গভীর সংকট জার্মানির কল্যাণ রাষ্ট্র: ব্যয়, বৈষম্য ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
-
একজন বয়স্ক জার্মান ব্যক্তি ডাস্টবিনে খাবার খুঁজছেন।
পার্সটুডে: জার্মানি বহু বছর ধরে তার সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থার জন্য গর্ব করত। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল—মানুষ অসুস্থ হলে, বেকার হলে বা বৃদ্ধ বয়সে যেন কেউ একা ও অসহায় না থাকে। রাষ্ট্র যেন প্রত্যেক নাগরিকের পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু আজ সেই কল্যাণ ব্যবস্থা নিজেই জার্মানির সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা, বৃদ্ধদের পরিচর্যা, সামাজিক ভাতা—সব খাতে ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে জার্মান সরকার এখন প্রচণ্ড আর্থিক চাপে পড়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলছেন, এই কল্যাণমূলক ব্যবস্থাটি আদৌ ভবিষ্যতে টিকে থাকতে পারবে কি না?
পার্সটুডে–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জার্মান অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের (IW) নতুন এক গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারের মোট ব্যয়ের ৪১ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় হচ্ছে।
খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ভেরোনিকা গ্রিম সতর্ক করে বলেছেন, ২০২৯ সালের পর থেকে জার্মান সরকারের সব আয়ই সামাজিক ব্যয়, প্রতিরক্ষা ও সুদের অর্থ পরিশোধে চলে যাবে। এর ফলে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষাখাতে ব্যয়ের জন্য আর্থিক পরিসর মারাত্মকভাবে সংকুচিত হবে।
জার্মান দৈনিক বিল্ড–এর এক প্রতিবেদনে কল্যাণ রাষ্ট্রের সংকটের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে:
১. শ্রমজীবী মানুষ ও করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ
বিল্ড জানায়, জার্মানিতে কাজের সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত খরচ (যেমন বীমা, সামাজিক চাঁদা, কর ইত্যাদি) ইউরোপের মধ্যে অন্যতম বেশি। মাঝারি আয় থেকেই উচ্চ কর দিতে হয়। ২০২৬ সালে শ্রমসংক্রান্ত অতিরিক্ত ব্যয় রেকর্ড ৪২.৩ শতাংশে পৌঁছাবে।
অন্যদিকে, যারা শ্রম না করে মূলধনী আয় (যেমন শেয়ার, বিনিয়োগ, সম্পদ) থেকে টাকা উপার্জন করেন, তারা মাত্র ২৫ শতাংশ কর দেন এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে কোনো চাঁদা দিতে হয় না। এ কারণে অনেকেই বলেন, এটি একটি “কাঠামোগত অবিচার”—কারণ সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপ বহন করছে, কিন্তু ধনী ও সম্পদশালীরা তুলনামূলকভাবে কম দায়িত্ব নিচ্ছে।
২. পেনশন ব্যবস্থার সংকট: কম কর্মী, বেশি বৃদ্ধ মানুষ
সরকার পেনশন খাতে ভর্তুকি বাড়ালেও জার্মানিতে পেনশনের পরিমাণ ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় কম।
গড় আয়ের তুলনায় পেনশনের হার:
- ১৯৯৯ সালে ছিল ৫৫%
- এখন নেমে এসেছে ৪৮%
অস্ট্রিয়ায়, যেখানে সরকারি কর্মচারীরাও পেনশন তহবিলে টাকা দেন, সেখানে গড় পেনশন জার্মানির চেয়ে প্রায় ৫০% বেশি।
মূল সমস্যা হলো বর্তমান ব্যবস্থা বণ্টনভিত্তিক (pay-as-you-go)। অর্থাৎ, আজ যারা কাজ করছে, তাদের টাকাতেই আজকের বৃদ্ধদের পেনশন দেওয়া হয়।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে:
- ১৯৬২ সালে → ১ জন বৃদ্ধের জন্য ছিল ৬ জন কর্মী
- এখন → ১ জন বৃদ্ধের জন্য আছে মাত্র ২ জন কর্মী
মানে, কম সংখ্যক তরুণকে অনেক বেশি বৃদ্ধ মানুষকে বহন করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জার্মানির অনেক আগেই সঞ্চয়ভিত্তিক ও বিনিয়োগভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থায় যাওয়া উচিত ছিল।
৩. বড় বৈষম্য: সরকারি কর্মচারী বনাম সাধারণ মানুষ
পেনশন ব্যবস্থার সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো এই বিশাল বৈষম্য:
- সাধারণ অবসরপ্রাপ্ত নাগরিক পান: ১৬৯২ ইউরো
- সরকারি কর্মচারী (Beamte) পান: ৩২৪০ ইউরো
অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীদের পেনশন প্রায় ৯১% বেশি।
এই টাকা সরাসরি জনগণের করের অর্থ থেকে দেওয়া হয়। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করছে, এখানে ন্যায়বিচার নেই।
জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষ চান:
- সরকারি কর্মচারী
- রাজনীতিবিদ
- ফ্রিল্যান্সার
সবাই যেন সাধারণ পেনশন তহবিলে টাকা দেন।
৪. নাগরিক ভাতা ও কাজের আগ্রহ কমে যাওয়া
জার্মানির নতুন “সিটিজেনস মানি” (Bürgergeld) বা নাগরিক ভাতা এখন ন্যূনতম মজুরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
একজন ভাতা গ্রহণকারী পান:
- ৫৬৩ ইউরো
- তার সঙ্গে বাড়িভাড়া ও জ্বালানি খরচ আলাদা করে দেওয়া হয়
অন্যদিকে, একজন ন্যূনতম মজুরিতে কাজ করা শ্রমিক বাড়িভাড়া ও খরচ বাদ দিয়ে হাতে পান মাত্র ৭৪৫ ইউরো।
এই অল্প পার্থক্যের কারণে অনেক মানুষ মনে করছে—কাজ করার চেয়ে ভাতা নেওয়াই বেশি লাভজনক বা সহজ। ফলে কাজের প্রতি আগ্রহ কমছে।
৫. জটিল ও অকার্যকর আমলাতন্ত্র
জার্মান কল্যাণ ব্যবস্থায় আছে:
- ৫০০টির বেশি সামাজিক ভাতা
- ৩০০০টির বেশি আইন ও ধারা
এই ব্যবস্থা এত জটিল যে অনেক সময় বিশেষজ্ঞরাও পুরোপুরি বুঝতে পারেন না।
এর ফলে অনেক মানুষ তাদের প্রাপ্য সুবিধাই পান না।
উদাহরণ:
- যেসব পরিবার অতিরিক্ত শিশু ভাতা পাওয়ার যোগ্য, তাদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সেই সুবিধা পায়।
ফেডারেল কর্মসংস্থান সংস্থায় লোকবল সংকট রয়েছে এবং অনেক কর্মী প্রকৃত অর্থে মানুষকে কাজ খুঁজে দিতে পারছেন না।
৬. শিক্ষা বৈষম্য: শৈশব থেকেই অসমতা
জার্মানিতে শিক্ষায় সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে পরিবার কতটা সচ্ছল তার ওপর।
- দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মাত্র ২১% উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে
- শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ৮০%
স্কুলছুটের হার ১২.৯%, যা ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় বেশি।
অনেক স্কুল ভবন জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে এবং দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজন।
অধ্যাপক লুডগার ভসমান বলেন:
“ভালো শিক্ষা নীতিই সবচেয়ে ভালো অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতি।”
তিনি বলেন:
- ছোটবেলা থেকেই শিশুদের সহায়তা দরকার
- ডে-কেয়ার কেন্দ্রগুলোর মান উন্নত করতে হবে
- দরিদ্র এলাকার স্কুলগুলোতে বিশেষ সহায়তা দিতে হবে
এতে ভবিষ্যতে সামাজিক ব্যয় কমবে।
- ৭. অভিবাসন ও কল্যাণ ব্যবস্থার চাপ
IAB–এর তথ্য অনুযায়ী:
- শরণার্থী পটভূমির ৪২.১% মানুষ নাগরিক ভাতা পাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জার্মানি কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দক্ষতাভিত্তিক অভিবাসন নীতি অনুসরণ করে না। ফলে অনেক কম দক্ষ মানুষ দেশটিতে প্রবেশ করছে, যারা সহজে শ্রমবাজারে যুক্ত হতে পারছে না। এতে কল্যাণ ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
পার্সটুডে/এমএআর/২৯