সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৬ ১১:০৭ Asia/Dhaka

প্রাচীনকালে বিস্তীর্ণ এক প্রান্তরে পাশাপাশি চলছিল তিনটি প্রাণী। একটি উট, একটি গরু এবং একটি বুনো ভেড়া। চলতে চলতে তারা তাদের ফেলে আসা শৈশব কৈশোর এবং যৌবন নিয়ে কথা বলছিল। সেইসাথে নিজেদের জীবনের সুখকর এবং হাসির বিভিন্ন স্মৃতির কথা বলাবলি করছিল।

সময়টা ছিল বসন্তকাল। আবহাওয়াও ছিল উপভোগ্য। খোশ আলাপ করতে করতে পুরনো তিন বন্ধু গিয়ে পৌঁছল এমন এক জায়গায় যেখানে খুব মজার এবং সুস্বাদু ঘাস উদ্ভিদ ছিল। এরকম ঘাস কিংবা উদ্ভিদ সাধারণত ওই মরুতে খুব কমই দেখতে পাওয়া যেত। স্বাভাবিকভাবেই তিন বন্ধুই খুশি হয়ে গেল বিরল স্বাদের ওই উদ্ভিদ দেখে। উট বলল: ‘আমরা এই উদ্ভিদগুলোকে সমান তিন ভাগে ভাগ করে নিয়ে যে যার অংশ খাব’।

ভেড়া একবার ভালো করে উদ্ভিদগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখল পরিমাণে খুবই কম। হাত দিয়ে সেগুলোকে একবার নেড়েচেড়ে দেখে বলল: "এই সামান্য ঘাস যদি ভাগ করতে যাই প্রত্যেকের ভাগেই খুব কম পরিমাণে পড়বে, কারও পেটই ভরবে না।"

গরু বলল: ঠিকই বলেছ কিন্তু কী করা যাবে? এই সুস্বাদু ঘাস যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ থাকত তাহলে খুবই ভালো হতো। কিন্তু নাই যেহেতু, সেহেতু ভাগ না করে উপায় কী?

গরুর কথা শুনে ভেড়া বলল: কেন, উপায় আছে। আমি একটা চিন্তা করেছি।

উট এবং গরু বাক হয়ে জানতে চাইল: কী ভেবেছ?

একবার উদ্ভিদের দিকে আরেকবার তার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে ভেড়া বলল: উপায় হলো- আমাদের তিনজনের যে কোনো একজন সবগুলো উদ্ভিদ খাবে। সেই প্রাচীনকাল থেকেই একটা প্রবাদ সবাই শুনে এসেছি আমরা। সেটা হলো 'মুরব্বিদের সম্মান করা ওয়াজিব'। যারা ছোট তাদের উচিত বড়দের জন্য নিজেদের ছোটখাট অধিকার ত্যাগ করা।

উট এ কথা শুনে বলল: আইডিয়াটা মন্দ না। কিন্তু আমরা কী করে জানব যে আমাদের তিনজনের মাঝে কে বেশি বয়স্ক?

ভেড়া বলল: প্রথম প্রস্তাব যদি সবাই মেনে নিই তাহলে আমরা সবাই নিজ নিজ জন্মতারিখ ঘোষণা করতে পারি। তাহলেই বোঝা যাবে বয়সে কে বেশি বড়। যে-ই বয়োবৃদ্ধ হিসেবে সাব্যস্ত হবে সেই খাবে এই ঘাসগুলো।

উট এবং গরু ভেড়ার কথা মেনে নিল। উট বলল: চিন্তাটা বেশ ভালো। এবার আমরা আমাদের নিজ নিজ বয়স নিয়ে কথা বলতে পারি। তারা প্রথমেই ভেড়াকে বলল তার বয়স নিয়ে কথা বলতে।

ভেড়া একটু ভারিক্কি ভাব দেখিয়ে গোঁ গোঁ করে কিছুটা অহংকারের স্বরে বলল: আমার বয়স হযরত ইসমাইল (আ.) এর কুরবানির সময় থেকে হিসাব কর।

উট আর গরু অবাক দৃষ্টিতে ভেড়ার দিকে তাকাল। গরু বলল:  তার মানে তোর বয়স এত বেশি?

ভেড়া গর্বের সাথে বলল: "হ্যাঁ, যে কোনো ভেড়াকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবে। আমি আমার ছোটবেলায় যে চারণভূমিতে ঘুরে বেড়াতাম সেই চারণভূমিতে ইসমাইল (আ.) এর পরিবর্তে কুরবানী করা ভেড়াটিও আমার সাথে চরে বেড়াত। ও আমার বন্ধু ছিল, খুব ভালো বন্ধু। সেই ভেড়াটি আমাদের গোত্রেরই ছিল।"

উট এবং গরু ভেড়ার কথা শুনে ঢোক গিলল। গরু বলল: " ঠিকাছে, আমি এখন বলছি আমরা বয়সের কথা। দেখি কার বয়স বেশি-তোর বয়স না আমার?"

ভেড়া গরুর দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ পর বলল: "বেশ ভালো কথা। ঠিক আছে বলো দেখি, তোমার বয়স কত? কবে জন্ম হয়েছে তোমার?"

গরু বলল:"আমি ভেড়ার চেয়ে অনেক বেশি বয়স্ক। মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.) এর দুটি গরু ছিল। ওই দুটি গরু দিয়ে তিনি জমি চাষ করতেন। তাদেরই একটি হলাম আমি।"

ভেড়া এবার বুঝতে পারল গরু তো তার চেয়েও বেশি চালাক। মনে মনে বলল: "ভুল হয়ে গেছে। আমি যদি সবার আগে বয়স বলতে রাজি না হতাম তাহলেই ভালো ছিল। ফাঁদে পড়ে গেলাম। এখন তো কোনোরকম প্রতিবাদও করা যাবে না। এখন যদি বলি যে গরু মিথ্যা বলছে, তাহলে তো আমার মিথ্যাচারও ধরা পড়ে যাবে।"

গরু দেখল উট এবং ভেড়া অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। গবগব করে বলল: হ্যাঁ! বয়সটা আমার বেশীই। এতই বেশি যে তোমরা গুণেও শেষ করতে পারবে না। বলতেও পারবে না কত বয়স আমার।

উট এবার মনে মনে বলল: হায় রে দুষ্টু গরু! হায় রে ভেড়া! তোমরা আমার সামনে তোমাদের বয়সের কথা বলছ? এমন কাজ করব যে সারাজীবন মনে থাকবে আমাদের তিনজনের মাঝে কার বয়স বেশি?

এই বলে উট একটা মজার হাসি দিল এবং ঘাসগুলো খেতে শুরু করে দিল। বিরল এই উদ্ভিদগুলো খুবই সুস্বাদু ছিল। উদ্ভিদগুলো সব খেয়ে উট- গরু এবং ভেড়ার দিকে তাকিয়ে বলল: আমি তোমাদেরকে বলতে চাই না যে আমার বয়স কত কিংবা তোমাদের চেয়ে আমার বয়স কত বেশি। আমার শরীরের দিকে কিংবা আমার ঘাড়ের দিকে যদি কেউ ভালোভাবে একটু দৃষ্টি দেয় তাহলেই সে বুঝতে পারবে আমি বয়সে তোমাদের চেয়ে কত বড়। আমার জন্ম কবে কোথায় হয়েছে সে কথা বলার অপেক্ষাই রাখে না। আমাকে যে-ই দেখবে সে-ই বুঝতে পারবে যে আমি অন্তত তোমাদের চেয়ে ছোট নই-কী বলো!

গরু আর ভেড়া বিস্ময়ের সাথে উটের দিকে তাকিয়ে অনুতাপ বোধ করল। অনুতাপ এইজন্য যে তারা দুজনই নিজেদের বয়স সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা দিয়েছিল। সেই মিথ্যাচারের জন্যই তারা এখন অনুতপ্ত।

বন্ধুরা, গল্পটি শুনলে আশা করি ভালো লেগেছে। এ গল্প থেকে আমরা দুটি শিক্ষা নিতে পারি।

১. নিজেকে বড় ও শ্রেষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরার জন্য কখনই মিথ্যার আশ্রয় নেয়া উচিত নয়।

এবং ২. নিজের অতীত খারাপ কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া ভালো ও পছন্দনীয় কাজ।  

উট

উট সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য

পৃথিবীতে বর্তমানে উটের সংখ্যা ১৯ মিলিয়ন তথা ১ কোটি ৯০ লাখের মত। উট বিভিন্ন প্রজাতির হয়ে থাকে। কাল-লাল মিশ্রিত বর্ণের উটকে ‘মাহাজীন’ বলা হয়। এ প্রজাতির একেকটি উটের ওজন ৫০০ থেকে ৮০০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এ ছাড়া রয়েছে- ‘মাঘাথির’ বা সাদা উট, ‘সুপুর’ বা হলুদ বর্ণের উট, ‘জুরক’ বা নীল বর্ণের উট, ‘হুমুর’ বা লাল বর্ণের উট, সাহিলিয়া বা উপকূলীয় উট। ‘হিজন’ নামের আরেক প্রকার উট আছে যা সৌদি আরব ছাড়া উপসাগরীয় অন্যান্য আরব দেশে প্রতিপালন করা হয় এবং তা দৌড় প্রতিযোগিতায় ব্যবহৃত হয়।

উট অত্যন্ত সুচতুর কিন্তু শান্ত প্রাণী। উত্তেজিত না করলে সে কখনো কাউকে লাথি বা কামড় দেয় না। দীর্ঘ সময় চারণ ভূমিতে চরার পর নিজে নিজে আবার তাঁবুতে ফিরে আসে।

বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে- মরুভূমির উপর দিয়ে যাওয়ার সময় উট একনাগাড়ে ১৭ দিন পর্যন্ত পানি না খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু এই তপ্ত রৌদ্রের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের কুঁজ ধীরে ধীরে ছোট হতে থাকে পেতে থাকে। এ কারণেই অনেকেই ধারণা করেন যে,  উট তাদের কুঁজে পানি জমিয়ে রাখে। কিন্তু এ ধারণাটি একেবারেই ভুল। কারণ তারা কুঁজে পানি সংরক্ষণ করে না। তারা তাদের লাল রক্ত কোষে পানি সংরক্ষণ করতে পারে। এই কারণেই উট পানি ছাড়া এতো দিন বাঁচতে পারে।  

মরু পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর জন্য উটের রয়েছে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য। উট তার উপরের নরম ফাটা ঠোঁট ও নিচের ঝুলন্ত রাবারের মত ঠোঁটের সাহায্যে সহজেই ছোট ছোট ঘাসও মুখে পুরতে পারে।  মুখের ভেতরে মাড়ি ও জিহবা এমনভাবে তৈরি যে কারণে খসখসে ও কাঁটা জাতীয় খাবার খেতেও উটের কোনো অসুবিধায় হয় না।  

উটের চোখগুলো চওড়া কিন্তু দীর্ঘ পাতায় প্রায় আবৃত থাকে বলে মরুভূমির ধূলোবালি থেকে সুরক্ষিত থাকে। উটের ৫৫ সে.মি দীর্ঘ গলা উটকে উপরের খাদ্যবস্তু খেতে সাহায্য করে। এর কূঁজ হচ্ছে মূলত স্নেহ জাতীয় খাদ্যের ভাণ্ডার। খাদ্য যখন অপর্যাপ্ত হয় বা খাদ্যের অভাব হলে উট সেখান থেকে খাদ্যাভাব মেটায়। #

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৩০