জুন ৩০, ২০১৬ ১২:১৬ Asia/Dhaka
  • রমজানের উপহার (২৩তম পর্ব)

গত পর্বের আলোচনায় আমরা পবিত্র কুরআনের কয়েকটি হৃদয়-নিংড়ানো আয়াতের অর্থ শুনিয়েছিলাম। আজও আমরা এমন কয়েকটি আয়াত তুলে ধরব যা আমীরুল মু'মিনিন আলী (আ.) তাঁর একটি বিখ্যাত দোয়ায় উল্লেখ করতেন। কুফার মসজিদে এই মুনাজাত করতেন ইমাম আলী (আ.)। তিনি বিনীত কণ্ঠে বলতেন:

'হে আল্লাহ! আমি সেই দিনের অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে নিরাপত্তা চাইছি যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততি কোন উপকারে আসবে না; কিন্তু কেবল সে ছাড়া যে সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে।(২৬:৮৮) যেদিন জালেম নিজের হাত দুটি দংশন করতে করতে বলবে, হায় আফসোস! আমি যদি রসূলের পথ অবলম্বন করতাম।(২৫:২৭) যেদিন অপরাধীদের পরিচয় পাওয়া যাবে তাদের চেহারা থেকে; এরপর তাদের কপালের চুল ও পা ধরে টেনে নেয়া হবে। (৫৫:৪১) যেদিন বাবা ছেলের কোন কাজে আসবে না এবং ছেলেও তার বাবার কোনো উপকার করতে পারবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর ওয়াদা সত্য। (৩১:৩৩) যেদিন জালিমদের ওজর-আপত্তি কোন উপকারে আসবে না, তাদের জন্যে থাকবে অভিশাপ এবং তাদের জন্যে থাকবে মন্দ ঘর। (৪০:৫২) যেদিন কেউ কারও কোন উপকার করতে পারবে না এবং সেদিন সব কর্তৃত্ব হবে আল্লাহর। (৮২:১৯) যেদিন পালিয়ে যাবে মানুষ তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মা, বাবা, স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে। (৮০:৩৪)' যেদিন গোনাহগার পন হিসেবে দিতে চাইবে তার সন্তান-সন্ততিকে, স্ত্রীকে, ভাইকে ও তার গোষ্ঠীকে যারা তাকে আশ্রয় দিত এবং এমনকি নিজেকে রক্ষার জন্য পৃথিবীর সবকিছু দিতে চাইবে। কিন্তু না, কখনও নয়। নিশ্চয়ই এটা লেলিহান আগুন যা শরীরের গোশত ও চামড়া ঝলসিয়ে নিঃশেষ করে দেবে৷ (৭০: ১১-১৬)'

কুরআনের এই আয়াতগুলো থেকে আমাদের উচিত শিক্ষা নেয়া। আমাদের ভাবা উচিত আমরা যদি পাপ করে থাকি এবং আল্লাহ যদি আমাদের পাপগুলো ক্ষমা না করেন তাহলে আমাদের কি উপায় হবে? অতীতের পাপগুলো ক্ষমা করা হলো কিনা তা জানার উপায় নেই বলে সব সময়ে আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী হতে হবে এবং সব সময়ই সবিনয়ে ক্ষমা প্রার্থনা অব্যাহত রাখতে হবে। এ ছাড়াও কোনো নতুন পাপে যেন জড়িয়ে না পড়ি সে জন্য মহান আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে।

কদরের রাতগুলোতে পবিত্র কুরআনের সুরা দুখান, সুরা রুম ও সুরা আনকাবুত পড়ার ওপর খুব জোর দেয়া হয়। বিশ্বনবী (সা.) রমজানের শেষ দশ রাতে মোটেই ঘুমাতেন না। বিশেষ করে ২৩ রোজার রাতে নিজ পরিবারের সদস্যদেরকেও জেগে থাকতে বলতেন এবং এ রাতে পরিবারের কেউ ঘুমিয়ে গেলে চোখে পানি দিয়ে তাদের জাগিয়ে দিতেন। হযরত ফাতিমা জাহরা (সা. আ.) তৈরি করতেন হাল্কা খাবার যাতে ঘুম না আসে। রাতে জেগে থাকতে যাতে অসুবিধা না হয় সে জন্য তিনি দিনে ঘুমাতে বলতেন।

রমজানের শেষ শুক্রবার হচ্ছে বিশ্ব কুদস্ দিবস। মুসলমানদের প্রথম কেবলা আলআকসা মসজিদ ও পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস শহরকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের জবরদখল ও পুরো ফিলিস্তিনকে ইসরাইলের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার জন্য বিশ্বব্যাপী গণ-সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনীর আহ্বানে চালু হয়েছে এই দিবস। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর প্রথম চালু হয় এই দিবস। সেই থেকে প্রতি বছর কুদস দিবসের শোভাযাত্রা ও সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ।

ইমাম খোমেনী (র.) বলেছিলেন, কুদস‌্ দিবস হচ্ছে ইসলামের দিবস। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, আরব দেশগুলোর মানুষ যদি এক বালতি করে পানি ঢালত তাহলে ইসরাইল ভেসে যেতো। ইসলামী ঐক্যের জন্য বিশ্ব কুদস্ দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম।

বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে হানাহানি এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির আলোকে বিশ্ব কুদস্ দিবসের গুরুত্ব কয়েক গুণ বেড়ে গেছে বলে মনে করা যায়। কারণ, ইসলামের শত্রুরা মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে গোত্রীয় ও ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করে মুসলমানদেরকে পারস্পরিক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলেছে। ফিলিস্তিন সংকটকে ভুলিয়ে দেয়ার জন্যই এটা করা হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

ইহুদিবাদী ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী ও সন্ত্রাসী তৎপরতার প্রেক্ষাপটে মুসলিম সরকারগুলো ও বিশেষ করে আরব সরকারগুলোর উচিত ছিল ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। কিন্তু তারা তা না করে ইয়েমেন ও বাহরাইনের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য সেখানে দমন-পীড়নের ও ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ইয়েমেনে ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলছে সৌদি বিমান হামলার মাধ্যমে ইসরাইলি স্টাইলের গণহত্যা অভিযান। অন্যদিকে সিরিয়ার বাশার আসাদ সরকার ইসরাইল বিরোধী হওয়ায় এই সরকারকে দমনের জন্য সেখানে পাশ্চাত্য ও তাদের সেবাদাসদের মদদে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে ধর্মান্ধ নানা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে। ধর্মান্ধ ওয়াহাবি-তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সিরিয়ায় ও ইরাকে যেসব অমানবিক হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে তাতে পাশ্চাত্যের জনগণের কাছে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণা চালানোর মোক্ষম সুযোগ পেয়ে গেছে ইসলাম বিরোধী শক্তি এবং তাদের প্রচার মাধ্যম।

বিস্ময়ের ব্যাপার হল ওয়াহাবি-তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো জিহাদের নামে মুসলমানদের হত্যা করলেও ইসরাইলের বিরুদ্ধে টু শব্দটিও করছে না। বরং ইসরাইলের নানা ধরনের সাহায্য পাচ্ছে তারা। তাই ইসরাইলকে দুর্বল করতে হলে এইসব তাকফিরি গোষ্ঠীর গড-ফাদার এবং তাদের আঞ্চলিক সহযোগী সরকারগুলোর বিরুদ্ধেই আন্দোলন ও জনমত গড়ে তোলা জরুরি। বিশ্ব-কুদস্ দিবস এ জন্য একটি উপযুক্ত সুযোগ হতে পারে।

এবারে পড়া যাক ২৩ রোজার দোয়া :

الیوم الثّالث والعشرون : اَللّـهُمَّ اغْسِلْنی فیهِ مِنَ الذُّنُوبِ، وَطَهِّرْنی فیهِ مِنَ الْعُیُوبِ، وَامْتَحِنْ قَلْبی فیهِ بِتَقْوَى الْقُلُوبِ، یا مُقیلَ عَثَراتِ الْمُذْنِبینَ .

হে আল্লাহ ! আমার সকল গুনাহ ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে দাও। আমাকে সব দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র কর। তাকওয়া ও খোদাভীতির মাধ্যমে আমার অন্তরকে সকল পরিক্ষায় উত্তীর্ণ কর। হে অপরাধীদের ভুল-ত্রুটি মার্জনাকারী। #