাকার সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করার পর এ অঞ্চলের দেশগুলো তুরস্কের তৈরি ড্রোন কিনতে শুরু করেছে। অন্যদিকে, কয়েকটি দেশ মার্কিন, ইসরায়েলি, চীনা ও ইউক্রেনীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
চীন ও সামরিক শক্তি
পোলাক আরও উল্লেখ করেছেন, এই যুদ্ধ এ অঞ্চলে নিজেদের স্বার্থ ও অংশীদারদের সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে চীনের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে। অথচ চীনের তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এবং এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে দেশটির বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৫০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
তিনি মনে করেন, এসব ঘটনা উপসাগরীয় অঞ্চল ও আরব সাগরে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়াতে চীনকে উৎসাহিত করতে পারে। দেশটি তার নৌবাহিনী ও বিমানবাহী রণতরির বহর সম্প্রসারণের সুবিধা কাজে লাগিয়ে এ লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করতে পারে।
এই পরিবর্তন বাস্তবে রূপ নিলে তা এ অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্য ও নিরাপত্তা-সম্পর্কের চিত্র পাল্টে দিতে পারে। এর ফলে কয়েক দশক ধরে এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে আসা ওয়াশিংটনকে নতুন এক প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হতে হবে।
‘ইসরায়েল’ ও স্থায়ী যুদ্ধ
সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে পোলাক ধারণা করেন, ‘ইসরায়েল’ গাজা উপত্যকা, লেবানন ও সিরিয়ায় বাফার জোন বা নিরাপত্তা বলয় প্রতিষ্ঠার ওপর ভিত্তি করে একটি কৌশল গ্রহণ করতে পারে। পাশাপাশি, নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে—এমন সামরিক সক্ষমতার অধিকারী প্রতিপক্ষের বিকাশ ঠেকাতে অব্যাহত সামরিক অভিযান চালাতে পারে।
তিনি এই পদ্ধতির সঙ্গে রোমান সাম্রাজ্যের কৌশলের তুলনা করেছেন। রোমান সাম্রাজ্য অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য সীমান্তের বাইরে নিরাপত্তা বলয় প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধ পরিচালনার ওপর নির্ভর করত।
তবে এ ধরনের কৌশল বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রস্তুতি ও সামাজিক পর্যায়ে ব্যাপক সংহতি প্রয়োজন হবে। এতে ইসরায়েলের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং দেশটির প্রযুক্তি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কারণ এই খাত বৈশ্বিক যোগাযোগ ও উন্মুক্ত পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল।
অব্যাহত সামরিক অভিযান ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতাও আরও গভীর করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতবিরোধ বাড়িয়ে দিতে পারে। মার্কিন-ইসরায়েলি জোট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সমালোচনা ক্রমেই বাড়ছে।
ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে
ইরানের প্রসঙ্গে পোলাক এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি যে, যুদ্ধটি তেহরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে তার প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ইরান উপলব্ধি করেছে, হরমুজ প্রণালিকে হুমকির মুখে ফেলা এবং ওয়াশিংটনের মিত্রদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার মাধ্যমে সব পক্ষের ওপর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।
পোলাক আরও মনে করেন, তাঁর ভাষায়, ইরানের কট্টরপন্থীদের প্রভাব বৃদ্ধি পেলে পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে, যদি তাঁরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে ভবিষ্যতে হামলা প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করা।
তিনি উল্লেখ করেছেন, রাশিয়া ও চীনের সমর্থন ইরানকে তার অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নে সহায়তা করতে পারে। তাই ইরানের সামরিক সক্ষমতা সত্ত্বেও, সামুদ্রিক চলাচল ব্যাহত করা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলকে হুমকির মুখে ফেলার ক্ষমতা প্রতিরোধ না করেই যুদ্ধের অবসান ঘটানো হলে, তেহরান আরও বেশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব অর্জন করতে পারে। #
পার্স টুডে/এমএএইচ/২১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।