রোহিঙ্গা নির্যাতন: শুধুমাত্র নিন্দা জানানোই কি জাতিসংঘের দায়িত্ব?
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যখন উগ্র বৌদ্ধরা চরম দমন অভিযান চালাচ্ছে এবং বিশ্বের কথিত মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ব্যাপারে চোখ-কান বন্ধ করে রেখেছে তখন এসব মুসলমানের দুর্দশা লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের কাছে লেখা এক চিঠিতে এ আহ্বান জানিয়েছেন।
জারিফ তার চিঠিতে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান দুঃখজনক পরিস্থিতিতে উদ্বেগ করেন। তিনি বলেন, মিয়ানমার সরকার যেন এসব মুসলমানকে সব ধরনের দমনপীড়নের হাত থেকে রক্ষার পাশাপাশি তাদের কাছে মানবিক ত্রাণ পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে সেজন্য দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
জাতিসংঘ মহাসচিবকে লেখা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা মুসলমানরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার অর্থাৎ দেশটির নাগরিকত্ব এবং তাদের জন্য সহায়ক একটি সরকারের অধিকার থেকে বঞ্চিত। সেইসঙ্গে প্রতিদিনই তারা হত্যা ও ধর্ষণসহ নানা ধরনের বর্বরোচিত আচরণের শিকার হচ্ছেন এবং অনেকে নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন। জারিফের চিঠিতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা মুসলমানদের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে তার ফলে জাতিসংঘের ঘোষণা ও প্রস্তাবগুলো লঙ্ঘিত হচ্ছে। মুসলিম বিশ্বে এ ব্যাপারে সৃষ্টি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন সময় এ চিঠি লিখলেন যখন রোহিঙ্গাদের ওপর উগ্র বৌদ্ধদের চরম গণহত্যা ও দমন অভিযানের নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেই জাতিসংঘ নিজের দায়িত্ব শেষ করেছে। অথচ জাতিসংঘের প্রাথমিক দায়িত্বই হচ্ছে বিশ্বের প্রতিটি স্থানে মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিহত করে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত করা।
২০০৬ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন বিলুপ্ত করে মানবাধিকার পরিষদ গঠন করা হয়। এর ফলে বিশ্বের মুসলমানরা আশা করেছিল, এই সংস্থা এবার রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে। জাতিসংঘ যদিও রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করেছে কিন্তু তাদের ওপর চালানো গণহত্যা কিংবা তাদেরকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

এ সম্পর্কে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির সংবাদদাতা জানিয়েছেন, মিয়ানমার থেকে পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বের করে দেয়ার জন্য যেসব সহিংস পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে তাকে এক কথায় ‘জাতিগত শুদ্ধি অভিযান’ বলা যায়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যখন এই দমন অভিযানে সরাসরি জড়িত তখন নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সুচি প্রতিশ্রুতি দিয়েও রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে চালানো শুদ্ধি অভিযান বন্ধ করতে পারছেন না।
মিয়ানমারের উগ্র বৌদ্ধরা গত কয়েক মাস ধরে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সহায়সম্বল হাতিয়ে নেয়ার জন্য তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করে যাচ্ছে। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী অসহায় মুসলমানদের জানমাল রক্ষা করার পরিবর্তে এই সহিংসতায় ইন্ধন যোগাচ্ছে।
এ অবস্থায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় জাতিসংঘের দায়িত্ব বহুগুণে বেড়ে গেছে। এই বিশ্ব সংস্থা সম্প্রতি ঘোষণা করেছে, মিয়ানমারের নির্যাতিত মুসলমানদের অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্য খুব শিগগিরই বিশেষ দূত পাঠানো হবে। কিন্তু বিশ্বজনমত আশা করছে, নিন্দা জানানো কিংবা বিশেষ দূত পাঠিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ না করে জাতিসংঘের উচিত মিয়ানমার সরকারের ওপর কঠোর চাপ সৃষ্টি করা। তাতেও কাজ না হলে বিশ্বের আরো বহু দেশের মতো মিয়ানমারে শান্তিরক্ষী পাঠিয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা এবং তাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/৭