রংধনু আসর: পরিশ্রমের গুরুত্ব সম্পর্কে কয়েকটি ঘটনা
রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই 'পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসুতি' বাংলা এ প্রবাদটি শুনেছো। জীবনে সফলতার জন্য পরিশ্রমের বিকল্প নেই। আমাদের ইসলাম ধর্মে শ্রমের মর্যাদা দেয়ার পাশাপাশি নিজের কাজ নিজে করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
রাসূলেখোদা (সা.) বলেছেন, 'নিজের কাজে কখনো অপরের সাহায্য নেয়া উচিত নয়। আর কারো ভরসা করাও ঠিক নয়।' নিজের কাজ নিজে করার ব্যাপারে রাসূল (সা.) যেমন গুরুত্ব দিয়েছেন, তেমনি নিজে তা করিয়ে দেখিয়ে গেছেন। পরিশ্রমের গুরুত্ব দিতে গিয়ে বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, "যদি তোমার হাতে একটি চারাগাছ থাকে এবং তুমি জানো যে কিছুক্ষণ পর তুমি মারা যাবে কিংবা কিছুক্ষণ পর কেয়ামত শুরু হয়ে যাবে, তারপরও তুমি সেটি রোপন করে মারা যাও।"
ইমাম আলী (আ.) শ্রমের মর্যাদা সম্পর্কে আরো বলেছেন, "কঠোর পরিশ্রম করবে, কারণ, পরিশ্রম ছাড়া কোন কিছু অর্জিত হয়নি।" তিনি আরো বলেছেন, "কঠোর পরিশ্রমী ব্যক্তি জীবনে সফল হয়, বুদ্ধিমান অলস ব্যক্তি নয়। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) এবং নবী বংশের মহান ইমামগণ নিজের কাজ নিজেই করে গেছেন। তো বন্ধুরা, নিজের কাজ নিজে করা বা পরিশ্রমের গুরুত্ব সম্পর্কে আজকের আসরে কয়েকটি ঘটনা শোনাব। এরপর থাকবে একটি শিক্ষণীয় গান। আর সবশেষে থাকবে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার এক বন্ধুর সাক্ষাৎকার। অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।
একবার এক সফরে গিয়ে রাসূলে (সা.) ও তাঁর সাহাবীরা নিজ নিজ বাহন থেকে নেমে পড়লেন। নিজেদের মালপত্র নামিয়ে রাখলেন নির্ধারিত স্থানে। তারপর সবাই মিলে ঠিক করলেন, একটি দুম্বা জবাই করে খাবার তৈরি করা হবে। একজন সাহাবী বললেন, দুম্বা জবাই করার দায়িত্ব আমার। আরেকজন বললেন, দুম্বার চামড়া ছাড়ানো ও গোশত কাটার দায়িত্ব আমি নিলাম। তৃতীয়জন বললেন, গোশত রান্না করার দায়িত্ব আমার। এভাবে সাহাবীরা নিজ নিজ দায়িত্ব ভাগ করে নিলেন। এসময় রাসূল (সা.) বললেন, 'কাঠ কুড়িয়ে আনার দায়িত্ব আমার।'
রাসূলের কথা শুনে এক সাহাবী বলে উঠলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমরা উপস্থিত থাকতে আপনি কষ্ট করবেন কেন? আপনি বিশ্রাম নিন। আমরা আনন্দের সাথে সমস্ত
সাহাবীদের কথা শুনে রাসূলেখোদা বললেন, 'আমি জানি এ কাজ তোমরা করে নিতে পারবে। কিন্তু মহান আল্লাহ ওই বান্দাকে কখনোই ভালোবাসেন না, যে বন্ধুদের মাঝে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম মনে করে।'
এ কথা বলে তিনি বনের দিকে চলে গেলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যে জ্বালানি কাঠ ও খড়-কুটো নিয়ে ফিরে এলেন।
বন্ধুরা, এবার শোনাচ্ছি আরেক দিনের ঘটনা। রাসূল (সা.) এর কাফেলাটি অনেকক্ষণ যাবত পথ চলার কারণে সবার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ দেখা যাচ্ছিল। বহনকারী পশুগুলোও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এসময় কাফেলাটি এমন একটি স্থানে পৌঁছল যেখানে কিছু পানি ছিল। কাফেলা থেমে গেলে রাসূলেখোদা উটের পিঠ থেকে নিচে নেমে এলেন। এরপর সবাইকে নিয়ে তিনি পানির দিকে পা বাড়ালেন ওজু করার জন্য। কিন্তু কয়েক ধাপ চলার পর কাউকে কিছু না বলে আবার নিজের উটের দিকে ফিরে এলেন। রাসূলুল্লাহর সাহাবী ও সাথীরা আশ্চর্য হয়ে পরস্পর বলাবলি করতে লাগলেন, মনে হয় যাত্রাবিরতির জন্য এ স্থানটি নবীজীর পছন্দ হয়নি। এখনই হয়তো তিনি রওনা হবার নির্দেশ দেবেন।
কাফেলার সবাই যখন রাসূলের নতুন নির্দেশ শোনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন তখন দেখা গেল, মহানবী উটের কোমর বাঁধার রশি হাতে নিলেন এবং উটের কোমর বাধতে শুরু করলেন। তাড়াতাড়ি বাঁধার কাজ শেষ করে তিনি আবার পানির দিকে গেলেন ওজু করতে। এ সময় চারদিক থেকে সাহাবীরা এসে বললেন, 'হে আল্লাহ রাসূল! আপনি এ কাজের জন্য আমাদেরকে কেন হুকুম দিলেন না? আপনি কেন কাজটি করতে গেলেন? আমরা তো গর্বের সাথে এ কাজটি করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম।'
নবীজী তাদের প্রশ্নের জবাবে বললেন, 'নিজের কাজে কখনো অপরের সাহায্য নেয়া উচিত নয়। কার কারো ভরসা করাও ঠিক নয়। সে কাজ যত ছোট কিংবা যত বড়ই হোক না কেন।'
রাসূলের জবাব শুনে সাহাবীরা বিস্মিত হয়ে গেলেন।
বন্ধুরা, এবার আমরা নবীবংশের মহান ইমাম হযরত জাফর সাদিক (আ.)-এর জীবন থেকে নেয়া একটি ঘটনা শোনাব।
একদিন ইমাম জাফর সাদিক (আ.) শ্রমিকের পোশাক পরে হাতে বেলচা নিয়ে নিজের জমিতে কাজ করছিলেন। অনেকক্ষণ পর্যন্ত কাজ করার কারণে তার পুরো শরীর ঘামে ভিজে চুপ চুপ হয়ে গেল। এমন সময় আবু আমর শাইবানী নামে এক ব্যক্তি সেখানে এসে উপস্থিত হলো। সে দেখতে পেল, ইমামের দেহ থেকে ঘাম টপ টপ করে ঝরছে। সে ভাবল- হয়তো শ্রমিক না পাওয়ায় ইমাম নিজেই নিজের ক্ষেতে কাজ করছেন। তাই সে এগিয়ে গিয়ে বলল, হে ইমাম! বেলচাটি আমাকে দিন। বাকী কাজটুকু আমি করব।
ইমাম বললেন, না! আসলে আমি খুব পছন্দ করি যে, মানুষ রোজগারের জন্য নিজে পরিশ্রম করবে এবং রুটি-রুজি অর্জন করার জন্য রোদের প্রখরতা সহ্য করবে।
বন্ধুরা, পরিশ্রম সম্পর্কে এবার আমরা আহলে বাইতের আরেকজন ইমাম অর্থাৎ ইমাম মুহাম্মদ বাক্বের (আ.)-এর একটি ঘটনা শোনাব।
ঘটনাটি গ্রীষ্মকালের। প্রচণ্ড গরম ও প্রখর রৌদ্রতাপে মদীনা শহর ও তার আশপাশের বাগ-বাগিচা ও ক্ষেত- খামারগুলো ঝলসে যাচ্ছিল। এমন সময় মুহাম্মদ ইবনে মুনকাদির নামে এক ব্যক্তি কোন এক কাজে মদীনা শহর থেকে বের হলো। মুনকাদির নিজেকে একজন বড় মোত্তাকী, পরহেজগার, খোদাভীরু ইবাদতকারী ও দুনিয়াত্যাগী মনে করতো।
পথ চলতে চলতে হঠাৎ তার দৃষ্টি এমন একজন স্বাস্থ্যবান লোকের উপর পড়ল যিনি প্রখর রোদের পরোয়া না করে নিজের কিছু সঙ্গী-সাথীকে সাথে নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। মোটা-তাজা দেহের অধিকারী সে লোকটির চলার ধরনে বোঝা যাচ্ছিল যে, তিনি তার ক্ষেত-খামার দেখাশোনার জন্য যাচ্ছিলেন।
দুনিয়াত্যাগী সে লোকটি ভাবল, এ লোকটি কে- যিনি এ কঠোর গরমের দিনে রোদের মধ্যেও নিজেকে দুনিয়াদারীর মধ্যে লিপ্ত রেখেছে? এ কথা ভেবেই সে দ্রুত পায়ে ওই লোকটির কাছে পৌঁছে গেল। তার নিকটে পৌঁছে সে আরো আশ্চর্য হলো যে, তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনুল হোসাইন (আ.)। অর্থাৎ ইমাম মুহাম্মদ বাক্বের (আ.)।
দুনিয়াত্যাগী লোকটি ভাবতে লাগল, এ সম্ভ্রান্ত লোকটি এভাবে দুনিয়াদারীর পিছনে কেন লেগে আছে? যাই হোক না কেন, আমার তো একটা কর্তব্য আছে। আমি এ সম্ভ্রান্ত লোকটিকে কিছু উপদেশ দেব যাতে করে তিনি দুনিয়াদারী থেকে বিরত থাকেন।
এ কথা ভেবে দুনিয়াত্যাগী লোকটি হযরত ইমাম বাক্বের (আ.)-এর নিকট এসে তাকে সালাম জানাল। ইমাম (আ.) নিজের ঘাম মুছতে মুছতে তার সালামের জবাব দিলেন। দুনিয়াত্যাগী লোকটি বলল, 'এটা কি ঠিক হচ্ছে যে, আপনার মত একজন সম্ভ্রান্তব্যক্তি এ প্রচণ্ড গরম রোদের মধ্যে দুনিয়াদারীর পিছনে ঘর থেকে বের হবেন? তাছাড়া আপনার মতো একজন স্থুল দেহের অধিকারী লোকের জন্য তো এ রোদ ও গরম আরো বেশি কষ্টদায়ক।'
সে আরো বলল, 'মৃত্যুর সংবাদ কে জানে? কে-ই বা জানে যে, সে কখন মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করবে? হতে পারে এখনই আপনার মৃত্যু এসে যাবে। আল্লাহ এমনটি না করুন, যদি এ অবস্থায় আপনার মৃত্যু এসে যায় তাহলে আপনার কী অবস্থা হবে? আমার মতে আপনার মতো লোকদের পক্ষে শোভা পায় না যে, এতো কড়া রোদে ও এতো কঠোর গরমের মধ্যে এভাবে কষ্ট করবেন। যা হোক আমি আপনাকে পরামর্শ দেবো যে, আপনার মতো লোকের পক্ষে এভাবে দুনিয়াদারীতে লিপ্ত হওয়াটা কখনই উচিত হবে না।'
হযরত ইমাম বাক্বের (আ.) তার একজন সাথীর কাঁধে হাত রেখে একটা দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে তাকে বললেন, 'যদি এ সময় আমার মৃত্যু এসে যায় তাহলে আমার মৃত্যু হবে ইবাদতরত অবস্থায় এবং আমি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত ফরজ কাজ পালনরত অবস্থায় এ পৃথিবী থেকে বিদায় নেব। তোমার হয়ত জানা নেই যে, এখন আমি যে কাজে লিপ্ত আছি তা আল্লাহর প্রকৃত আনুগত্য ও ইবাদত-বন্দেগীরই একটা কাজ। তুমি মনে করে নিয়েছ যে, শুধু আল্লাহর যিকির, নামায ও দোয়া করাটাই আল্লাহর ইবাদত? আমারও তো নিজের জীবন আছে। আমি যদি পরিশ্রম ও কষ্ট না করি তাহলে আমার জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও খরচাদির জন্য তোমার বা তোমার মতো অন্যদের কাছে হাত পাততে হবে। আমি এখন রিযিকের সন্ধানে ও জীবন সামগ্রীর তালাশে যাচ্ছি যাতে করে আমার প্রয়োজনের সময় অপরের সাহায্য গ্রহণ করতে না হয়।'
এরপর ইমাম বললেন, 'মৃত্যুর ভয় তো মানুষকে তখন করা উচিত যখন সে গুণাহের কাজ, অন্যায় ও আল্লাহর হুকুমের বরখেলাফ কাজ করবে। মানুষ যখন আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকবে তখন নয়। আমি এ সময় আল্লাহর হুকুমের আনুগত্য করছি। যিনি আমাদের জন্য ফরজ করে দিয়েছেন যে, অপরের কাঁধের বোঝা হয়ো না, বরং নিজের শ্রম-সাধনার দ্বারা নিজের আয়-রুজির ব্যবস্থা করো।'
ইমামের কথা শুনে দুনিয়াত্যাগী লোকটি বলল: আমি তো একটা আশ্চর্যজনক বিভ্রান্তি ও অজ্ঞতার মধ্যে ছিলাম। আমি নিজের মনে ধারণা করে রেখেছিলাম যে, এ ব্যাপারে অন্যদেরকে উপদেশ দেবো। কিন্তু এখন বুঝতে পারলাম যে, আমি নিজেই একটা ভুলের মধ্যে লিপ্ত ছিলাম। আমি একটা ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে ভুলের মধ্যে জীবন যাপন করছিলাম এবং আমার নিজেরই সংশোধনের প্রয়োজন ছিল অতীব জরুরি।
বন্ধুরা, কয়েকটি শিক্ষামূলক ঘটনা শুনলে। তোমরা যদি বেশি বেশি বই পড়ো তাহলে বিশ্বনবী ও তাঁর বংশের ইমামদের জীবনে ঘটে যাওয়া এ রকম বহু ঘটনা জানতে হবে।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৪