ইরান-সৌদি আলোচনা অব্যাহত: বাস্তবতা উপলব্ধি করছে রিয়াদ
সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে আর্থ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করার পাঁচ বছর পর আবারো দু’দেশের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছে।
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাঈদ খাতিবযাদেহ ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে আলোচনার ব্যাপারে প্রকাশিত খবরের বিষয়ে বলেছেন, তেহরান সবসময়ই রিয়াদের সঙ্গে আলোচনা ও সুসম্পর্কের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় এবং আমরা মনে করি এ সম্পর্ক দুদেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে ও আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায়ও তা ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও সম্প্রতি আল আরাবিয়া টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাতকারে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পশ্চিম এশিয়ার দুই প্রভাবশালী দেশ ইরান ও সৌদি আরবের সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং এ সম্পর্ক কয়েকটি দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা হ্রাসে সৌদি নীতিতে পরিবর্তনের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে এ অঞ্চলের ঘটনাবলীর বিষয়ে সৌদি কর্মকর্তাদের সঠিক উপলব্ধি। কেননা আঞ্চলিক সংকট কমিয়ে আনা রিয়াদের জন্যও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক কামরান কারামি বর্তমানে এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সংকট ইয়েমেন সংঘাতের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, অনর্থক ছয় বছর ধরে যুদ্ধ করেও ইয়েমেনে তারা কোনো সাফল্য অর্জন করতে পারেনি বরং সৌদি আরবই চরম বাজেট ঘাটতির সম্মুখীন হয়েছে। অন্যদিকে হুথি যোদ্ধারা আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী হয়েছে।
সৌদি আরব এখন এটা বুঝতে পেরেছে যে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি কোনো দেশের জন্যই শুভকর নয়। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ শক্তিগুলোর পক্ষে চলে আসায় রিয়াদ এটাও উপলব্ধি করেছে যে, এ অঞ্চলে আগ্রাসন ও সহিংসতার যুগের অবসান ঘটেছে।
অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বিদেশিদের উপস্থিতি এ অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা এবং সৌদি আরবসহ অন্যান্য মুসলিম দেশের সম্পদ হরিলুট হওয়া ছাড়া আর কিছুই অর্জিত হয়নি। এ অবস্থায় সৌদি নীতিতে পরিবর্তনের ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমিয়ে আনবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। অবশ্য এ অঞ্চলে ইসরাইলের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডসহ আরো অনেক বিষয়ে সৌদি নীতিতে পরিবর্তনের ওপরও আঞ্চলিক শান্তির বিষয়টি নির্ভর করছে। ইরানের সঙ্গে আরব দেশগুলো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ইসরাইল মোটেই ভালো চোখে দেখে না এবং এটাকে তারা ইসরাইলের জন্য ক্ষতিকর মনে করে। এ কারণে ইসরাইল সম্প্রতি ‘ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ পরিকল্পনা তুলে ধরেছিল যার উদ্দেশ্য ছিল ইসরাইলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং ইরানের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করা। ইসরাইল ইরানভীতি ছড়ানোর পাশাপাশি এ অঞ্চলে ইরানের প্রভাবকে সবার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু এসব ষড়যন্ত্র ধোপে টেকেনি। বর্তমানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ও ষড়যন্ত্র এ অঞ্চলের সব দেশের কাছেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন উপস্থিতি এবং সিরিয়া, ইয়েমেনসহ অন্যান্য দেশে সামরিক আগ্রাসনের ফলে এ অঞ্চলে ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতা ও সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটেছে।
এ কারণে ইরান প্রথম থেকেই বিদেশিদের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে এসেছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়ে আসছে। এ অবস্থায় ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এ অঞ্চলের বহু সমস্যার সমাধান করবে বলে আশা করা হচ্ছে।#
পার্সটুডে/রেজওয়ান হোসেন/৯