মোদি ও নেতানিয়াহুর আদর্শ ও নীতি এক: পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মন্ত্রী
যায়নবাদী ইসরাইলি সরকারের সঙ্গে ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ও আরএসএসের আদর্শগত মিল রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসাবিষয়ক সাবেক মন্ত্রী এবং কোলকাতার নব বালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার।
ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু’র ভারত সফর প্রসঙ্গে আজ (মঙ্গলবার) রেডিও তেহরানকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি ওই মন্তব্য করেন।
নির্জোট আন্দোলন থেকে সরে এসেছে ভারত
বিশিষ্ট বামপন্থি নেতা ড. আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘ইসরাইল সরকারের যদি ইতিহাস দেখা যায় তাহলে দেখা যাবে ইসরাইলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সবচেয়ে বেশি কট্টর। তিনি ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছেন। সেই সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নরেন্দ্র মোদি সরকারের যে সম্পর্ক তৈরি হবে তার মধ্যে নতুনত্ব কিছু নেই। সমস্যা হল, ভারত পৃথিবীব্যাপী নির্জোট আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই জায়গা থেকে আমরা সরে এলাম। একটা অক্ষ তৈরি হল। দীর্ঘদিন ধরে বড় আকারে এর প্রচেষ্টা চলছিল।’
ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন
তিনি বলেন, ‘আমেরিকা-ভারত-ইসরাইল’কে নিয়ে অক্ষ তৈরি হচ্ছে, যা ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন, আগে থেকেই তা দেখা গেছে। সামরিক ক্ষেত্রে ওই অক্ষ একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিচ্ছে যার ফলে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখা যাচ্ছে না। এটা সব থেকে বেশি দুঃখের। ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে আমাদের (ভারতের) যে ভূমিকা তাও অনেকাংশে লাঘব হচ্ছে। সঠিকভাবে আমরা ফলপ্রসূ কিছু করতে পারছি না, অবস্থান নিতে পারছি না, এটা অত্যন্ত উদ্বেগ ও চিন্তার বিষয়।’
ড. আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘স্বাধীন ফিলিস্তিনিদের পক্ষে চিরকালই আমরা (ভারত) অবস্থান নিয়েছি। কিন্তু আরব দেশে ইসরাইলের ভূমিকা কী তা সকলেই জানেন। আরব ভূখণ্ডে ১৯৪৮ সালে কীভাবে ইসরাইল রাষ্ট্র তৈরি হয়েছিল তা সকলেরই জানা। নতুন করে একটা সমস্যা তৈরি হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন আমেরিকায় ক্ষমতায় এলেন সেসময় আমি একটি সংবাদপত্রে আগেভাগেই লিখেছিলাম ‘এরপরেই কী জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া ট্রাম্পের লক্ষ্য?’
ভারত-আমেরিকা-ইসরাইল নয়া অক্ষ তৈরি হচ্ছে
ড. আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘নীতিগতভাবে আরএসএসের প্রাণপুরুষ এম এস গোলওয়ালকার তিনিও যায়নবাদী ও ইহুদিদের পক্ষে ছিলেন- এটা নতুন কিছু নয়। ইসরাইলের যায়নবাদী সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের আদর্শগত নৈকট্য আছেই। সমস্ত ক্ষেত্রেই তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। জেরুজালেমকে রাজধানী করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে জিনিসটা নতুন করে চাপিয়ে দিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতে রেড কার্পেট সামনে রেখে ভারত ও ইসরাইলের মধ্যে একের পর এক যে ৯টি চুক্তি হয়েছে এবং সামরিক ক্ষেত্রে মূলত চুক্তি করা- দুটোরই লক্ষ্য একই। সামরিক ক্ষেত্রে ইসরাইলের সঙ্গে আমাদের চুক্তি সবচেয়ে বেশি। আর তো রাশিয়া নয়, অন্য দেশ নয়, এখন সবচেয়ে বেশি সামরিক অস্ত্র বা অন্যান্য সরঞ্জাম কেনা হচ্ছে ইসরাইলের কাছ থেকে। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রাদান ইত্যাদি সব ইসরাইলের সঙ্গে হচ্ছে। যারা ছিল এক সময় ব্রাত্য তারাই এখন ভারতের ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত উঠছে! এটাই দুঃখের, এটাই যন্ত্রণার যে আমরা আমাদের স্বাধীন সত্ত্বাটাকে ক্রমশ হারিয়ে ফেলছি। বিশ্বজুড়ে ভারত-আমেরিকা-ইসরাইল একটা নয়া অক্ষ তৈরি হচ্ছে। এতে আরো নতুন মাত্রা পাচ্ছে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, সমস্যাও বাড়ছে।’
নিপীড়িতদের পক্ষে ভারতই ছিল বড় শক্তি
তিনি বলেন, ‘একটা দক্ষিণপন্থি শক্তি বিশ্বব্যাপী মাথা চাড়া দিচ্ছে এবং এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। এর সঙ্গে ভারত যুক্ত হয়ে যাচ্ছে, যার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ছিল, যার জোট নিরপক্ষে আন্দোলনের স্বাধীন ঐতিহ্য ছিল যেখানে আমরা নেতৃত্ব দিয়েছি, নেতার আসনে ছিলাম। স্বাধীনতাকামী মানুষদের পক্ষে আমরাই প্রথম দাঁড়িয়েছিলাম। পৃথিবীর দেশে দেশে যারাই অত্যাচারিত, নিপীড়িত তাদের পক্ষে ভারতই ছিল বড় শক্তি। তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছিল। যারা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে আমরা (ভারত) তাদের পক্ষে। আমরা কোনো অক্ষে যাব না। আমরা কোনো দিকে যাব না থেকে শুরু করে যে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি তৈরি হয়েছিল, সেই জায়গা থেকে আমরা এক পক্ষে, এক বৃত্তের মধ্যে চলে গেলাম! আমরা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ধরে রাখতে পারলাম না। ফলে অসুবিধা তো হবেই। আমরা যদি কারো পক্ষ অবলম্বন করি তাহলে সেপক্ষ যা খারাপ কাজ করবে, তার সঙ্গী হতে হতে হবে। তা সে ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তির প্রশ্নেই হোক বা অন্য দেশের মুক্তির পক্ষেই হোক। কারণ, আমেরিকা ও ইসরাইলের পক্ষে হয়ে যাচ্ছি আমরা। এটা হচ্ছে সবথেকে বড় সমস্যা। এরা দীর্ঘদিন ধরে এ ধরণের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। আজ তার চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে।’
মোদি ইসরাইলে গেলেও ফিলিস্তিনে যান নি
তিনি বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি প্রথম ইসরাইল সফরে গেলেও তিনি ফিলিস্তিন সফরে যান নি। এরকম কোনোকালেই হয় নি। তিনি ইসরাইল সফর করে ফিরে এসেছিলেন কিন্তু ফিলিস্তিনে রামাল্লায় তিনি যাননি, সেই মানুষগুলোর কথা তিনি শোনেন নি। নেতানিয়াহু তাকে যেরকম লাল কার্পেট বিছিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন তিনিও এখন নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রেও তাই করছেন। তাদের মধ্যে আদর্শগত নৈকট্য রয়েছে, তাছাড়া এসব সম্ভব নয়। দুটোর লক্ষ্য একই। যেকোনো সচেতন মানুষই সেই লক্ষ্য সম্পর্কে অবগত আছেন। তাদের আদর্শ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, নীতি সব এক জায়গায় এসে মিলেছে। এর বিরুদ্ধে বিভিন্নস্তরে প্রতিবাদ হচ্ছে এবং তা হওয়া উচিত।’
আমরা নিজেদের সত্তাকে বিসর্জন দিচ্ছি
ড. আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প যে পদক্ষেপ নিচ্ছেন, ইসরাইল যা করছে, তার বিরুদ্ধে সর্বস্তরেই প্রতিবাদ, প্রতিরোধ হচ্ছে এটা নতুন কিছু নয়। ফলে তাদের সঙ্গ আমি ধরব কেন? তাদের পিছন পিছন আমরা ছুটব কেন? আমাদের একটা স্বাধীন সত্তা আছে, সেই স্বাধীন সত্তাকে বিসর্জন দেয়া হবে কেন? কীসের জন্য? কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল আমরা নিজেদের সত্তাকে বিসর্জন দিচ্ছি। বিশ্বের মানুষের কাছে আমাদের যে ভাবমূর্তি ছিল তা আমরা ধরে রাখতে পারছি না। ভারত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে কিন্তু এখন অন্যের লেজুড়ে পরিণত হচ্ছে। আমরা নেতা থেকে অনুসরণকারীতে পরিণত হচ্ছি!’
‘স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিকে আমরা বিসর্জন দিয়ে দিয়েছি এটাই আমাদের সবথেকে বড় পরাজয়। এর থেকে বড় পরাজয় আর কিছু হতে পারে না’ বলেও অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার মন্তব্য করেছেন।#
পার্সটুডে/এমএএইচ/এআর/১৬