রমজানের উপহার (২১তম পর্ব)
২১ রমজান আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.)'র শাহাদত বার্ষিকী। এ উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি গভীর শোক ও সমবেদনা। আলী (আ.)'র প্রশংসা করে কোনো এক প্রাচীন কবি লিখেছিলেন: “কোথাও তোমার চরিত্র এমন যে, তোমার কোমলতা দেখে মৃদুমন্দ বাতাসও লজ্জা পায় কখনো তোমার দৃঢ়তা পাথরকেও হার মানায়।”
অর্থাৎ তাঁর সাহসিকতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীনতা, শৌর্য আর সংগ্রামী আত্মার সামনে যেন পাথর, শীলা বা ধাতুও গলে যায়। আবার তাঁরই চারিত্রিক কোমলতা মৃদুমন্দ বাতাসকেও লজ্জা দেয়। একই ব্যক্তির মধ্যে কোমলতা ও কঠোরতার এক অপূর্ব সমন্বয়। তুমি কেমন আশ্চর্য সৃষ্টি?
মাওলানা রুমি আলী (আ.)'র দয়া ও মহানুভবতা এবং বীরত্বের তুলনা করে লিখেছেন:
“সাহসিকতায় তুমি শেরে খোদা জানি
পৌরুষত্বে কি তুমি, জানেন শুধুই অন্তর্যামী।”
পূর্ণ মানব ছিলেন বলেই আলী (আ.) ছিলেন সব ধরণের মানবিক মূল্যবোধের ময়দানে বিজয়ী বীর। মানবতার সবগুলো ময়দানেই তিনি শ্রেষ্ঠ। এখান থেকে আমরা এ শিক্ষা নেব যে, ভুল করে শুধু একটি মূল্যবোধকে গ্রহণ করে অন্যান্য মূল্যবোধকে যেন আমরা ভুলে না যাই। যদিও আমরা সবগুলো মূল্যবোধের ক্ষেত্রেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারব না, কিন্তু নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত সব মূল্যবোধই একত্রে ধারণ তো করতে পারি। যদি পূর্ণ মানুষ নাও হই অন্তত ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ তো হতে পারি। আর তাহলেই একজন প্রকৃত মুসলমান হিসেবে সবগুলো ময়দানে আমরা উপস্থিত হতে পারব।
আলী (আ.) মহান প্রভুর ইবাদতের সময় আল্লাহর প্রেমে ভুলে যেতেন অন্য সব কিছু, এমনকি বিদ্ধ তীর খুলে নেয়ার ব্যথাও টের পেতেন না। আবার এই একই আলী নামাজের মধ্যেই দরিদ্রের প্রার্থনা শুনতে পেয়ে হাতের আংটি এগিয়ে দেন! যে খোদাপ্রেমের গভীরতা তাঁকে সবকিছু ভুলিয়ে দেয় সেই খোদাই আলীর কানকে সময়মত দরিদ্রের প্রার্থনা শোনার ক্ষমতা যুগিয়ে দেন। নিজের কাঁধে খাদ্যের বোঝা বহন করে ইয়াতিম আর দরিদ্রদের ঘরে রাতের বেলায় খাদ্য দিয়ে আসতেন যিনি সেই ন্যায় বিচারের প্রতীক আলী (আ.)'র শাহাদতের বহু দিন পর তারা বুঝতে পেরেছিল যে অচেনা সেই মানুষটিই ছিলেন তাদের প্রিয় আমীরুল মু'নিনিন! মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আলী (আ.)'র অনুরাগী ও অনুসারী হওয়ার তৌফিক দিন।
শেষ দশ রাত পবিত্র রমজানের সবচেয়ে বরকতময় রাত। এর মধ্যে বেজোড় সংখ্যার রাতগুলোর যে কোনো রাত হতে পারে কদরের রাত। কেউ কেউ মনে করেন ২৭ তম রাতটিতেই শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। আবার অনেকে মনে করেন রমজানের ২৩ তম রাতটি ১৯ ও ২১ তম রাতের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই তিন রাতই শবে কদর। বর্ণনায় এসেছে পুরো বছরের ভাগ্য তথা আয়ু ও রিজিক নির্ধারিত হয় ১৯রমজানের রাতে। এই বছরে কারা হজে যেতে পারবে তাও ঠিক করা হয় এ রাতে। আর ২১ রমজানের রাতে এ বিষয়গুলোকেই নথিবদ্ধ করা বা স্বীকৃতি দেয়া হয়। আর ২৩ রোজার রাতে এইসব বিষয়কে চূড়ান্ত করা হয়। তাই এই তিন রাতই ইবাদত ও প্রার্থনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এইসব রাতে কুরআন তিলাওয়াত, জামাআতে নামাজ আদায়, সদকা দেয়া, মৃতদের জন্য প্রার্থনা, জিকির এবং বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের রেখে যাওয়া দোয়াগুলো পড়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে মহিমান্বিত রজনী বা কদরের রাতে নাজিল হয়েছে পবিত্র কুরআন। তাই এ রাতে আমাদেরকে শপথ নিতে হবে জীবনকে কুরআনের শিক্ষা ও বিধানের আলোকে গড়ে তোলার। আর সারা বছরেই বাস্তবায়ন করতে হবে এই শপথকে।
বিশ্বনবী (সা.)'র মতে বাবা মায়ের জন্য সন্তানদের দোয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সন্তানদের সার্বিক কল্যাণের জন্য দোয়া করাও বাবা-মায়েদের জন্য সমান মাত্রায় জরুরি। কদরের রাতে এ বিষয়টি মনে রাখা উচিত। দৃঢ় আশাবাদী হয়ে দোয়া করা ও একনিষ্ঠভাবে তওবা করাও কদরের রাতে খুবই জরুরি। এক যুবক মহানবীর (সা.) কাছে এসে বলে: কল্পনা করা যায় এমন সব পাপই আমি করেছি, ক্ষমার কোনো আশা কি আমি করতে পারি? সৃষ্টিকুলের জন্য মহান আল্লাহর রহমতের নবী (সা.) বললেন: তোমার বাবা-মা কী জীবিত? যুবক জানায় মা মৃত, তবে বাবা জীবিত। আল্লাহর রাসুল বললেন, তোমার বাবার সঙ্গে ভালো আচরণ কর ও তাঁর সেবা কর। যুবকটি চলে যাওয়ার পর মহানবী বললেন, এই যুবকের মা যদি বেঁচে থাকত তাহলে তার পাপগুলোকে আরও দ্রুত ক্ষমা করা হত।
হযরত মুসা নবী (আ.) তাঁর জীবিত অবস্থায় আল্লাহর কাছে মুনাজাত করে জানতে পেরেছিলেন যে এক সাধারণ কষাই বেহেশতে তার সঙ্গী হওয়ার গৌরব অর্জন করবে। মুসা (আ.) খোঁজ নিয়ে দেখেন যে ওই যুবক কষাই কোনো বাড়তি ইবাদত-বন্দেগি করে না। তবে সে তার বৃদ্ধা ও অচল হয়ে পড়া মায়ের সেবা করে এমনভাবে যেভাবে বাবা-মা তার শিশুর যত্ন নিয়ে থাকে। ছেলে যখন মায়ের জন্য রান্না করে যত্নভরে তাকে খাইয়ে দেয় তখনই মা দোয়া করতেন তার ছেলেকে যেন আল্লাহ মুসা নবীর সঙ্গী করেন। মুসা (আ.) যুবককে জানান যে তাঁর মায়ের দোয়া কবুল হয়েছে।
এবারে পড়া যাক রমজানের ২১ রোজার দোয়া:
لیوم الحادی والعشرون : اَللّـهُمَّ اجْعَلْ لى فیهِ اِلى مَرْضاتِکَ دَلیلاً، وَلا تَجْعَلْ لِلشَّیْطانِ فیهِ عَلَیَّ سَبیلاً، وَاجْعَلِ الْجَنَّةَ لى مَنْزِلاً وَمَقیلاً، یا قاضِیَ حَوائِجِ الطّالِبینَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে তোমার সন্তুষ্টির দিকে পরিচালিত কর। শয়তানদের আমার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে দিওনা। জান্নাতকে আমার গন্তব্যে পরিণত কর। হে প্রার্থনাকারীদের অভাব মোচনকারী । #