জানুয়ারি ০৮, ২০১৭ ১৩:৫৯ Asia/Dhaka

২২৭ আয়াতবিশিষ্ট সূরা শুআরার নামকরণ করা হয়েছে এর শেষ দিকের কয়েকটি আয়াতকে কেন্দ্র করে। এসব আয়াতে সমাজে ‘শায়ের’ বা কবিদের ভূমিকা নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। শুআরা হচ্ছে শায়েরের বহুবচন।

طسم (1) تِلْكَ آَيَاتُ الْكِتَابِ الْمُبِينِ (2) لَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَفْسَكَ أَلَّا يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ (3 )

 “তোয়া-সিন-মিম” (২৬:১)
“এগুলো স্পষ্ট গ্রন্থের আয়াত” (২৬:২)
“(মুশরিকরা) ঈমান আনছে না বলে মনোকষ্টে হয়তো তুমি জীবন দিয়ে দিতে চাইবে?” (২৬:৩)

পবিত্র কুরআনের যে ২৯টি সূরা মুকাত্তাআত হরফ বা অক্ষর দিয়ে শুরু হয়েছে সূরা শুয়ারা তার একটি। পবিত্র কুরআনের রহস্য হচ্ছে এই হরফগুলো। একইসঙ্গে এসব হরফ একথা প্রমাণ করে যে, মহান আল্লাহর মু’জিযা হিসেবে পরিচিত এই গ্রন্থ এ ধরনের সাধারণ আরবি হরফের সমন্বয়ে প্রণিত হয়েছে। অথচ এই মহাগ্রন্থের একটি আয়াতের সমকক্ষ আয়াত তৈরি করা আজ পর্যন্ত কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়নি এবং কোনোদিন সম্ভবও হবে না।

পরবর্তী আয়াতে পবিত্র কুরআনকে আলোকিত গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই কিতাব সুস্পষ্টভাবে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নিরূপন করেছে এবং এ বিষয়টিকে পবিত্র কুরআনের মহত্ত্ব ও অলৌকিকত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তৃতীয় আয়াতে মানুষকে সঠিকপথে হিদায়াত করতে গিয়ে মহানবী (সা.) কতখানি কষ্ট পেতেন সেদিকে উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য মানুষকে সঠিকপথে আনার জন্য নিবেদিতপ্রাণ বিশ্বনবী কাফের ও মুশরিকদের অপবাদ, হুমকি ও কুৎসা রটনা সত্ত্বেও তাদেরকে ঈমানের পথে দাওয়াত দেয়া বন্ধ করেননি। বিশ্বনবী (সা.) যখন দেখতেন তারা ঈমান আনছে না তখন মনোকষ্টে তার প্রাণ চলে যাওয়ার মতো অবস্থা হতো।

এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১.  পবিত্র কুরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ধারণ। যেকোনো বিষয়ে সঠিক পথের দিশা পেতে চাইলে কুরআনুল কারিমের কাছে ধর্ণা দিতে হবে।
২. মানুষকে সঠিক পথে আনার জন্য নবী-রাসূলরা কঠোর পরিশ্রম করেছেন। এমনকি তাঁরা দাওয়াতের কাজে নিজেদের জীবন বিপণ্ন করেছেন।
৩. মানুষের অন্তর যদি সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত না হয় তাহলে সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব ও শ্রেষ্ঠ পথ-প্রদর্শকও তাকে হিদায়াত করতে পারবে না।

এই সূরার ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

إِنْ نَشَأْ نُنَزِّلْ عَلَيْهِمْ مِنَ السَّمَاءِ آَيَةً فَظَلَّتْ أَعْنَاقُهُمْ لَهَا خَاضِعِينَ (4) 

"আমি ইচ্ছা করলে আকাশ থেকে ওদের কাছে এক নিদর্শন পাঠাতে পারি যাতে ওরা তার প্রতি নত হয়ে পড়ে।” (২৬:৪)

আগের আয়াতে বলা হয়েছে, মহানবী (সা.) সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো সত্ত্বেও মানুষ ঈমান আনছিল না। তার ধারাবাহিকতায় এ আয়াতে বলা হচ্ছে, তারা যেন না ভাবে যে, কুফরির মাধ্যমে তারা মহান আল্লাহর এ সৃষ্টজগতের আওতা থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে। তবে আল্লাহ কাউকে ঈমান আনতে বাধ্য করতে চান না বরং তিনি চান মানুষ স্বেচ্ছায় তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করুক। মহান আল্লাহ চাইলে আতঙ্ক ও ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে সবাইকে ঈমান আনতে বাধ্য করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। 

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. ঈমান গ্রহণ হতে হবে স্বেচ্ছায়; বাধ্যতামূলকভাবে নয়। সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ যখন মানুষকে ঈমান আনতে বাধ্য করেননি তখন কোনো মানুষেরও উচিত নয় ভয়-ভীতি বা আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে কাউকে ঈমান আনতে বাধ্য করা।
২. আজ যারা আল্লাহর সামনে মাথানত করছে না তারা কিয়ামতের দিন এ কাজে বাধ্য হবে, কিন্তু সেদিন এ অবনত মস্তক তাদের কোনো কাজে আসবে না।

সূরা শুয়ারার  ৫ ও ৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

  وَمَا يَأْتِيهِمْ مِنْ ذِكْرٍ مِنَ الرَّحْمَنِ مُحْدَثٍ إِلَّا كَانُوا عَنْهُ مُعْرِضِينَ (5) فَقَدْ كَذَّبُوا فَسَيَأْتِيهِمْ أَنْبَاءُ مَا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ (6) 

“যখনই ওদের কাছে দয়াময়ের কোনো নতুন উপদেশ আসে তখনই ওরা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।” (২৬:৫)

“ওরা তো (আল্লাহর আয়াত) প্রত্যাখ্যান করেছে, সুতরাং ওরা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতো তার যথার্থতা অচিরেই জানতে পারবে।” (২৬:৬)

এ দুই আয়াতে বিশ্বনবী (সা.)-এর সঙ্গে মক্কার কাফিরদের অশোভন আচরণের বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে, কাফিরদের সঠিক পথে হিদায়াত করার জন্য যখনই রাসূলের কাছে নতুন কোনো আয়াত নাজিল হতো তখনই তারা তা প্রত্যাখ্যান করত। এমনকি তারা এসব আয়াত শুনতেই চাইত না। অথচ এসব আয়াত এমন এক দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে যার রহমত বা দয়ার ছায়াতলে রয়েছে গোটা বিশ্ব ও তার সব মানুষ। 

আল্লাহর পক্ষ থেকে তার রহমতের যত সুন্দর সুন্দর বাণীই আসুক না কেনো তা উগ্র ও গোঁড়া মুশরিকদের মনে কোনো প্রভাব ফেলত না। তারা অন্ধকার যুগের কুসংস্কারাচ্ছন্ন পথে চলা অব্যাহত রেখেছিল। উল্টো তার আল্লাহ ও তার রাসূলের বাণী নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করত। বিশ্বনবী (সা.) যখন কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের কথা বলতেন তখন তারা উপহাস করে বলত, এগুলো কল্পনাপ্রসূত কথা ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু মহান আল্লাহ এ আয়াতে বলেছেন, সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন তারা তাদের কর্মফল দেখতে পাবে এবং নিজেদের অস্তিত্ব দিয়ে আল্লাহর প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন উপলব্ধি করবে।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. মানুষ ধীরে ধীরে একটু একটু করে ভ্রান্ত পথের দিকে ধাবিত হয়। প্রথমে সত্যের বাণী  উপেক্ষা করে, এরপর তা অস্বীকার করে এবং সবশেষে আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও ঈমানদারদের উপহাস করে।
২. পবিত্র কুরআনের বাণী এসেছে মানুষকে সতর্ক করতে। তবে এ সতর্কবাণী তাদের অন্তরেই প্রভাব ফেলে যারা তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত। গোঁড়া ও একগুয়ে লোকদের অন্তঃকরণে কুরআনের বাণী পৌঁছায় না।
৩. অস্বীকার করার চেয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা বেশি ভয়ানক। যারা মহান আল্লাহ ও তাঁর সত্যবাণীকে উপহাস করবে তারা একদিন তার প্রতিফল পাবে। আল্লাহ তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেবেন।#