সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ইরান-বিরোধী বক্তব্য ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রকৃত কারণ
মধ্যপ্রাচ্য তথা পশ্চিম এশিয়া গত এক দশক ধরে অশান্ত হয়ে আছে। গোলযোগপূর্ণ কোনো কোনো আরব দেশ চলমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান দ্বন্দ্ব সংঘাত শুধু এ অঞ্চলের জনগণের জন্যই নয় একই সঙ্গে সারা বিশ্বের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কেন এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্র শাসিত বেশিরভাগ আরব সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও স্বৈরাচারী আচরণ, বুদ্ধিজীবী ও সমাজসেবীদের অনৈক্য, বর্ণ, ধর্মীয় এবং গোত্রীয় সংঘাত তীব্রতর হওয়া প্রভৃতি বিষয় আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ। এর পাশাপাশি ধর্মের নামে গড়ে ওঠা উগ্র তাকফিরি গোষ্ঠী দায়েশের সন্ত্রাসী কার্যকলাপও নিরাপত্তাহীনতার জন্য দায়ী যার পেছনে রয়েছে আমেরিকার পূর্ণ সমর্থন। তবে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিাকয় সন্ত্রাসী হামলার পর সন্ত্রাস দমনের নামে এ অঞ্চলের দেশগুলোতে পাশ্চাত্যের হস্তক্ষেপও পরিস্থিতি অবনতির জন্য দায়ী।
মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পেছনে সৌদি আরবের ভূমিকার বিষয়টিও কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। সৌদি আরব গত কয়েক দশক ধরে এ অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে দেয়ার চেষ্টা করে আসছে। রিয়াদ প্রথমে সাদ্দামকে দিয়ে ইরানে আগ্রাসন চালায়। সাদ্দাম যুদ্ধ শুরু করলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বৃহৎ শক্তিগুলো ইরাককে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে। সৌদি আরবের নেতৃত্বে রাজতন্ত্র শাসিত আরব সরকারগুলোও কোটি কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র কিনে সাদ্দামকে সহযোগিতা করে। কিন্তু এত কিছুর পরও তারা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে নি। বর্তমানে ইয়েমেনেও তারা একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে।
সৌদি আরব অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ইরানকে পঙ্গু করার জন্য তেল অস্ত্র ব্যবহার করছে। ইচ্ছাকৃতভাবে তেলের মূল্য কমিয়ে দিয়ে সৌদি আরব ইরানের বিরুদ্ধে তার রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণ করতে চাচ্ছে। কিন্তু ইরানের জন্য গর্ত খুঁড়তে গিয়ে সৌদি আরব নিজেই সেই গর্তের মধ্যে পড়েছে। অর্থাৎ সৌদি আরব এখন নিজেই কম মূল্যের তেল সংকটে পড়েছে। তারপরও রিয়াদ এই বিপজ্জনক খেলায় মেতে রয়েছে। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আজ-জুবায়ের সম্প্রতি বেইজিং সফরে গিয়ে ইরান-বিরোধী ভিত্তিহীন অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার জন্য ইরানকে অভিযুক্ত করেছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাসেমি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই অভিযোগের জবাবে বলেছেন- ইয়েমেন, ইরাক ও সিরিয়ায় নিরীহ মানুষ হত্যার সঙ্গে জড়িত সৌদি কর্মকর্তাদের উচিৎ অনর্থক কথা বলার পরিবর্তে এবং অন্য দেশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ না করে বরং নিজেদের সংশোধন করা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অঞ্চলে নৈরাজ্য সৃষ্টিতে সৌদি আরবের ভূমিকা রয়েছে এবং সৌদি আরব ও তার মিত্র দেশগুলোও ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো বর্তমানে ইতিহাসের কঠিন সময় পার করছে। মাইলের পর মাইল জুড়ে ধ্বংস্তুপ, হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ও লাখ লাখ মানুষের শরণার্থী জীবন-এমন হৃদয় বিদারক ঘটনা যা এর আগে কখনো দেখা যায় নি। এসব নৈরাজ্যের ফলে কেবল দখলদার ইসরাইল লাভবান হচ্ছে। মুসলিম দেশগুলোর এ দুর্বলতার সুযোগে ইসরাইল এ অঞ্চলে অবাধে আগ্রাসী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ইরান-বিরোধী অবস্থান মানায় না।#
পার্সটুডে/মোঃ রেজওয়ান হোসেন/১