আবারও ভারতকে ট্রাম্পের হুমকি: মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসলে কি চান?
https://parstoday.ir/bn/news/world-i155808-আবারও_ভারতকে_ট্রাম্পের_হুমকি_মার্কিন_প্রেসিডেন্ট_আসলে_কি_চান
পার্সটুডে- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ভারতকে আরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন।
(last modified 2026-01-18T14:26:52+00:00 )
জানুয়ারি ০৫, ২০২৬ ২০:৩৩ Asia/Dhaka
  • মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী
    মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

পার্সটুডে- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ভারতকে আরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন।

পার্সটুডে জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতকে সতর্ক করে বলেছেন যে রাশিয়ান তেল কেনার পর তিনি দেশটির উপর আরও বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করতে পারেন। রবিবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিমানে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন যে, ভারত যদি রাশিয়ান তেল ক্রয় সীমিত করার জন্য মার্কিন দাবি মেনে না নেয় তবে আমেরিকা ভারতের উপর শুল্ক বৃদ্ধি করতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন: “মোদী [ভারতের প্রধানমন্ত্রী] একজন ভালো মানুষ। তিনি জানতেন যে আমি খুশি নই এবং আমাকে খুশি করা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।” ভারতের রাশিয়ান তেল ক্রয় সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন: “তারা ব্যবসা করে এবং আমরা খুব দ্রুত তাদের উপর শুল্ক বৃদ্ধি করতে পারি।” ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত বছর ভারতীয় পণ্যের উপর আমদানি শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশে উন্নীত করেছে; রাশিয়ান তেল বৃহৎ ক্রয়ের শাস্তি হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এই ভারী শুল্ক সত্ত্বেও, ২০২৫ সালের নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে।

এখন ট্রাম্প, যিনি বাণিজ্য শুল্ক আরোপের আকারে অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহারের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছেন, তিনি আবারও ভারতকে ভারী শুল্কের হুমকি দিয়েছেন। এই বিষয়টির মূলে রয়েছে ওয়াশিংটন এবং নয়াদিল্লির মধ্যে জটিল অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, ভারত সস্তা রাশিয়ান তেলের অন্যতম বৃহত্তম ক্রেতা হয়ে ওঠে। মার্কিন দৃষ্টিকোণ থেকে, এই পদক্ষেপকে মস্কোর বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলিকে দুর্বল করা এবং রাশিয়ার যুদ্ধের অর্থায়নে সহায়তা করা হিসাবে দেখা হয়। ফলস্বরূপ, ট্রাম্প প্রশাসন নয়াদিল্লিকে রাশিয়ান তেলের উপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য করার জন্য পণ্যের উপর ভারী শুল্ক আরোপের মাধ্যমে ভারতের রপ্তানির উপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

৫০ ​​শতাংশে পৌঁছেছে নতুন মার্কিন শুল্ক। ভারতীয় রপ্তানি পণ্য টেক্সটাইল, গয়না, কার্পেট, চামড়াজাত পণ্য, আসবাবপত্র এবং রাসায়নিক দ্রব্যকে টার্গেট করা হয়েছে। এই খাতগুলি মূলত সস্তা শ্রমের উপর নির্ভরশীল, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাদের রপ্তানির মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই শুল্ক ভারতে লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থানকে বিপন্ন করতে পারে।

ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের কারণগুলি কেবল রাশিয়ার তেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়ার সাথে ভারতের সম্প্রসারিত প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিকোণ থেকে, অস্ত্র ক্রয় চুক্তি এবং দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্ব ব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়াও, ট্রাম্প এই নীতির মাধ্যমে অন্যান্য দেশগুলিকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন যে রাশিয়ার সাথে যে কোনও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য মূল্য চোকাতে  হবে।

অবশ্য, ট্রাম্পের হুমকি বিশেষ করে ভারতীয় পণ্যের উপর ভারী শুল্ক আরোপ এবং রাশিয়ান তেল ক্রয় কমানোর চাপ, এমন একটি বাস্তবতা যা ভারত উপেক্ষা করতে পারে না। এই পদক্ষেপগুলি থেকে বোঝা যায় যে ওয়াশিংটন রাশিয়ার সাথে ভারতের জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নিয়ে অসন্তুষ্ট, এগুলিকে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পরোক্ষ সমর্থন হিসাবে দেখছে। তবে, ভারত এমন একটি অবস্থানে রয়েছে যেখানে তারা রাশিয়া থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে রাখতে পারে না। প্রথমত, বিশ্ব বাজারে দ্রুত এবং সস্তা বিকল্প হিসেবে রাশিয়ার অস্ত্র এবং খুচরা যন্ত্রাংশের জরুরি প্রয়োজন রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সস্তা রাশিয়ার তেল কিনে কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে, যা তার অর্থনীতিকে সাহায্য করেছে।

ভারতের উপর ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের প্রভাব বহুমুখী। প্রথমত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, যা পূর্বে বছরে ২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি পৌঁছেছিল তা গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি হ্রাসের ফলে ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের জন্য মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্য প্রতিস্থাপনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, এই পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থা নষ্ট করতে পারে। ভারত, যারা নিজেকে চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে, তারা এই চাপগুলিকে সম্পর্কের অস্থিতিশীলতার লক্ষণ হিসেবে দেখতে পারে এবং রাশিয়া এমনকি চীনের সাথে আরও সহযোগিতা জোরদার করার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। তৃতীয়ত, ট্রাম্পের এ পদক্ষেপে ভারতের অভ্যন্তরে সামাজিক পরিণতিও হবে ভয়াবহ; শিল্প পণ্যের উৎপাদন থমকে যাওয়ায় ব্যাপক বেকারত্ব থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতার নীতি অনুসরণকারী নরেন্দ্র মোদী সরকারের উপর ক্রমবর্ধমান চাপের কথা উল্লেখ করা যায়।

পরিশেষে, ট্রাম্পের আরও শুল্ক আরোপের হুমকি অর্থনৈতিক হাতিয়ারগুলিকে ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। যদিও এই নীতি স্বল্পমেয়াদে ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এশীয় মিত্রের সাথে আমেরিকার কৌশলগত সম্পর্ককে দুর্বল করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। ভারতও, সস্তা জ্বালানির জন্য তার অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে এবং তার বৈদেশিক নীতির স্বাধীনতা রক্ষা করে, রাশিয়ার তেল কেনা সহজে ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা কম। অতএব, এই বাণিজ্য সংকট দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে স্থায়ী উত্তেজনার একটি বিষয় হয়ে উঠতে পারে। ইতিমধ্যে, ট্রাম্পের বাণিজ্য শুল্ক বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় ভারত চীন ও রাশিয়ার সাথে তার সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত করেছে।#

পার্সটুডে/এমআরএইচ/৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন