জুন ১২, ২০১৬ ১৪:৪৮ Asia/Dhaka

গত পর্বের আলোচনায় আমরা পাপ কাজের পক্ষে শয়তানের কুমন্ত্রণা সম্পর্কে কথা বলছিলাম। আমরা বলছিলাম যে, কোনো পাপকে দৃশ্যত ছোট মনে হলেও তা মনে করা উচিত নয়। কারণ, তা আল্লাহ দেখছেন।

কেউ যদি ১ টাকা চুরি করে সেও আল্লাহর দৃষ্টিতে চোর এবং কেউ যদি দশ লাখ টাকা চুরি করে সেও আল্লাহর দৃষ্টিতে চোর। তাই পাপকে ছোটো মনে করা হচ্ছে বড় পাপ। একটি বিশাল দুধের পাত্রে মাত্র এক ফোটা গো-মূত্র বা এ জাতীয় নাপাক কিছু পড়লে সেই বিশাল পাত্রের পুরো দুধই অপবিত্র হয়ে যায়।

অনেক মানুষ মহান আল্লাহ মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বকে সব সময় হৃদয় দিয়ে অনুভব করে না বলে পাপে জড়িয়ে পড়ে। আমরা নামাজ পড়ার সময় বলছি আল্লাহু আকবার বা আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। অথচ নামাজ পড়ার পরই আবারও পাপে জড়িত হই! অর্থাৎ আল্লাহকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মুখে স্বীকার করা সত্ত্বেও কাজের বেলায় তার শ্রেষ্ঠত্বকে মানার পরীক্ষায় ফেল করছি। রমজানের রোজা এ ধরনের পরীক্ষায় ফেলের মাত্রা কমিয়ে আনতে সহায়তা করে কুপ্রবৃত্তিকে দমানোর অনুশীলনের মাধ্যমে। ঈমান তো কেবল মৌখিক স্বীকৃতি নয়। কাজেও তা প্রমাণ করতে হয়। তাই সবক্ষেত্রে মহান আল্লাহর আদেশকে শিরোধার্য করতে হবে।

মুসলমানরা পবিত্র কুরআনের আলোকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে জীবনের সবক্ষেত্রে সর্বোত্তম আদর্শ বলে স্বীকার করে নিলেও বাস্তব জীবনে আমাদের অনেকেই পাশ্চাত্যের নানা দর্শন ও সমাজ-ব্যবস্থাকে জীবনের কোনো কোনো ক্ষেত্রে আদর্শ বলে গ্রহণ করছি। পশ্চিমা পুঁজিবাদ, কথিত উদার গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শ বা সমাজতন্ত্রের মত ত্রুটিপূর্ণ জীবনাদর্শকে মুসলিম প্রধান দেশেও রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন অনেকেই। তাহলে এই ব্যক্তিরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে জীবনের সবক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ বলে মানছেন কি? এভাবে প্রতিটি মুহূর্তে আমরা নানা পরীক্ষায় কখনও জ্ঞানের অভাবে বা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালভাবে চেনা-জানার অভাবে এবং কখনওবা শয়তানের কুমন্ত্রণার কাছে পরাস্ত হওয়ার কারণে ও কখনওবা কুপ্রবৃত্তিকে দমনের অভ্যাস না থাকার কারণে নানা ধরনের পাপে জড়িত হচ্ছি। কখনওবা ব্যক্তিগতভাবে, কখনওবা পারিবারিকভাবে ও কখনওবা সামাজিকভাবে পাপে জড়িত হচ্ছি আমরা। পাপের অনেক ধরন রয়েছে। তার মধ্যে সাংস্কৃতিক পাপও কম ভয়ানক নয়। যে চলচ্চিত্র, যে বই বা যে কার্টুন ও গেইম নিজের জন্য এবং শিশু-কিশোরদের জন্য ক্ষতিকর তা আমরা এড়িয়ে চলছি না সচেতনতার অভাবে।

ধর্মীয় ক্ষেত্রেও পাপ করা হয় নানা পন্থায়। রিয়া বা লোক-দেখানো ইবাদত, নিজেকে বড় আবেদ বা ইবাদতকারী ভাবা তথা অহংকারের ফাঁদে পড়া, ভুল-চিন্তাধারাকে ইসলামী চিন্তাধারা বলে মনে করা এসবও বড় ধরনের পাপ। এইসব পাপেরও একটা বড় কারণ হল, অজ্ঞতা তথা মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে (সা.) ভালোভাবে না চেনা। অজ্ঞতা দূর করার জন্য জ্ঞান-অর্জন জরুরি তথা ফরজ। মানুষের ইবাদতের মূল্য নির্ভর করে ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরতার ওপর। একজন মূর্খের বহু বছরের ইবাদত একজন জ্ঞানীর কয়েক মুহূর্তের জ্ঞান-চর্চা ও জ্ঞানগত চিন্তার চেয়েও কম মূল্যবান। মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালভাবে চিনতে হলে দ্বারস্থ হতে হবে পবিত্র কুরআন এবং বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের কাছে। নির্ভরযোগ্য নানা হাদিসে এসেছে যে, মহানবী (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদের কাছে দুটি ভারি বস্তু রেখে যাচ্ছি, তোমরা যদি এ দুটি বস্তু আঁকড়ে ধর তাহলে কখনও বিভ্রান্ত হবে না।

বিশ্বনবী (সা.) তাঁর পবিত্র আহলে বাইতকে নুহ নবীর (আ.) কিশতির সাথেও তুলনা করেছেন। মুসলমানদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও তাঁর মহান রাসূলের (সা.) পর আহলে বাইতের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি উপলব্ধি করেনি তারাই বিভ্রান্ত হয়েছে। যারা অজ্ঞতার কারণে ভুল করছেন তাদেরকে হয়তো আল্লাহ ক্ষমা করবেন। কিন্তু যারা জেনে-শুনে আহলে বাইতকে এড়িয়ে গেছেন তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। মহানবীর (সা.) আহলে বাইতের মর্যাদা মুসলমানদের কাছে ভালোভাবে তুলে ধরা হয়নি বলেই বিভ্রান্ত মুসলমানদের হাতে এতো নির্মমভাবে শহীদ হতে হয়েছিল হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)সহ কারবালার বীর শহীদদেরকে। ধর্মান্ধ খারিজিরা হযরত আলী (আ.)'র বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল অজ্ঞতার কারণে। তারা আলী (আ.)-কে কাফির বলেছিল! আর একদল জ্ঞানপাপী আলী (আ.)'র সেনাদেরকে ধোঁকা দেয়ার জন্য কুরআনকে বর্শার আগায় তুলে ধরেছিল। তাদেরই ষড়যন্ত্রে বিষ-প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল ইমাম হাসান (আ.)-কে।

বনি-উমাইয়ার আহলে-বাইত-বিদ্বেষী প্রচারণার কারণে সিরিয়ার জনগণ এতই বিভ্রান্ত হয়েছিল যে আমিরুল মু'মিনিন আলী (আ.) যখন কুফার মসজিদে নামাজ পড়ারত অবস্থায় ঘাতকের হামলার শিকার হন এবং ওই আঘাতের কারণে দুদিন পর শহীদ হন তখন সিরিয়ার বিভ্রান্ত মুসলমানরা বিস্মিত হয়ে বলেছিল, আলী মসজিদে কেনো গিয়েছিল?!! সে কি নামাজ পড়তো নাকি?!!! বনি-উমাইয়ার শাসকরা দশকের পর দশক ধরে হযরত আলী (আ.) ও নবী-বংশকে গালি দিয়েছিল জুমআর খুতবায়। বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের ভাষায়:

 

এই ধূর্ত ও ভোগীরাই তলোয়ারে বেঁধে কোরআন,

আলী'র সেনারে করেছে সদাই বিব্রত পেরেশান !

এই এজিদের সেনাদল শয়তানের প্ররোচনায়

হাসানে হোসেনে গালি দিতে যেত মক্কা ও মদিনায়।

 

তাই প্রকৃত ইসলামী চিন্তাধারাগুলোকে ভালোভাবে জানার জন্য ও বোঝার জন্য ইসলামের সঠিক ইতিহাস এবং বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতকেও জানতে হবে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি।

 

অর্থসহ রমজানের চতুর্থ রোজার দোয়া:

الیوم الرّابع : اَللّـهُمَّ قَوِّنی فیهِ عَلى اِقامَةِ اَمْرِکَ، وَاَذِقْنی فیهِ حَلاوَةَ ذِکْرِکَ، وَاَوْزِعْنی فیهِ لاَِداءِ شُکْرِکَ بِکَرَمِکَ، وَاحْفَظْنی فیهِ بِحِفْظِکَ وَسَتْرِکَ، یا اَبْصَرَ النّاظِرینَ .

হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে তোমার নির্দেশ পালনের শক্তি দাও। তোমার জিকিরের মাধুর্য আমাকে আস্বাদন করাও। তোমার অপার করুণার মাধ্যমে আমাকে তোমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য প্রস্তুত কর । হে দৃষ্টিমানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দৃষ্টিমান। আমাকে এ দিনে তোমারই আশ্রয় ও হেফাজতে রক্ষা কর। #

 

পার্সটুডে/এআর/১২