জুলাই ০৪, ২০১৬ ১২:২৭ Asia/Dhaka

ধৈর্য ও দৃঢ়তা শেখার অন্যতম মাধ্যম হল রোজা। সৎপথে অবিচল থাকা ও সত্য প্রচারে দৃঢ়তা রাখা হচ্ছে মু'মিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে সত্য প্রচার থেকে বিরত রাখার জন্য কাফির ও মুশরিকরা এমন কোনো কাজ নেই যা করেনি।

তারা কখনও মানবজাতির সবচেয়ে বড় এই সুহৃদ ও শিক্ষককে কখনও পাগল, কবি, গণক বা জাদুকর বলেছে। কখনওবা তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছে। কখনওবা প্রলোভন দেখিয়ে বলেছে, কি চাও- রাজত্ব? সবচেয়ে সুন্দরী নারী? না অঢেল ধন-সম্পদ! কিন্তু মহানবী (সা.) অশেষ ধৈর্যশীল ও দৃঢ় থেকে বলেছেন: আমার এক হাতে চাঁদ ও অন্য হাতে যদি সূর্যও এনে দাও তবুও আমি সত্য প্রচারে বিরত হব না।

তায়েফের জনগণের কাছে একত্ববাদ প্রচার করতে গিয়ে বিশ্বনবী (সা.) সেখানকার সর্দারদের লেলিয়ে দেয়া পেটোয়া বাহিনীর ইট-পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়েছেন। কিন্তু তিনি তাদের জন্য বদদোয়া দেননি। যদিও বলা হয় ফেরেশতারা বলেছিল, আপনি যদি ইশারা করেন তাহলে এদের ধ্বংস করে দেয়া হবে। কিন্তু গোটা বিশ্ব জগতের জন্য আল্লাহর রহমত হিসেবে প্রেরিত মহানবী অজ্ঞ তায়েফবাসীর মুক্তি ও সুপথ লাভের জন্য দোয়া করেছেন! তিনি আহত অবস্থায় তায়েফের এক আঙ্গুর বাগানে আশ্রয় নিলে বাগানটির মালিক ক্লান্ত ও আহত এই মুসাফিরকে আঙ্গুর দিয়ে আপ্যায়ন করতে বলেন বাগানের এক কর্মীকে। মহানবী ধন্যবাদ জানিয়ে আঙ্গুর খাওয়ার সময় বললেন: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আল্লাহর নাম শুনে ওই কর্মী বিস্মিত হয়ে বলল, এর অর্থ কী? এমন কথা তো আর কখনও শুনিনি? তিনি বললেন, আমি মহান স্রষ্টা তথা আল্লাহর নাম নিয়েছি যিনি হলেন সবচেয়ে দয়ালু ও করুণাময় দাতা।

মহানবী প্রশ্ন করে জানতে পারেন যে এই শ্রমিক ইরাকের নেইনাভা অঞ্চলের অধিবাসী। রাসূল (সা.) স্মিত হেসে বললেন, আপনি তো তাহলে হযরত ইউনুস নবীর (আ.) এলাকার অধিবাসী। ওই বাগান-কর্মী বলল, আপনি ইউনুস নবীর কথা জানেন কিভাবে? তিনি বললেন, এই নবীর মত আমিও আল্লাহর একজন নবী। আল্লাহই আমাকে তাঁর জীবন সম্পর্কে জানিয়েছেন। এরপর তিনি ইউনুস নবীর জীবনের বেশ কিছু ঘটনা এমনভাবে তুলে ধরলেন যে ওই কর্মীর চোখ বেয়ে ঝরল অশ্রু। সে মহানবীর হাতে চুমো খেয়ে বলল, আমি আপনার ও আপনার আল্লাহর ওপর ঈমান আনলাম। মহানবী (সা.) খুশি হলেন ও তায়েফে এ পর্যন্ত যত কষ্ট ও যন্ত্রণার শিকার হলেন সবই ভুলে গেলেন। এভাবে ধৈর্য ধারণ করায় তিনি আরও এক ব্যক্তিকে ইসলামের পথে আনতে সক্ষম হন।

রমজানের শেষ রাতগুলোতে দোয়া ও ইবাদতের গুরুত্ব অপরিসীম। এইসব রাতই মনের সব কথা আল্লাহর কাছে খুলে বলার শ্রেষ্ঠ সময়: 'হে আল্লাহ! যে তুমি রাত থেকে দিনকে নিয়ে আস ও দিনের ফিরিয়ে আন রাতকে! নিশ্চয়ই আমরা ডুবে আছি অন্ধকারে! তোমার নির্দেশেই সূর্য ভ্রমণ করছে নির্দিষ্ট কক্ষপথে। তুমিই নির্ধারণ করেছ চাঁদের নানা পর্যায় যতক্ষণ না তা পুনরায় বেঁকে যায় পুরনো খেজুর শাখার মত। হে সমস্ত আলোর আলো! হে সব লক্ষ্যের চূড়ান্ত গন্তব্য ও সব কল্যাণের অভিভাবক। হে এক আল্লাহ! হে অনন্য! হে দয়ালু! হে পবিত্র! সবচেয়ে সুন্দর নামগুলো তো তোমারই! সর্বোচ্চ মহত্ত্ব, সব গুণগান ও প্রশংসা সে তো তোমারই! শ্রেষ্ঠত্ব বলতে যা যা আছে সে-সবই তো তোমার! মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের ওপর তোমার অপার রহমত, কল্যাণ ও শান্তি বর্ষণ কর। রমজানের এই রাতগুলোতে আমাদের নাম নথিভুক্ত কর সৌভাগ্যবানদের তালিকায় এবং শামিল কর শহীদদের মিছিলে। আমাদের সৎকর্মগুলোকে স্থান দাও নেককারদের খাতায় ও ক্ষমা কর আমাদের পাপ। আমাদেরকে দাও এমন নিশ্চিত বিশ্বাস যা হৃদয়কে করবে প্রফুল্ল ও দূর করবে সব সন্দেহ! আর যেন আমরা সন্তুষ্ট থাকি তোমার দেয়া বরাদ্দে। আমাদেরকে দাও দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত কল্যাণ। আর রক্ষা কর দোযখের আগুন থেকে।'

'হে আল্লাহ কদরের রাতে যেন তোমাকে স্মরণ করি ও কৃতজ্ঞচিত্ত হই এবং আগ্রহী হই তোমাকে সন্তুষ্ট করতে। আর যেন এ রাতে ক্ষমা চাই তোমার কাছে। এ ছাড়াও সেইসব সাফল্য চাই যা তুমি বরাদ্দ করেছ মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের জন্য। তাঁদের ওপর বর্ষিত হোক তোমার অপার করুণা ও শান্তি।'

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত দোয়াগুলোর পাশাপাশি বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের দোয়াগুলো যেন হয় আমাদের সারা জীবনের পাথেয়। কারণ, মহানবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত হচ্ছেন জীবন্ত ও বাস্তব কুরআন। তাঁরা মহান আল্লাহর শেখানো কথার বাইরে কোনো কথাই নিজ হতে বলতেন না। তাই তাঁরা সঠিক হাদিস বাছাইয়ের মানদণ্ড তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, যদি দেখো যে আমাদের নামে প্রচলিত কোনো কথা পবিত্র কুরআনের বাণীর বিরোধী হয় তাহলে তা দেয়ালে ছুঁড়ে মারবে। মহানবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত খাওয়া-দাওয়ার, উঠা-বসার, ঘুমানোর, গোসলের, ভ্রমণের ও জিহাদের দোয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি বিষয়ের ও এমনকি নখ কাটার দোয়াও রেখে গেছেন মানব জাতির জন্য। প্রকৃত মুসলমানের উচিত এইসব দোয়া শিখে সেসবের মাধ্যমে সব সময়ই আল্লাহর সঙ্গে নৈকট্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা।

এবারে পড়া যাক অর্থসহ ২৭ রোজার দোয়া:

الیوم السّابع والعشرون : اَللّـهُمَّ ارْزُقْنی فیهِ فَضْلَ لَیْلَةِ الْقَدْرِ، وَصَیِّرْ اُمُوری فیهِ مِنَ الْعُسْرِ اِلَى الْیُسْرِ، وَاقْبَلْ مَعاذیری، وَحُطَّ عَنّیِ الذَّنْبَ وَالْوِزْرَ، یا رَؤوفاً بِعِبادِهِ الصّالِحینَ

হে আল্লাহ ! আজকের দিনে আমাকে শবেকদরের ফজিলত দান কর। আমার কাজ কর্মকে কঠিন থেকে সহজের দিকে নিয়ে যাও। আমার অক্ষমতা কবুল কর এবং ক্ষমা করে দাও আমার সব অপরাধ। হে যোগ্য বান্দাদের প্রতি মেহেরবান। #