জানুয়ারি ১১, ২০১৭ ১৩:৪৪ Asia/Dhaka

এ পর্বে সূরা শুআরার ৩৪ থেকে ৪০ নম্বর আয়াতের তরজমা ও তাফসির উপস্থাপনা করা হবে। এ সূরার ৩৪ ও ৩৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

قَالَ لِلْمَلَإِ حَوْلَهُ إِنَّ هَذَا لَسَاحِرٌ عَلِيمٌ (34) يُرِيدُ أَنْ يُخْرِجَكُمْ مِنْ أَرْضِكُمْ بِسِحْرِهِ فَمَاذَا تَأْمُرُونَ (35)

“(ফেরাউন) তার পারিষদবর্গকে বলল- এ তো এক সুদক্ষ ও চতুর জাদুকর।”(২৬:৩৪)

“ও জাদুবলে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে দিতে চায়। এখন তোমরা (আমাকে) কি করতে বলো?” (২৬:৩৫)

আগের পর্বে বলা হয়েছে, অত্যাচারী রাজা ফেরাউন যখন হযরত মুসাকে কারাগারে নিক্ষেপের ভয় দেখায় তখন আল্লাহর নবী নিজের হাতের লাঠিকে বিশাল অজগরে পরিণত করেন। এ দৃশ্য দেখে ফেরাউন ভয় পেয়ে যায় এবং নিজের হুমকি বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকে। এবার সে অন্য কোনো উপায়ে হযরত মুসাকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করে। এরপর আজকের এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: হযরত মুসা (আ.)-এর অলৌকিক ক্ষমতার সামনে পরাস্ত ও হতবাক ফেরাউন নিজ সভাসদের সামনে সম্মান বাঁচানোর জন্য বলে ওঠে:  এখন বুঝতে পারলাম, ও সুদক্ষ জাদুকর ছাড়া আর কিছু নয়। দরবারের গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পদ থেকে তোমাদের সরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সে এ কাজ করেছে। কাজেই সবাই মিলে চিন্তা করে দেখো মুসার ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কি করা যায়।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ফেরাউন নিজেকে মানুষের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে দাবি করা সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে, বিপদের সময় সে কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না এবং অন্যের কাছে পরামর্শ চাচ্ছে।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:

১.  সত্যের মোকাবিলায় দাম্ভিক ও খোদাদ্রোহী ব্যক্তিদের একমাত্র অস্ত্র হচ্ছে মিথ্যাচার ও অপবাদ আরোপ করা। ফেরাউন একবার হযরত মুসাকে বদ্ধ উন্মাদ বলে আখ্যায়িত করে এবং পরক্ষণেই তাঁর অলৌকিক নিদর্শন দেখে তাঁকে জাদুকর বলে অপবাদ দেয়। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে উন্মাদের পক্ষে জাদু দেখানো সম্ভব নয়।

২. বিশ্বে সব যুগে সব জাতির মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। এ দুই আয়াতে দেখা যাচ্ছে, ফেরাউন তার পারিষদবর্গকে হযরত মুসার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার কাজে দেশপ্রেমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ফেরাউন তার আশপাশের লোকজনকে বলে: সে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে দিতে চায়।

সূরা শু'আরার ৩৬ ও ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলছেন:

قَالُوا أَرْجِهْ وَأَخَاهُ وَابْعَثْ فِي الْمَدَائِنِ حَاشِرِينَ (36) يَأْتُوكَ بِكُلِّ سَحَّارٍ عَلِيمٍ (37)

“(ওরা) বলল- তাকে ও তার ভাইকে (শাস্তি দেয়ার আগে) কিছু সময় দাও এবং নগরে নগরে সংগ্রাহকদের পাঠাও।” (২৬:৩৬)

 “যেন তারা তোমার কাছে সব সুদক্ষ জাদুকর হাজির করতে পারে।” (২৬:৩৭)

ফেরাউনের দরবারে উপস্থিত উজির-নাজির-পাত্র-মিত্র নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করার পর তাদের শাসককে বলল: মুসা ও তার ভাইকে শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করে তাদেরকে কয়েকদিন সময় দিন এবং সারাদেশে লোক পাঠান যাতে তারা সব দক্ষ জাদুকরকে রাজধানীতে নিয়ে আসতে পারে। দক্ষ জাদুকরদের সামনে মুসার লাঠির জোর পরীক্ষা করা যাবে এবং এসব জাদুকর নিশ্চয়ই মুসাকে চরম অপমান করে ছাড়বে। পারিষদবর্গের এ প্রস্তাব দেখে বোঝা যায়, তারাও ফেরাউনের মতো হযরত মুসা (আ.)কে জাদুকর সাব্যস্ত করেছে এবং তাকে শাস্তি দেয়ার উপায় হিসেবে মিশরীয় জাদুকরদের একত্রিত করার প্রস্তাব দিয়েছে। অথচ তারা যদি একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করত তাহলেই বুঝত হযরত মুসা কোনো জাদুকর নন। কারণ, ইতিহাসের কোনো যুগেই জাদুকররা কখনোই মানুষকে আল্লাহর পথে আসার দাওয়াত দেয়নি। বরং তারা জাদুর ভেল্কি দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ উপার্জনকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে।

কিন্তু ফেরাউনের কাছে হযরত মুসার আহ্বান ছিল জনগণের প্রতি জুলুম-অত্যাচার বন্ধ করে তাদেরকে বন্দিত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দেয়ার। তিনি ফেরাউনের কাছে ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ চাননি। অন্যদিকে জাদুকররা যে ব্যক্তিগত স্বার্থের দিকে বেশি মনোযোগী তা দেখা যাবে পরবর্তী আয়াতগুলোতে। সেখানে দেখা যাবে সারা মিশর থেকে আগত জাদুকররা হযরত মুসার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামার আগেই ফেরাউনের কাছ থেকে পুরস্কার চেয়ে বসেছে। অথচ আল্লাহর নবী-রাসূলরা ব্যক্তিস্বার্থ নয় বরং জনসাধারণকে মুক্তি দিতে এসেছেন এবং এ লক্ষ্যে নিজেদের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন করতে কুণ্ঠিত হননি।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১.  অত্যাচারী ও স্বৈরশাসকদের সরকার ব্যবস্থায় দরবারের উচ্চপদে আসীন ব্যক্তিরাই সব সিদ্ধান্ত নেয়, সেখানে জনগণের কোনো ভূমিকা নেই।

২. দাম্ভিক শাসকরা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের অর্থের বিনিময়ে কিনে নেয় এবং তাদেরকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

সূরা শু'আরার ৩৮ থেকে ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

  فَجُمِعَ السَّحَرَةُ لِمِيقَاتِ يَوْمٍ مَعْلُومٍ (38) وَقِيلَ لِلنَّاسِ هَلْ أَنْتُمْ مُجْتَمِعُونَ (39) لَعَلَّنَا نَتَّبِعُ السَّحَرَةَ إِنْ كَانُوا هُمُ الْغَالِبِينَ (40)

“অতঃপর এক নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট সময়ে জাদুকরদের একত্রিত করা হলো।” (২৬:৩৮)

“এবং জনগণকে বলা হলো- তোমরাও (নির্দিষ্ট স্থানে) জমায়েত হও।” (২৬:৩৯)

 “যাতে জাদুকররা বিজয়ী হলে আমরা ওদের সমর্থন করতে পারি।” (২৬:৪০)

দরবারের লোকদের প্রস্তাব অনুযায়ী ফেরাউন সারাদেশে লোক পাঠিয়ে দিল এই আদেশ দিয়ে যে, তারা যেখানেই দক্ষ ও পারদর্শী জাদুকর পাবে তাকেই যেন রাজধানীতে নিয়ে আসে। তারা আসার পর একটি নির্দিষ্ট দিন ও ক্ষণে সাধারণ মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হয় জাদুকরদের সঙ্গে হযরত মুসার কথিত জাদুর প্রতিযোগিতা উপভোগ করার জন্য। ফেরাউন ও তার অনুচররা ভেবেছিল, এই জাদুর খেলায় হযরত মুসা পরাজিত হবেন এবং জনগণ ফেরাউনের শক্তিমত্তা ও চাতুরতা দেখে তার প্রতি আরো বেশি ভক্তি-শ্রদ্ধা দেখাবে ও তার আরো বেশি আনুগত্য করবে। ফেরাউনের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল- জনগণ যখন তার নির্দেশে আসা জাদুকরদের উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন শ্লোগান দেবে তখন হযরত মুসা ও তার ভাই হারুন ভয় পেয়ে যাবে এবং তাদের কাঙ্ক্ষিত জাদু দেখাতে পারবে না। ফেরাউন ও তার অনুচরদের দৃষ্টিতে এটি ছিল তাদের বহু সৃষ্টিকর্তার বিপরীতে মুসার এক স্রষ্টার লড়াই যেখানে তারা আশা করেছিল বহু সৃষ্টিকর্তা বিজয়ী হবে। এর ফলে হযরত মুসা পরাজিত হয়ে নিরাশ হয়ে ফিরে যাবেন এবং আর কোনোদিন জনগণকে ফেরাউনের অত্যাচারী শাসনকাজের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলবেন না।

এ তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১.  স্বৈরাচারী ও দাম্ভিক শাসকগোষ্ঠী অনেক সময় নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য জনসমাগম করে। তাদের দৃষ্টিতে জনগণ হচ্ছে নিছক তাদের ক্ষমতায় থাকার হাতিয়ার।

২. অত্যাচারী শাসকদের রাজ্যে আল্লাহর বাণী প্রচার প্রতিহত করার জন্য ভ্রান্ত মতবাদের প্রচার ও প্রসার ঘটানো হয়। এই ঘটনা যুগে যুগে ঘটেছে এবং বর্তমানেও ঘটছে।#