মার্কিন আধিপত্যের পতনের ১৪টি পর্যায়
তেহরান-ওয়াশিংটন সংঘাতের পাঁচ দশকের ইতিহাস
পার্সটুডে: গত প্রায় পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। এক সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে বিপ্লবের আগের সময়ে 'স্থিতিশীলতার দ্বীপ' বলে অভিহিত করত। তখন ইরান ছিল আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং পশ্চিম এশিয়ায় তাদের অন্যতম প্রধান ভরসার দেশ। কিন্তু আজ বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। এখন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন শক্তিকে বড় ধরনের কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখছেন।
এই দীর্ঘ সময়ে ইরান বহুবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি (Hard Power) ও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব (Soft Power)–এর পরিকল্পনাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। ফলে ধীরে ধীরে অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বদলে যেতে শুরু করে।
পার্সটুডে'র এই প্রতিবেদনে ওয়াশিংটনের সাথে ইরানের পাঁচ দশকের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ১৪টি ধাপ তুলে ধরা হলো- যেগুলো ইরান-আমেরিকা সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
১) পাহলভি শাসনের পতন
এই ঘটনাটি ছিল সবচেয়ে বড় ধাক্কা। যুক্তরাষ্ট্র যাকে পশ্চিম এশিয়ার 'পুলিশ' বা রক্ষক মনে করত, সেই পাহলভি শাসনের পতন ঘটে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে। শেষ সময়ে আমেরিকা জেনারেল হাইজারকে পাঠিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র ও ঘাঁটি হারায়।
২) মার্কিন দূতাবাস দখল
তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল এবং গুপ্তচরবৃত্তির নথি প্রকাশ- আমেরিকার জন্য বড় অপমানের বিষয় ছিল। ৪৪৪ দিন ধরে মার্কিন নাগরিকরা জিম্মি থাকার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় সংকট তৈরি করে। ইরানের বিপ্লবী নেতৃত্ব এটিকে 'দ্বিতীয় বিপ্লব' হিসেবে দেখেছিল।
৩) তাবাসে মার্কিন অভিযান ব্যর্থ
মার্কিন সেনাবাহিনী জিম্মিদের উদ্ধার করতে ইরানে গোপন অভিযান চালায়, কিন্তু তাবাস মরুভূমিতে সেই অভিযান সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে আধুনিক সামরিক যন্ত্রপাতি ধ্বংস হয় এবং এই ঘটনা বিশ্ববাসীর সামনে মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে।
৪) নোজে অভ্যুত্থান ব্যর্থ
বিদেশি সহায়তায় পরিকল্পিত একটি সামরিক অভ্যুত্থান বাস্তবায়নের আগেই ধরা পড়ে যায়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, নতুন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তখনই অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।
৫) আট বছরের যুদ্ধ ও ইরানের প্রতিরোধ
সাদ্দাম হোসেনের ইরাককে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তি সমর্থন দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করায়। কিন্তু দীর্ঘ আট বছর যুদ্ধের পরও ইরান ভেঙে পড়েনি। এক টুকরো জমিও স্থায়ীভাবে শত্রুর দখলে যায়নি। সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে দুর্বল করার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
৬) ২০০৯ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা
কিছু দেশে যে রঙিন বিপ্লবের কৌশল কাজ করেছিল, ইরানে তা সফল হয়নি। জনগণের সক্রিয় উপস্থিতির কারণে সেই আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যায় এবং সরকার টিকে থাকে।
৭) মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত
২০১১ সালে RQ-170 ড্রোন আটক এবং ২০১৯ সালে গ্লোবাল হক ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, আকাশপথে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য আর আগের মতো নেই।
৮) দায়েশ (আইএসআইএস) পরাজয়
ইরান দায়েশের বিরুদ্ধে বড় ভূমিকা রাখে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা এবং প্রক্সি যুদ্ধ কৌশল বড় ধাক্কা খায়।
৯) পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌসেনা আটক
২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর হাতে মার্কিন ১০ মার্কিন নৌসেনা আটকের ঘটনা বিশ্ববাসীর সামনে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
১০) আইন আল-আসাদ ঘাঁটিতে হামলা
জেনারেল কাসেম সোলেইমানি শহীদ হওয়ার পর ইরান সরাসরি ইরাকে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি আইন আল-আসাদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। আধুনিক ইতিহাসে এটি ছিল খুবই বিরল ঘটনা।
১১) আল-উদেইদ ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু
ইরানের পরমাণু স্থাপনায় আমেরিকার হামলার প্রতিক্রিয়ায় কাতারের গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা ওয়াশিংটনের ওপর বড় ধরনের মানসিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করে।
১২) ২০২২ সালের অস্থিরতা ব্যর্থ
বহু আন্তর্জাতিক সমর্থন ও প্রচারণা থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার পরিকল্পনা সফল হয়নি।
১৩) নৌ-ক্ষমতা ও তেল ট্যাঙ্কার জব্দ
মার্কিন তেল ট্যাঙ্কার জব্দ ও আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানি নৌবহরের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, সমুদ্রে যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য আর নেই।
১৪) ১৪০৪ সালের জানুয়ারির ষড়যন্ত্র ব্যর্থ
গতমাসে আমেরিকা-ইসরায়েলের মদদপুষ্ট অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা- জনগণ ও নিরাপত্তা বাহিনীর কারণে ব্যর্থ হয়। রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক আবার শক্তিশালী হয়।
এই ১৪টি ধাপ মিলিয়ে একটি স্পষ্ট চিত্র তৈরি হয়—যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও আধিপত্য ধীরে ধীরে দুর্বল হয়েছে। অন্যদিকে ইরান “সক্রিয় প্রতিরোধ” নীতির মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্ত করেছে। এর ফলে পশ্চিম এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বদলে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাবের যুগ আগের মতো আর নেই।
এই ইতিহাস মূলত দেখায়, দীর্ঘ লড়াই, রাজনৈতিক চাপ, সামরিক সংঘাত এবং জনগণের ভূমিকার মাধ্যমে কিভাবে একটি দেশ বৈশ্বিক শক্তির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।#
পার্সটুডে/এমএআর/৩