২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
https://parstoday.ir/bn/news/event-i160256-২০২৬_২৭_অর্থবছরের_বাজেট_নিয়ে_রাজনৈতিক_ও_অর্থনৈতিক_মহলে_মিশ্র_প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট উত্থাপন করেছেন তা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেটকে একদিকে যেমন ‘উচ্চাভিলাষী ও অবাস্তব ভিত্তির’ ওপর দাঁড়ানো বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, অন্যদিকে একে ‘অর্থনীতি চাঙা করার ইতিবাচক উদ্দীপক’ হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।
(last modified 2026-06-12T11:49:29+00:00 )
জুন ১২, ২০২৬ ১৬:৩১ Asia/Dhaka
  • প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার
    প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার

বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট উত্থাপন করেছেন তা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেটকে একদিকে যেমন ‘উচ্চাভিলাষী ও অবাস্তব ভিত্তির’ ওপর দাঁড়ানো বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, অন্যদিকে একে ‘অর্থনীতি চাঙা করার ইতিবাচক উদ্দীপক’ হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।

বাজেট পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), গবেষণা সংস্থা সিপিডি এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা তাঁদের ভিন্নধর্মী মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন।

বাজেট বাস্তবায়নে জামায়াতের তিন বড় বাধা

আজ (শুক্রবার) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান তিনটি প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করেছেন:

১. জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান ব্যয়: বিগত তিন মাসে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন ও বাস্তবায়ন ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে।

২. লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি: বর্তমান বাজারের লাগামহীন মূল্যস্ফীতি সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে।

৩. ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

জামায়াতের মতে, এই তিন সংকটের কারণে সরকারের পক্ষে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং বাজেট বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হবে।

বাজেটে অর্থনৈতিক সংস্কার হবে না: নাহিদ ইসলাম

বিএনপি সরকারের ঘোষিত নতুন বাজেটে (প্রস্তাবিত) দেশের অর্থনৈতিক কোনো সংস্কার হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ৬ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যা মূলত বাস্তবতাবিবর্জিত। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনোই এত রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান যে কর বা রাজস্ব আদায়ের কাঠামো রয়েছে, তার মধ্য দিয়ে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে: এবি পার্টি

জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে গভীর সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা এই বাজেটে নেই। বরং প্রস্তাবিত বাজেট অর্থনীতির বিদ্যমান দুর্বলতা দূর করার পরিবর্তে নতুন ঝুঁকি ও সংকট সৃষ্টি করবে।এই ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।

তাঁরা বলেন, প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি নিয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, তা বাস্তবতার চেয়ে কাগুজে উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন বেশি। সরকারের এই বাজেট মূলত জনগণকে পরিসংখ্যানের মোড়কে বিভ্রান্ত করার একটি প্রচেষ্টা। জনগণের প্রকৃত চাহিদা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে একটি গতানুগতিক ও ঋণনির্ভর বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে।

সামষ্টিক লক্ষ্যমাত্রার ‘ভিত্তি’ নিয়ে সিপিডির তীব্র সমালোচনা

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাবিত বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার মূল ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।

ত্রুটিপূর্ণ ভিত্তি বছর: সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকৃত অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে আড়াল বা অতিমূল্যায়ন করে নতুন বাজেটের প্রাক্কলন (বিনিয়োগ, রপ্তানি, আমদানি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি) করা হয়েছে। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো স্বীকার করে বাস্তবসম্মত ভিত্তি ঠিক করতে নতুন সরকার ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে বাজেটের শৃঙ্খলা নষ্ট হতে পারে।

দরিদ্রদের ওপর করের বোঝা: সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে মাত্র ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার সমালোচনা করেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে এই সামান্য বৃদ্ধি নিম্ন আয়ের মানুষকে কোনো স্বস্তি দেবে না। তবে আগামী ৫ বছরের জন্য করকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি পথরেখা (যেমন: ২০৩০-৩১ সালে করমুক্ত সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা করা) এবং করপোরেট কর অপরিবর্তিত রাখার পূর্বাভাসকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সিপিডি।

কালোটাকা সাদা করার নৈতিক স্খলন: আবাসন খাতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ বহাল রাখায় সিপিডি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। মোস্তাফিজুর রহমান ও ফাহমিদা খাতুন উভয়েই উল্লেখ করেন, এটি সৎ করদাতাদের প্রতি চরম বৈষম্য এবং সমাজে নৈতিক স্খলনের ঝুঁকি তৈরি করে। দুর্নীতিবাজদের সুবিধা দেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা যাবে।

অর্থনীতিবিদদের দ্বিমুখী মূল্যায়ন: সংশয় বনাম আশার আলো

বাজেটের সার্বিক দিক নিয়ে দেশের দুই শীর্ষ অর্থনীতিবিদ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি মত প্রকাশ করেছেন।

বাজেট উচ্চাভিলাষী এবং লক্ষ্যমাত্রা অসম্ভব আহসান এইচ মনসুর

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বাজেটকে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী আখ্যা দিয়ে বলেন, ব্যাংকিং খাতের সংকট (বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকসহ কিছু প্রতিষ্ঠানের সমস্যা) এবং সরকারি ঋণপ্রবাহ প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছানো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলবে। যেখানে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৪.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, সেখানে বিনিয়োগের লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব।

চলতি অর্থবছরের বিশাল ঘাটতির পর নতুন বছরে আরও ২ লাখ ১ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে তিনি ‘অসম্ভব টার্গেট’ বলেছেন। পাশাপাশি আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

বাজেট জনবান্ধব ও অর্থনীতি চাঙা করার উদ্দীপক আবু আহমেদ

ভিন্ন সুর টেনে অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ এই বাজেটকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, পরিচালন ব্যয় মোট আয়ের ৭২% থেকে কমিয়ে ৬৬-৬৮ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা সফল হলে উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়বে এবং ঘাটতি বাজেটের ওপর নির্ভরতা কমবে। বন্ড ও ইসলামিক সুকুকের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করবে। মোবাইল সিমের ওপর নির্দিষ্ট কর প্রত্যাহার, কর অবকাশ ও কর ছাড়ের মতো উদ্যোগগুলো বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে এবং আগামী ৬ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যে অর্থনীতি আবার গতি ফিরে পাবে বলে তিনি আশাবাদী।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সামগ্রিক মূল্যায়ন থেকে এটি স্পষ্ট যে, নতুন সরকারের এই বাজেট অর্থনৈতিক মন্দা কাটানোর কিছু ভালো রূপরেখা ধারণ করলেও, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রার কারণে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এক বড় ধরনের অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হবে।#

পার্সটুডে/এমএআর/১২