রমজানের উপহার (খোদাভীরুতা)
মহান আল্লাহ এমন কোনো বিধান দেননি যা ইহকালে ও পরকালে মানুষের জন্য কল্যাণের ফল্গুধারা বয়ে আনে না। রমজানও মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার পথে এগিয়ে নেয়ার মাধ্যম। মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে এবং তার আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও নৈতিক উন্নয়নে রোজার রয়েছে অপরিসীম ভূমিকা।
প্রাপ্ত-বয়স্ক মুসলমান নর-নারীর জন্য রোজা রাখা ফরজ। নামাজ, হজ ও জাকাতের মতই তা ফরজ। কেউ যদি রমজানে রোজার ফরজ হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে।
একজন মুসলমান আল্লাহর বিধান বা নির্দেশের প্রতি অনুগত হয়ে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পানাহার ও বৈধ যৌন আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখে কী অনুভূতি পান? এ হল এমন এক অনুভূতি যে আল্লাহ আপনাকে সব সময়ই দেখছেন ও তিনি সব স্থানেই আছেন এবং আপনি গোপনেও আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করছেন না! এভাবে যেসব খাদ্য ও বিষয় বৈধ ছিল অন্য সময় তা রমজানের ভোর রাত থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আপনি পরিহার করছেন বেশ কষ্ট স্বীকার করে।
অন্য কথায় দীর্ঘ অনেক সময় পর্যন্ত আপনি রোজার বিধান অমান্য করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা করছেন না। আপনি গোপনে কিছু পান করলে বা কিছু খেলেও তো কোনো মানুষ আপনাকে দেখতো না! কিন্তু তা সত্ত্বেও আপনি নিজের প্রবৃত্তিকে দমিয়ে রাখছেন এবং এই সংযম ও খোদাভীরুতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজেই হচ্ছেন নিজের পুলিশ। আর আপনি যখন এভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন তখন আপনি অন্য যে কোনো সময়ও এবং যে কোনো স্থানে সুযোগ পেলেই দুর্নীতি বা ফাঁকিবাজির আশ্রয় নেবেন না, অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করবেন না ও কোনো ধরনের পাপে লিপ্ত হবেন না।
রমজানে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি, দয়া ও দরিদ্র বা ইয়াতিমদের সহায়তা করার মত নানা মহৎ গুণ বিকাশের মাধ্যমে সামাজিক ঐক্য ও সম্প্রীতিও জোরদার করা যায়।
রমজান মাস মানব-প্রেম শেখার মাস। নামাজে আমরা সবার জন্য সরল পথ ও মুক্তির পথের কথা উচ্চারণ করি এবং সৎ বান্দাদের প্রতি সালাম দিয়ে থাকি। এর উদ্দেশ্য হল মানুষের সমাজবদ্ধতা ও সামগ্রিক উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব আরোপ। মানুষ সামাজিক জীব। তার জন্য স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রীকতা বেমানান। এ জন্যই বলা হয়, যে কেবল নিজের জন্যই দোয়া করে তার দোয়া কবুল হয় না। তাই মহাপুরুষরা অন্য সবার জন্য দোয়া কর পরই নিজের বা নিজের পরিবারের জন্য দোয়া করতেন। বলা হয় যেখানে সমবেতভাবে দোয়া করা হয় সেখানে ৪০ জনের মধ্যে যদি মাত্র একজনও মু'মিন থাকেন তার উসিলায় অন্যদের প্রার্থনাও কবুল করা হয়। তাহাজ্জতের নামাজের কুনুতে চল্লিশ জন মুমিনের জন্য দোয়া করতে বলা হয়েছে। একই কারণে রমজানে আত্মীয়-স্বজনের ও বন্ধু-বান্ধবের খোঁজ-খবর নেয়ার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
একটি হাদিসে এসেছে, বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, 'মানবজাতি হচ্ছে মহান আল্লাহর পরিবার। তাই তারাই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় যার তার পরিবারের সবচেয়ে বেশি উপকার বা কল্যাণ করেন।'
বিশ্বনবী (সা.) পথহারা মানুষ ও কাফিরদের মঙ্গল কামনায় উদগ্রীব থাকতেন। কাফিররা অজ্ঞতা ও গোঁড়ামির কারণে সুপথে আসছে না বলে তাদের দুঃখে মহানবীর (সা.) প্রাণ মুবারক যেন দেহছাড়া হওয়ার উপক্রম হত।
পবিত্র কুরআনের সুরা তওবায় বলা হয়েছে, 'আর মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌছে দেবে। এটি এজন্যে যে এরা জ্ঞান রাখে না।'
খোদা-প্রেমিকদের সব কিছুর আগে হতে হয় মানব-প্রেমিক। রমজানের রোজা আমাদের মানবপ্রেমিক হওয়ার শিক্ষাও দেয়। রমজানে ও এমনকি অন্য সময়ও খোদা-প্রেমিকদের অন্যতম প্রিয় মুনাজাত হল: 'হে আল্লাহ! কবরবাসীদের উৎফুল্ল রাখুন, দরিদ্রদের ধন বা প্রাচুর্য দিন, সব ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করুন, সব বস্ত্রহীনকে বস্ত্র বা কাপড় দিন, ঋণগ্রস্তকে ঋণমুক্ত করুন, হে আল্লাহ! দুঃখিত বা বিষণ্ণ ব্যক্তিদের খুশি করুন, সব মুসাফিরকে নিরাপদে ঘরে ফিরিয়ে আনুন, সব বন্দীকে মুক্তি দান করুন, সব অসুস্থকে সুস্থতা দান করুন, হে আল্লাহ! মুসলমানদের সমাজ থেকে সব ধরনের দুর্নীতি দূর করুন, হে আল্লাহ! আমাদের মন্দ অবস্থাকে উত্তম অবস্থায় রূপান্তরিত করুন....।'
রমজানে রোজাদারদের ইফতার করানোর ওপর ব্যাপক জোর দেয়া হয়েছে। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, তোমরা নিজেদের দোযখের আগুন থেকে রক্ষা কর অন্তত একটি খেজুরের অর্ধেক অন্যকে ইফতার করতে দিয়ে বা কিছু না থাকলে সামান্য পানি দিয়ে হলেও!
ইসলাম যে সমাজ কল্যাণের ধর্ম রমজানে অন্যদের ইফতার করানোর ওপর অশেষ গুরুত্ব আরোপ থেকেও তা ফুটে উঠে। পবিত্র রমজান মাসে মৃতদের জন্য ও বিশেষ করে মৃত মা-বাবার জন্য কাঙালি ভোজের আয়োজন আমাদের দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রথা। অনেকেই এই প্রথাকে বেদাআত বা কুপ্রথা বলে এই মহতী অনুষ্ঠানটিকে রমজান মাসের বরকত থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চান। তারা বলেন, যে এটা তো যে কোনো মাসেই করা যায়। তাহলে প্রশ্ন হল, রমজানের মত বরকতময় মাসে এমন কাঙালি ভোজের আয়োজনে অসুবিধাটা কোথায়?
এবারে পড়া যাক অর্থসহ ১৩ তম রোজার দোয়া:
الیوم الثّالث عشر : اَللّـهُمَّ طَهِّرْنی فیهِ مِنَ الدَّنَسِ وَالاَْقْذارِ، وَصَبِّرْنی فیهِ عَلى کائِناتِ الاَْقْدارِ، وَوَفِّقْنی فیهِ لِلتُّقى وَصُحْبَةِ الاَْبْرارِ، بِعَوْنِکَ یا قُرَّةَ عَیْنِ الْمَساکینَ .
হে আল্লাহ ! এদিনে আমাকে কলুষতা ও অপবিত্রতা থেকে পবিত্র কর । যা কিছু তকদীর অনুযায়ী হয় তা মেনে চলার ধৈর্য আমাকে দান কর । তোমার বিশেষ অনুগ্রহে আমাকে তাকওয়া অর্জন এবং সৎ কর্মশীলদের সাহচর্যে থাকার তৌফিক দাও । হে অসহায়দের আশ্রয়দাতা।#