জুন ২২, ২০১৬ ১২:৪৪ Asia/Dhaka

পবিত্র রমজান মাসের প্রাক্কালে এ মাসের রোজার গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) যে ভাষণ দিয়েছিলেন তার আলোকে রমজানে আমরা হলাম মহান আল্লাহর মেহমান। মহান আল্লাহ হলেন আমাদের মেজবান। মহান আল্লাহর আয়োজিত রহমতের এই উৎসবে আমরা কতটা অংশ নিচ্ছি বা এই উৎসবের নানা স্টলে বা প্যাভিলিয়নে কতটা ঢুকতে পেরেছি?

মহান আল্লাহর রহমত সমস্ত সৃষ্টিকুল ও সৃষ্টি জগতের জন্য প্রসারিত রয়েছে। তবে একটি বিশেষ উৎসবে বা ভোজ সভায় আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ব্যাপার। এ উৎসব হল আসলে আমিত্ব, খাদ্য ও পানীয়সহ প্রবৃত্তির নানা চাহিদা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা ত্যাগসহ বিভিন্ন বিষয় ত্যাগের তথা আত্মত্যাগের উৎসব। তাই আমরা নিজেকে এ প্রশ্ন করতে পারি যে, আদৌ এ উৎসবে কী আমরা প্রবেশ করতে পেরেছি? আমরা কী আমাদের আত্মাকে আধ্যাত্মিক কামনা-বাসনাসহ নানা ধরনের কামনা-বাসনার দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে পেরেছি? বলা হয় যে যৌবনে নিজেকে সংশোধন করতে পারে না, সে আর কখনও নিজেকে বিশুদ্ধ করতে পারে না। যৌবন পেরিয়ে মানুষ যখন বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে তখন সাধারণত তার লোভ-লালসা ও না-পাওয়ার অতৃপ্তি বাড়তেই থাকে। আর এইসব বিষয় মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

কামনা-বাসনাগুলো দুই ধরনের। এক ধরনের বাসনা হচ্ছে বাহ্যিক ও জৈবিক। আর দ্বিতীয় ধরনের কামনা-বাসনাগুলো হচ্ছে আত্মিক। এইসব আত্মিক বাসনা খোদার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই সব ধরনের কামনা-বাসনাকে দমনের অনুশীলন জরুরি। বর্তমানে সারা বিশ্বে যত অন্যায়-অবিচার বা দুর্নীতি দেখা যায় এর কারণই হল, মহান আল্লাহর আয়োজিত রহমতের উৎসব বা ভোজসভায় না ঢোকা, কিংবা ঢুকতে পারলেও এই উৎসবকে ব্যবহার করতে না পারা।

সব মানুষকেই রমজানের উৎসবে দাওয়াত দিয়েছেন মহান আল্লাহ। এ উৎসব হচ্ছে ত্যাগের মাস। আর যার মধ্যে বিন্দু পরিমাণ প্রবৃত্তির দাসত্ব-প্রবণতা রয়ে গেছে সে আসলে রমজানের এই উৎসবে প্রবেশ করতে পারেনি, বা প্রবেশ করতে পারলেও সে এই উৎসবকে ব্যবহার করতে পারেনি।

রমজান মাসেও আমরা গিবত, তোহমত, অতি-ভোজন, ভোজন-বিলাস, ঝগড়া-বিবাদ, হিংসা -এসব থেকে দূরে থাকতে পারছি কী? বর্তমান বিশ্বে যত সমস্যা, তা পারিবারিক, ব্যক্তিগত, সামাজিক ও বৈশ্বিক সমস্যা যা-ই হোক না কেন তা হল এই যে আমরা আল্লাহর মেহমান হতে পারিনি।

আমরা অনেক সময় মনে করি যে সঠিক পথে চলার জন্য জ্ঞান অর্জনই যথেষ্ট। কিন্তু তা ঠিক নয়। শিক্ষিত মানুষেরা জেনে শুনেও অনেক ক্ষতিকর কাজ করতে পারেন। যেমন, ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই জ্ঞানটুকু থাকা সত্ত্বেও অনেকেই ধূমপান করে যাচ্ছেন। এভাবে অনেক জ্ঞানই আমাদের কোনো কল্যাণে আসছে না। ধর্মতত্ত্বের ছাত্রদের নৈতিক শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে একটি প্রবাদ রয়েছে যে, জ্ঞানী বা ধর্মপ্রচারক হওয়া খুব কঠিন, কিন্তু মানুষ হওয়া (প্রায়) অসম্ভব।

জ্ঞানপাপীদের তওবা আল্লাহ মৃত্যুর কিছু আগ থেকেই আর ক্ষমা করেন না। কিন্তু অজ্ঞদের তওবা আল্লাহ তাদের জীবনের শেষ মিনিট পর্যন্ত কবুল করে থাকেন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী কোনো আলেমের একটি গুনাহ ক্ষমা হবার আগে একজন অজ্ঞ মানুষের ৭০টি পাপ ক্ষমা করা হবে।

১৫ রমজান বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র বড় নাতি হযরত ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)'র পবিত্র জন্ম-বার্ষিকী। মুসলিম বিশ্বের যোগ্য ইমাম হিসেবে তাঁকে গড়ে তুলেছিলেন স্বয়ং বিশ্বনবী (সা.), আমিরুল মু'মিনিন আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.)। তাঁর জন্ম হয়েছিল মদীনায় হিজরি তৃতীয় সনে ও মুয়াবিয়ার ষড়যন্ত্রে শহীদ হন হিজরি ৫০ সনে। তিনি সমাহিত হন মদীনার জান্নাতুল বাকিতে।

মহানবী (সা.) প্রিয় এই নাতিকে কোলে নিয়ে আদর করা ছাড়াও তাঁর সঙ্গে খেলতেন। একবার তিনি এই নাতির জন্য আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে মুনাজাত করে বলছিলেন: হে আল্লাহ! আমি হাসানকে ভালবাসি, তাই আপনিও তাদের ভালবাসুন যারা হাসানকে ভালবাসে।

মহানবী আরো বলেছেন, যারাই হাসান ও হুসাইনকে ভালবাসে আমিও তাদের ভালোবাসি, আর আমি যাদের ভালোবাসি আল্লাহও তাদের ভালোবাসেন, আর আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন তাদের বেহেশত দান করবেন এবং যারা হাসান ও হুসাইনের সঙ্গে শত্রুতা রাখে তাদেরকে আমিও আমার শত্রু মনে করি, ফলে আল্লাহও তাদের শত্রু হন, আর আল্লাহ তার শত্রুকে জাহান্নামে পাঠাবেন।

মহানবী (সা.) আরো বলেছেন: হাসান ও হুসাইন বেহেশতি যুবকদের সর্দার। এরা দু' জন আমারই সন্তান। তিনি আরো বলেছেন: হাসান ও হুসাইন-দু'জনই মুসলমানদের ইমাম বা নেতা, তা তাঁরা (তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে) বিপ্লব করুক বা নাই করুক (কিংবা ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক)।

সমর্থকদের নিষ্ক্রিয়তা ও আদর্শিক বিচ্যুতিসহ নানা দিক থেকে পরিস্থিতি অত্যন্ত প্রতিকূল থাকায় ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ-বিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ, ইমামের প্রধান সেনাপতিসহ অনেকেই ভেতরে ভেতরে মুয়াবিয়ার কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। এ সময় তিনি মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ অব্যাহত রাখলে ইসলাম পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত এবং সুযোগ-সন্ধানী রোমানরা বায়তুল মোকাদ্দাস দখল করে নিত। এ ছাড়াও এ চুক্তির ফলে মুয়াবিয়ার প্রকৃত চেহারা জনগণের কাছে তুলে ধরা সহজ হয়েছিল।

এবারে পড়া যাক অর্থসহ ১৪ রোজার দোয়া:

الیوم الرّابع عشر : اَللّـهُمَّ لا تُؤاخِذْنی فیهِ بِالْعَثَراتِ، وَاَقِلْنی فیهِ مِنَ الْخَطایا وَالْهَفَواتِ، وَلا تَجْعَلْنی فیهِ غَرَضاً لِلْبَلایا وَالاْفاتِ، بِعِزَّتِکَ یا عِزَّ الْمُسْلِمینَ .

হে আল্লাহ ! এদিনে আমাকে আমার ভ্রান্তির জন্যে জিজ্ঞাসাবাদ করো না । আমার দোষ-ত্রুটিকে হিসেবের মধ্যে ধরো না ।তোমার মর্যাদার উসিলায় আমাকে বিপদ-আপদ ও দুর্যোগের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করো না । হে মুসলমানদের মর্যাদা দানকারী। #