যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে ইরান তার 'গোপন ক্ষমতা' প্রয়োগ করবে: ইউরোপীয় থিঙ্কট্যাংক
-
ইরানের খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্র
ইউরোপের প্রভাবশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান “ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (ইসিএফআর)” এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালায়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং পুরো পশ্চিম এশিয়া অঞ্চল একটি বড় অস্থিরতার মুখে পড়বে।
বার্লিনভিত্তিক এই থিঙ্কট্যাংক ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে একযোগে কাজ করে ওয়াশিংটনের সামরিক পদক্ষেপ ঠেকানোর চেষ্টা করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি প্রেসিডেন্টের সামনে একই প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে- সামরিক শক্তি ব্যবহার করে কি ইরানের সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন করা সম্ভব?
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্প 'সহায়তা আসছে' বলে মন্তব্য করেছিলেন, কিন্তু তার প্রকৃত লক্ষ্য কী—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভের পর থেকে ট্রাম্প একাধিকবার ইরানকে সামরিকভাবে হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার কথাও বলেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে, যা উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়েছে।
ইউরোপীয় থিঙ্কট্যাংকটি আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেছে, পশ্চিমা দেশগুলোর উচিত বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে- বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ সাধারণত স্থিতিশীলতা আনে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি সংকট, সহিংসতা ও ধ্বংস ডেকে আনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো 'অপ্রত্যাশিত পরিণতি'।
যদি যুক্তরাষ্ট্র বড় আকারের হামলা শুরু করে এবং লক্ষ্য হয় সরকার পরিবর্তন, তাহলে ইরান সহজে চুপ থাকবে না।
থিঙ্কট্যাংকের মতে, ইরান তখন কয়েকটি পথে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে:
প্রথমত, ইরান অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও সেনাদের ওপর হামলা চালাতে পারে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, ইরান আঞ্চলিক তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও পণ্যমূল্য হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দেবে।
তৃতীয়ত, ইরান তার আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয় করে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে সমন্বিত হামলা চালাতে পারে, এর মধ্যে ইসরায়েলও রয়েছে।
প্রতিবেদনটি উল্লেখ করে যে, ২০২৫ সালের জুনে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান এসব সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করেনি। কিন্তু যদি দেশটি নিজ অস্তিত্বকে হুমকির মুখে দেখে, তাহলে সে সব ধরনের সামরিক ও কৌশলগত ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারে।
ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস স্পষ্ট করে বলেছে, এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে একটি 'দ্রুত ও নির্ণায়ক বিজয়' অর্জন করা বাস্তবসম্মত নয়।
প্রতিবেদনটি আরও জানায়, গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ যেখানে হয়েছে, সেখানে সাধারণত ফলাফল হয়েছে- রক্তপাত, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, রাষ্ট্র কাঠামোর দুর্বলতা, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক বিভাজন।
লিবিয়া ও সিরিয়ার উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, বিদেশি হস্তক্ষেপের ফলেই এসব দেশে ভাঙন, বহু-কেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামো এবং ইউরোপমুখী বড় অভিবাসন সংকট তৈরি হয়েছে।
থিঙ্কট্যাংকটি জোর দিয়ে বলেছে, ইরানে সম্ভাব্য যুদ্ধ এসব দেশের চেয়েও অনেক বেশি জটিল হবে। কারণ—
ইরানের সামরিক কাঠামো এখনো সংগঠিত ও কার্যকর। দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি অংশ বিদেশি সহায়তায় সরকার পরিবর্তনের চেষ্টাকে 'পবিত্র যুদ্ধ' হিসেবে দেখে এবং ইরানের ভূখণ্ড বিশাল এবং জনসংখ্যা ৯ কোটির বেশি—যা দেশটিকে ভেঙে পড়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
এই বাস্তবতায়, যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটোর জন্য ইরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা ইরাক বা লিবিয়ার চেয়েও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
প্রতিবেদনের শেষ অংশে বলা হয়েছে, আরব দেশগুলো ও তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে। তারা মনে করে, এই ধরনের যুদ্ধ পুরো অঞ্চলকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেবে।
এছাড়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর সীমিত হামলা চালিয়ে ১২ দিনের যুদ্ধের মতো একটি মডেল আবার বাস্তবায়ন করা একটি ভ্রান্ত ধারণা।
২০২৫ সালের জুনে ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রভাবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিলেন।
বর্তমানে তিনি আবার 'মানবাধিকার'-এর অজুহাতে সামরিক পদক্ষেপের বাড়তি চাপের মুখে পড়ছেন- যা তাকে ইরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘ, অবিরাম এবং নিয়ন্ত্রণহীন সংঘাতের পথে ঠেলে দিতে পারে।#
পার্সটুডে/এমএআর/৩১