জানুয়ারি ০৯, ২০১৭ ১৪:১৬ Asia/Dhaka

এ পর্বে সূরা শুআরার ২১ থেকে ২৬ নম্বর আয়াতের তরজমা ও তাফসির উপস্থাপনা করা হবে। এই সূরার ২১ ও ২২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,   

فَفَرَرْتُ مِنْكُمْ لَمَّا خِفْتُكُمْ فَوَهَبَ لِي رَبِّي حُكْمًا وَجَعَلَنِي مِنَ الْمُرْسَلِينَ (21) وَتِلْكَ نِعْمَةٌ تَمُنُّهَا عَلَيَّ أَنْ عَبَّدْتَ بَنِي إِسْرَائِيلَ (22)

“তারপর তোমাদের ভয়ে আমি পালিয়ে গেলাম। এরপর আমার রব আমাকে "হুকুম" দান করলেন এবং আমাকে রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন।“ (২৬:২১)

“আর তোমার অনুগ্রহের কথা যা তুমি আমার প্রতি দেখিয়েছো, তার আসল কথা হচ্ছে এই যে, তুমি বনী ইসরাঈলকে দাসে পরিণত করেছিলে।" (২৬:২২)

আগের পর্বে বলা হয়েছে, হযরত মূসা (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্ব পেয়েছেন তাঁর ভাই হারুনকে সঙ্গে নিয়ে যেন ফেরাউনের দরবারে যান। ফেরাউনকে মানুষের ওপর অত্যাচার করা থেকে বিরত রাখেন এবং সেইসাথে বনি ইসরাইলকেও যেন তার আধিপত্য থেকে মুক্ত করার পদক্ষেপ নেন। কিন্তু ফেরাউন মূনা (আ.) কে জবাবে বলল: প্রথম কথা হলো তুমি আমাদের একজনকে হত্যা করেছো আর এখন এসেছো নিজেকে নবী বলে দাবি করতে?

দ্বিতীয়ত তুমি আমাদের কাছে বড় হয়েছো। কী করে তুমি সেই বিষয়টার সম্মান রক্ষা করার চিন্তা না করে আমার সাথে এরকম কথা বলছো?

হযরত মূসা (আ.) ফেরাউনের কথার জবাবে বললেন: কাউকে হত্যা করার উদ্দেশ্য আমার ছিল না। আমি বরং একজন মজলুমকে রক্ষা করতে গিয়ে জুলুমকারীকে আঘাত করেছি। আঘাত করতেই সে মরে গেছে। তার মৃত্যুটা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত, ইচ্ছা করে হত্যা করা হয় নি তাকে।

এ আয়াতে মূসা (আ.) বলছেন:  যখন আমি গ্রেফতার হবার ভয়ে এবং অন্যায় কেসাসের ভয়ে মিশর ছেড়ে পালিয়ে মাদইয়ানে গিয়েছিলাম আল্লাহ তখন আমাকে কৌশল ও হেকমত শিক্ষা দিয়েছেন এবং আমাকে নবুয়্যতির দায়িত্ব দিয়েছেন। এখন আমি তাঁর পক্ষ থেকে আদিষ্ট হয়ে এসেছি তোমাকে বনি ইসরাইলের ওপর জুলুম অত্যাচার করা থেকে বিরত রাখতে।

এরপর মূসা (আ.) বলেন, কিন্তু এই যে তুমি বললে আমাকে তুমি তোমার আশ্রয়ে লালন পালন করেছো সেটা আমার প্রতি তোমার দয়া ছিল না, বরং সেটাও ছিল তোমার অত্যাচার-যে অত্যাচার তুমি আমার এবং আমার পরিবারের ওপর চালিয়েছো। আমার তো আমার বাবার ঘরে আমার মায়ের কোলে বেড়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু তুমি যেহেতু আদেশ দিয়েছো বনি ইসরাইলের মাঝে কোনো ছেলে সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তাকে মেরে ফেলতে, তাই আমার মা আমাকে মৃত্যু থেকে বাঁচানোর জন্য একটা সিন্দুকে ভরে নীল নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। তুমি আমাকে নীলনদী থেকেই নিয়ে এসে নিজের সন্তানের মতো বড়ো করেছো। সুতরাং এই কাজটাও বনি ইসরাইলের ওপর তোমার জুলুম অত্যাচারেরই প্রমাণ। তুমি তো আমার ওপর দয়া করো নি যে দয়ার খোঁটা তুমি এখন দিচ্ছো।

এ দুই আয়াতে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হলো:

১. খোদাদ্রোহী শাসকের অত্যাচার থেকে পালানোর মধ্য দিয়ে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়।

২. আল্লাহ তাঁর নবীদেরকে এমন জ্ঞান ও দৃষ্টি দান করেন যে জ্ঞানের শক্তিবলে তাঁরা আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব পালন করার যোগ্যতা ও ক্ষমতার অধিকারী হন, সেইসঙ্গে মানুষকেও আল্লাহর পথে, সত্যের পথে দাওয়াত দেন।

৩. মানুষকে খোঁটা দেওয়া তাগুতি ও বলদর্পী শক্তিগুলোর একটা বৈশিষ্ট্য। আল্লাহর বিধান হচ্ছে জনগণের সেবা করা, তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান করা, তাদেরকে খোঁটা দেওয়া নয়।

সূরা শু'আরার ২৩ এবং ২৪ নম্বর আয়াতে

قَالَ فِرْعَوْنُ وَمَا رَبُّ الْعَالَمِينَ (23) قَالَ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا إِنْ كُنْتُمْ مُوقِنِينَ (24)

“ফেরাউন বলল, "রাব্বুল আলামীন আবার কে?” (২৬:২৩)

“মূসা জবাব দিল, "আকাশসমূহ ও পৃথিবীর রব এবং আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে যা কিছু আছে তাদেরও রব, যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাস স্থাপনকারী হও।” (২৪)

ফেরাউন মূসা (আ.) এর পক্ষ থেকে যৌক্তিক জবাব শুনে আর কথা বাড়ানোর সুযোগ পেল না। নিরূপায় হয়ে সে তখন মূসা (আ.) কে জিজ্ঞেস করল: তুমি যে বলছো তুমি তোমার খোদার পক্ষ থেকে নবী হিসেবে মনোনীত হয়েছো, তোমার সেই খোদা কে?

হযরত মূসা (আ.) ফেরাউনের প্রশ্নের জবাবে সৃষ্টিজগতে তাঁর খোদার শক্তি ও ক্ষমতার নিদর্শনের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন:  যিনি সীমাহীন আকাশসমূহ, বিশাল বিস্তীর্ণ যমিন এবং তাদের মাঝখানে বিরাজমান সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করছেন তিনিই আমার পরোয়ারদেগার। আর তিনিই প্রার্থনীয় উপযুক্ত স্রষ্টা। হে ফেরাউন! তুমিও যদি সত্যের অনুসন্ধানী হতে চাও এবং সৃষ্টিব্যবস্থার ছন্দ ও শৃঙ্ক্ষলা নিয়ে ভাবো তাহলে অবশ্যই তুমি বিশ্বাসী হবে, বিশ্বের একমাত্র স্রষ্টার প্রতি ইমান আনবে।

এ আয়াতগুলোর শিক্ষা হলো:

১. দ্বীনের দাওয়াত যাঁরা দেন তাঁদের দায়িত্ব হলো ইমান ও বিশ্বাস সম্পর্কে মানুষের মনে যেসব সন্দেহ বা প্রশ্ন জাগে সেগুলোর যথাযথ ও দলিল প্রমাণ ভিত্তিক উত্তর দেয়া।

২. বহু খোদায় বিশ্বাসী মুশরিকদের দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে ঐশী দ্বীনগুলোর বক্তব্য হচ্ছে বিশ্বের স্রষ্টা একজনই। সৃষ্টিজগতে আর কোনো স্রষ্টার অস্তিত্বই নেই।

৩. বিশ্বাসীরা যখনই আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টিকূলের দিকে তাকান তখনই আল্লাহর অস্তিত্বের বিষয়টি উপলব্ধি করেন।

সূরা শু'আরার ২৫ ও ২৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

قَالَ لِمَنْ حَوْلَهُ أَلَا تَسْتَمِعُونَ (25) قَالَ رَبُّكُمْ وَرَبُّ آَبَائِكُمُ الْأَوَّلِينَ (26)

“ফেরাউন তার আশপাশের লোকদের বলল, "তোমরা শুনছো তো!" (২৬:২৫) 

“মূসা বলল, তোমাদেরও রব এবং তোমাদের বাপ-দাদাদেরও রব যারা অতিক্রান্ত হয়ে গেছে।" (২৬:২৬)

হযরত মূসা (আ.) এর সুস্পষ্ট জবাবের ফলে ফেরাউনের খোদায়ি দাবির অসারতা ফুটে ওঠে এবং প্রকৃত স্রষ্টার পরিচয় সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে ফেরাউন ক্ষেপে যায়। সে তার দরবারের লোকজনের কাছ থেকে মূসার বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশা করে। কিন্তু মূসা (আ.) তাতে বিন্দুমাত্র না ভড়কে বরং আরও বলতে লাগলেন: আমার খোদা কেবল আকাশ আর যমিনেরই স্রষ্টা নন বরং তোমার এবং তোমার পূর্বপুরুষদেরও তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তোমাদের জীবন, তোমাদের রুটি-রুজি তাঁরই হাতে। এমনকি স্বয়ং ফেরাউনকেও তিনিই সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁরই অধীনে সে। খোদার শক্তির কাছে ফেরাউন তুচ্ছ এবং নগণ্য।

এই আয়াতগুলো থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হলো:

১. সত্যের মোকাবেলায় তাগুতি শক্তিগুলোর জবাব বা কৌশল হলো প্রকৃত সত্যকে ঢেকে রাখা বা গোপন করা।

২. আকাশ, জমিন, মানুষসহ এবং অন্যান্য সকল সৃষ্টির স্রষ্টা একজনই এবং একমাত্র তিনিই সবার প্রতিপালক। সকল সৃষ্টিকেই আল্লাহ একইভাবে প্রতিপালন করেন।#