জুন ১১, ২০১৬ ১২:৪৯ Asia/Dhaka

সিয়াম বা রোজা হচ্ছে সংযম সাধনা। সব ধরনের প্রবৃত্তি ও ইন্দ্রিয়কে সংযত ও সংযমী রাখার চেষ্টাই হচ্ছে সিয়াম সাধনা। মানুষের প্রবৃত্তি বা নফস বিদ্রোহী স্বভাবের। সীমালঙ্ঘনই এর স্বভাব। এই প্রবৃত্তি যে কোনো অজুহাতে ও সুযোগে বিবেককে বন্দি করে এমন সব কাজে লিপ্ত হতে মানুষকে বাধ্য করে যে তাতে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য, নিয়ম-নীতি ও খোদায়ী নির্দেশ পদদলিত হয়।

রোজার আসল উদ্দেশ্যকে সব সময় মনে রেখে চিন্তা-চেতনা, ইচ্ছা ও কাজে তার প্রভাব বিস্তার করতে না পারলে শুধু পানাহার থেকে ও জৈবিক চাহিদা মেটানো থেকে বিরত থেকে কোনো নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ করতে পারে না রোজাদার। এ জন্যই মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ ছাড়বে না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। এমন অনেক রোজাদার আছে যারা ক্ষুধা ও পিপাসার কষ্ট ভোগ ছাড়া অন্য কিছুই অর্জন করে না।’

রমজান আসে রমজান যায়। কিন্তু অনেক মানুষ সংযম ও খোদা-প্রেম অর্জন করতে পারে না সারা জীবনেও। অন্যদিকে যারা ঈমানকে প্রতিটি মুহূর্তে টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করে মনের ভেতরে ও বাহ্যিক কাজে এবং সংযমের চর্চা জোরদার করে রমজান মাসে তারা প্রকৃতপক্ষে সারা বছর ও পুরো জীবনভর রোজার সুফল ভোগ করে। কারণ, এ ধরনের মানুষ রমজানের পরও বাহ্যিক দৃষ্টিতে রোজা রাখুক বা না রাখুক রোজার উদ্দেশ্যকে সব সময় মনে রাখেন এবং সব সময় খোদা-প্রেম ও খোদা-ভীতির সীমানাগুলো মেনে চলার চেষ্টা করেন।

পবিত্র রমজান হচ্ছে খোদা-প্রেম, আত্ম-গঠন ও ইবাদত-বন্দেগির বসন্তকাল। পবিত্র কুরআন নাজিল হওয়ার এই মাস মহান আল্লাহর অশেষ রহমত বরকত ও মাগফিরাতের দরিয়ায় অবগাহনের মাস। এ মাস দোয়া এবং গভীর চিন্তা-ভাবনাসহ পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের সবচেয়ে মোক্ষম ঋতু।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) পবিত্র রমজান মাসের প্রাক্কালে এই মাসের ও রোজার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “হে মানুষ! নিঃসন্দেহে তোমাদের সামনে রয়েছে আল্লাহর বরকতপূর্ণ মাস। এ মাস বরকত, রহমত বা অনুগ্রহ ও ক্ষমার মাস। এ মাস মহান আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ মাস। এ মাসের দিনগুলো সবচেয়ে সেরা দিন, এর রাতগুলো শ্রেষ্ঠ রাত এবং এর ঘণ্টাগুলো শ্রেষ্ঠ ঘণ্টা। এ মাস এমন এক মাস যে মাসে তোমরা আমন্ত্রিত হয়েছ আল্লাহর মেহমান হতে তথা রোজা রাখতে ও প্রার্থনা করতে। তিনি তোমাদেরকে এ মাসের ভেতরে সম্মানিত করেছেন। এ মাসে তোমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস মহান আল্লাহর গুণগান করার বা জিকরের (সওয়াবের) সমতুল্য; এ মাসে তোমাদের ঘুম প্রার্থনার সমতুল্য, এ মাসে তোমাদের সৎকাজ এবং দোয়াগুলো কবুল করা হবে। তাই মহান আল্লাহর কাছে আন্তরিক ও (পাপ ও কলুষতামুক্ত) পবিত্র চিত্তে প্রার্থনা করো যে তিনি যেন তোমাদেরকে রোজা রাখার এবং কুরআন তিলাওয়াতের তৌফিক দান করেন।"

মহানবী (সা.) আরও বলেছেন, "নিঃসন্দেহে সে ব্যক্তি প্রকৃতই হতভাগ্য যে রমজান মাস পেয়েও মহান আল্লাহর ক্ষমা হতে বঞ্চিত হয়। এ মাসে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে শেষ বিচার দিবসের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা স্মরণ কর। অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রদেরকে সাহায্য কর ও সদকা দাও। বয়স্ক ও বৃদ্ধদের সম্মান কর এবং শিশু ও ছোটদের আদর কর। (রক্তের সম্পর্কের) আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ রক্ষা কর। তোমাদের জিহ্বাকে অন্যায্য বা অনুপযোগী কথা বলা থেকে সংযত রাখ, নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখা থেকে চোখকে ঢেকে রাখ, যেসব কথা শোনা ঠিক নয় সেসব শোনা থেকে কানকে নিবৃত রাখ। ইয়াতিমদেরকে দয়া কর যাতে তোমার সন্তানরা যদি ইয়াতিম হয় তাহলে তারাও যেন দয়া পায়।

গোনাহর জন্যে অনুতপ্ত হও ও তওবা কর এবং নামাজের সময় মোনাজাতের জন্যে হাত উপরে তোলো, কারণ নামাজের সময় দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়, এ সময় মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকান, এ সময় কেউ তাঁর কাছে কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন, কেউ তাঁকে ডাকলে তিনি জবাব দেন, কেউ কাকুতি-মিনতি করলে তা তিনি গ্রহণ করেন।"

রমজানের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বিশ্বনবী (সা.) আরও বলেছেন, "হে মানুষ! তোমরা তোমাদের বিবেককে নিজ কামনা-বাসনার দাসে পরিণত করেছো, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে একে মুক্ত করো। তোমাদের পিঠ গোনাহর ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে আছে, তাই সিজদাগুলোকে দীর্ঘ করে পিঠকে হালকা করো। জেনে রাখ, মহান আল্লাহ নিজ সম্মানের শপথ করে বলেছেন, রমজান মাসে নামাজ আদায়কারী ও সিজদাকারীদেরকে জবাবদিহিতার জন্য পাকড়াও করবেন না এবং কিয়ামতের দিন তাদেরকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। হে মানুষেরা! তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো মুমিনের জন্য ইফতারের (দিনের রোজা শেষে যে খাদ্য গ্রহণ করা হয়) আয়োজন করে তাহলে আল্লাহ তাকে একজন গোলামকে মুক্ত করার সওয়াব দান করবেন এবং তার অতীতের সব গোনাহ মাফ করবেন।" বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন: কিন্তু আমাদের মধ্যে সবাই অন্যদেরকে ইফতার দেয়ার সামর্থ্য রাখেন না। বিশ্বনবী (সা.) বললেন: তোমরা নিজেদেরকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা কর, যদিও তা সম্ভব হয় একটি মাত্র খুরমার অর্ধেক অংশ কিংবা তাও যদি না থাকে তাহলে সামান্য পানি অন্য রোজাদারকে ইফতার হিসেবে আপ্যায়নের মাধ্যমে।"

অর্থসহ ২য় রমজানের দোয়া

الیوم الثّانی : اَللّـهُمَّ قَرِّبْنی فیهِ اِلى مَرْضاتِکَ، وَجَنِّبْنی فیهِ مِنْ سَخَطِکَ وَنَقِماتِکَ، وَوَفِّقْنی فیهِ لِقِرآءَةِ ایـاتِکَ بِرَحْمَتِکَ یا اَرْحَمَ الرّاحِمینَ .

হে আল্লাহ! তোমার রহমতের উসিলায় আজ আমাকে তোমার সন্তুষ্টির কাছাকাছি নিয়ে যাও। দূরে সরিয়ে দাও তোমার ক্রোধ আর গজব থেকে । আমাকে তৌফিক দাও তোমার পবিত্র কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করার । হে দয়াবানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়াময়। #

পার্সটুডে/এআর/১১