পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব (পর্ব-১০)
ইরানের গজনির সুলতানদের শাসনামলে ভারতেও তুর্কি গজনভী, ঘুর ও খলজি দাস বংশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। সুলতানি শাসনামলের পর ভারতে মোগলদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সুলতানি যুগ থেকে ব্রিটিশ শাসনের আগ পর্যন্ত তুর্কিরাই ভারত শাসন করেছে। কিন্তু তাদের দরবারের ও রাষ্ট্রের ভাষা ছিল ফার্সি। আর রাষ্ট্রীয় কোনো চাকরি পেতে হলে তাকে অবশ্যই ফার্সি শিখতে হতো।
ভারতের জ্ঞানী-গুণীরা ফার্সি ভাষায় কবিতা ও বই লিখতেন। ফার্সি সাহিত্যের বরেণ্য কবি আমির খসরু দেহলাভির মাতৃভাষা হিন্দি হওয়া সত্ত্বেও তিনি ফার্সি ভাষায় অমর সাহিত্য রচনা করেছেন।
কবি শেখ সাদির যুগে তথা হিজরি সপ্তম শতকে চীনা তুর্কিস্তানের কাশগড় অঞ্চলের জনগণ ফার্সি ভাষা জানতেন। সাদির 'গোলেস্তান' গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়ে এসেছে। কাশগড়ের এক জামে মসজিদে এক যুবক সাদিকে বলেন: সাদির বেশিরভাগ কবিতা বা গজলই ফার্সি ভাষায় হওয়াতে তা আমাদের বুঝতে সুবিধাজনক।
উর্দু বর্তমানে পাকিস্তানের জনগণের রাষ্ট্রভাষা। এই ভাষার শব্দ, ভাবধারা, কবিতার কাঠামো, বাক্যের গঠন, বাগধারা ও কথোপকথন ইত্যাদিতে ফার্সি ভাষার গভীর প্রভাব রয়েছে। সংস্কৃতি ও দ্রাবিড় ভাষা থেকে উদ্ভুত ভারতের নানা ভাষাতেও ফার্সি ভাষার গভীর প্রভাব দেখা যায়। উর্দু ভাষায় ফার্সির প্রভাব এতো গভীর যে উর্দু সাহিত্যে ভারতীয় বীর বা রূপকথার নায়কদের পরিবর্তে রুস্তম ও ইসফান্দিয়ার এবং প্রেম-কাহিনীর ক্ষেত্রে ভারতীয় কাহিনীগুলোর পরিবর্তে লাইলি-মজনু ও শিরিন-ফরহাদের কাহিনী স্থান পেয়েছে। উর্দু সাহিত্যে ভারতীয় নদ-নদীগুলোর পরিবর্তে জিহুন ও সিহুন নদীর নাম ব্যবহারও লক্ষ্যনীয়।
তৈমুরি শাসনামলের লেখক ও কবিরা ফার্সি ও তুর্কি উভয় ভাষাতেই দক্ষ ছিলেন। যেমন, হেরাতের অধিবাসী আমির আলী শির নাওয়ায়ি এই উভয় ভাষাতেই কবিতা লিখেছেন। এশিয়া মাইনর তথা বর্তমান তুরস্ক অঞ্চলে সালজুক শাসনামল থেকেই ফার্সি ভাষা প্রচলিত ছিল। রুম অঞ্চলের তুর্কি সালজুকরা এশিয়া মাইনর দখলের আগেই ইরানের সালজুকদের মতোই ইরানি সংস্কৃতি ও ফার্সি ভাষার অনুরাগী হয়ে পড়ে। তাদের রাষ্ট্র ও সাহিত্যের ভাষা ছিল ফার্সি। এ অঞ্চলের জনগণ অবশ্য তাদের প্রাত্যহিক লেন-দেনের ক্ষেত্রে তুর্কি ভাষাতেই কথা বলত। সালজুক সম্রাটরা তাদের নাম হিসেবে কেইকোবাদ, কেইখসরু ইত্যাদি ব্যবহার করতেন। তারা খুব সাচ্ছন্দ্যে ফার্সি বলতে ও লিখতে পারতেন। ইরান ও রুম অঞ্চলের সালজুকদের আদালতের কোনো রেকর্ড বা সনদ এখন পর্যন্ত তুর্কি ভাষায় আবিস্কৃত হয়নি।
ষষ্ঠ হিজরির ইরানি কবি জালালউদ্দিন রুমি তার জন্মভূমি বালখ থেকে কুনিয়ায় চলে যান। কুনিয়া ছিল (বর্তমানে তুরস্কে) রুমের সালজুকদের রাজধানী। এখানে ফার্সি ভাষা ও ইরানি সংস্কৃতি ছিল বহুল প্রচলিত। এ শহরটি বালখ থেকে বহু দূরে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও সেখানকার পরিবেশ মৌলানা রুমির কাছে মোটেই অপরিচিত বা নতুন বলে মনে হয়নি। তাই মাতৃভাষা তথা ফার্সি ভাষায় দক্ষ রুমি এই ভাষাতেই কবিতা লিখেছেন যাতে এ অঞ্চলের সবাই তার লেখা বুঝতে পারেন।
তুরস্কের ওসমানিয় শাসকরা ছিল ইরানি তুর্কি সালজুকদেরই একটি শাখার বংশধর। তাদের ওপর ফার্সির প্রভাব সাফাভি সম্রাটদের সমান বা তার চেয়েও বেশি ছিল। ওসমানি সুলতানরা ফার্সি সাহিত্য ও কবিতার গভীর অনুরাগী ছিলেন। তারা ইরানিদের মতোই হাফিজের কবিতাকে ভবিষ্যদ্বাণীর মাধ্যম বা ফাল হিসেবে ব্যবহার করতেন। আর তাদের মনোবাসনা পূর্ণ হলে হাফিজ শিরাজির কবরে উপহার পাঠাতেন। সর্বশেষ তুর্কি সুলতান আবদুল হামিদ হাফিজের কবিতাকে ফাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। হাফিজের কবিতায় ইউসুফিয়া মসজিদে নামাজ পড়তে যেতে নিষেধসূচক পংক্তি থাকায় তিনি ওই মসজিদে নিজে না গিয়ে তার ঘোড়ার গাড়ি পাঠিয়েছিলেন।
আর পথেই ওই গাড়ি বিস্ফোরিত হয়। এরপর তিনি হাফিজ শিরাজির কবরে মূল্যবান কিছু উপহার পাঠিয়েছিলেন।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি মনে করতেন ইরানি সংস্কৃতি ও ফার্সি ভাষায় শতভাগ প্রভাবিত তুর্কি ওসমানিয় সুলতান সেলিম যখন ইউরোপের প্রায় অর্ধেক দখল করেছিলেন তখন ইরানি সভ্যতা ইউরোপের অর্ধেক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আর সুলতান সেলিম যখন মিশর ও কায়রো দখল করেন তখন কার্যত ইরানি সভ্যতাই আরব সভ্যতাকে দখল করে বসে। কারণ, কায়রোর পতন ছিল ক্রুসেডের যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) পতনের মতই গুরুত্বপূর্ণ। টয়েনবির মতে, ইরানের (তুর্কি শাসক) শাহ ইসমাইল সাফাভি ও সুলতান সেলিম ওসমানি- এ দু'জনই ছিলেন অভিন্ন ইরানি সংস্কৃতির সন্তান। সুলতান সেলিম তুর্কিভাষী হওয়া সত্ত্বেও ফার্সিতে কবিতা লিখতেন এবং তার দরবারেও ফার্সি ভাষা চালু ছিল।
তুর্কি ওসমানিয় সুলতান বায়েজিদ ইরানি জ্ঞানী-গুণী এবং কবি ও আলেমদের খুব যত্ন নিতেন। এইসব ইরানি মনীষীদের মধ্যে কবি জামি, মাওলানা সাইফুদ্দিন আহমাদ ও ইরানি ঐতিহাসিক মির জামালউদ্দিন ছিলেন অন্যতম। বায়োজিদ তাদেরকে মাসিক অর্থ বা সম্মানি ও উপহার দিতেন। কনস্টান্টিনোপল জয়ের পর ওসমানি তুর্কি সুলতান ফার্সি কবি মুহাম্মাদ খক্বানির গজল আবৃত্তি করেছিলেন। ওসমানিয় দরবারের কবিরা বড় বড় ফার্সি কবির অনুসরণ করতেন। যেমন, ওসমানি রাজপুত্র মাহমুদের রাজসভার কবি বেহেশতি ইরানি কবি নিজামির পঞ্চ-কাব্য বা 'খামসার' অনুসরণ করে একটি কবিতা লিখেছেন। ওসমানি তুর্কি সুলতান সুলায়মানের রাজসভার এক কবি ইরানের মহাকবি ফেরদৌসির কাব্যরীতির অনুসরণ করে গদ্য ও পদ্যের মিশ্রনে এই সুলতানের শাসনামলের ইতিহাস লিখেছেন।
তুরস্কের ফার্সিভাষী নাগরিকরাই ওসমানি শাসনামলে নতুন তুর্কি গদ্য ও পদ্য-রীতি চালু করেন। তুর্কিরা কেবল তাদের চিন্তাভাবনা নয়, একইসঙ্গে এইসব ভাবনা শৈল্পিক প্রকাশ-রীতিও ধার করেছেন ফার্সি সাহিত্য থেকে। চিন্তাভাবনা ও বিষয়বস্তু বাছাই করা ও তা নতুন রূপে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তাদের ওপর ফার্সি সাহিত্যের প্রভাব ছিল বেশ গভীর।
তুর্কি ভাষায় সর্বপ্রথম যিনি কবিতা লিখেছেন তিনি হলেন মৌলানা রুমির পুত্র বাহাউদ্দিন। তিনি ফার্সি ভাষায় একটি কাব্য লিখেছিলেন যার নাম ছিল 'রুবানামে'। মসনভী বা দ্বিপদী ছন্দে রচিত এই কাব্যে তিনি ১৫৬টি তুর্কি বয়াতও যুক্ত করেন। আর এভাবেই তুর্কি কাব্য সাহিত্যের গোড়াপত্তন ঘটে। তুর্কি সাহিত্যের ওপর খ্রিস্টিয় পঞ্চদশ শতক থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত ইরানি কবি জামি ও আমির আলীশির নাওয়ায়ির গভীর প্রভাব দেখা গেছে। ইরানি কবি ইস্ফাহানি ও শওকতও তুর্কি কবিতার ওপর বেশ প্রভাব রেখেছেন।
তুর্কি ভাষায় প্রথমবারের মতো যারা কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন তারা ফার্সিও জানতেন এবং ফার্সি ভাষাও কবিতা লিখতেন। এদেরকে কবি ইমাদউদ্দিন নাসিমির সঙ্গে তুলনা করা যায় যিনি আরবি ও ফার্সিতে কবিতা লিখলেও তার মূল কাব্যটি লিখেছেন তুর্কি ভাষায়।#
পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আশরাফুর রহমান/১৫