জানুয়ারি ১৭, ২০১৮ ১৭:১৬ Asia/Dhaka

আমরা ইরানি পণ্য সামগ্রীর পরিচিতি নিয়ে নতুন একটি ধারাবাহিক শুরু করেছি গত আসর থেকে। শুরুতেই ইরানের বিখ্যাত "পেস্তা" নিয়ে কথা বলেছি। আজকের আসরেও পেস্তা নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করবো বলে কথা দিয়েছিলাম আপনাদের। সে অনুযায়ী চলুন কথা না বাড়িয়ে শুরু করে দেওয়া যাক।

বলেছিলাম যে মার্কিন ইরানবিদ বার্টোল্ড লুফার ১৯২৬ সালে তাঁর প্রকাশিত বইতে ইরানের স্থানীয় ফলফলাদির নাম উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি বিশেষ করে পেস্তার কথা লিখতে ভোলেন নি। তিনি এও লিখেছেন যে ইরানিদের জীবনে এই পেস্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পেস্তাকে প্রাচীন ফার্সিতে বলা হতো পিস্তাকা। পাহলাভি যুগে বলা হতো পিস্তাক আর বর্তমানে বলা হচ্ছে পেস্তা। তো এই পেস্তা নিয়ে আমরা আজকের আসরেও কথা বলার চেষ্টা করবো বলে কথা দিয়েছিলাম। ইরানের বিখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ও বিশিষ্ট লেখক মরহুম পারভেজ খনলারিও তাঁর একটি বইতে লিখেছেন, পেস্তা গাছ এমন একটি উদ্ভিদ যার শুরুটা ছিল ইরানে। পরবর্তীকালে এই পেস্তা নামটি ধীরে ধীরে সামান্য পরিবর্তিত হয়ে অন্যান্য দেশের জনগণের ভাষায় প্রবেশ করেছে এবং চালু হয়ে গেছে।

মরহুম পারভেজ খনলারির মতে পেস্তা মূলত সোগদিয়া এবং খোরাসানের উত্তরাঞ্চলের একটি উদ্ভিদ ছিল এবং এখনও সেই এলাকার বলেই মনে করা হয়। আজকাল অবশ্য পেস্তা আমেরিকা, তুরস্ক, সিরিয়া, তিউনিশিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও উৎপন্ন হচ্ছে। তবে ইরানি পেস্তা সেসব দেশের পেস্তার তুলনায় গুণ ও মাণের দিক থেকে অনেক উন্নত। পেস্তা কিন্তু দেখতে বহু রকমের। ইরানে অন্তত নব্বুই প্রকারের পেস্তা শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলোর প্রচলিত বাণিজ্যিক নাম হলো রাউন্ড, সুপার লঙ,জাম্বো, লঙ ইত্যাদি আরও বিচিত্র নাম রয়েছে। আজকাল অবশ্য ইরানের বিভিন্ন এলাকায় এসব পেস্তার চাষ হচ্ছে। যেমন কেরমান, ইয়াযদ, দক্ষিণ খোরাসান, কেন্দ্রিয় খোরাসান,ফার্স,সেমনান,সিস্তান বেলুচিস্তান, ইস্ফাহান, কাজভিন এবং তেহরানেও পেস্তার চাষ হচ্ছে। সারা বিশ্বে পেস্তা রপ্তানিতে ইরান খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ হিসেবে পরিচিত।

ইরানের পণ্য-সামগ্রী: পেস্তা

পেস্তার বহু ওষুধি গুণের কথা যুগে যুগে বর্ণিত হয়েছে।যদিও পেস্তার ভেতরের বিচির মতো শাস খেতেও সুস্বাদু, অসাধারণ মজাদার এই পেস্তা। তার অর্থ হলো খাদ্য মানের দিক থেকে পেস্তা একটি অতুলনীয় পণ্য। পেস্তার শাসে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ আয়রন। যাদের দেহে লৌহ কণিকার স্বল্পতা রয়েছে কিংবা রক্তাল্পতা রয়েছে তাদের জন্য পেস্তা উৎকৃষ্ট একটি খাবার। কুপার, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেশিয়াম এবং ভিটামিন-ই এবং বি'সহ বিভিন্ন রকমের ভিটামিনে সমৃদ্ধ এই পেস্তা। সুতরাং পেস্তা খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। মেধা ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে, স্নায়ুবিক স্থিরতা রক্ষায়, পেটের হজম শক্তি বৃদ্ধি করতে, রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল মানে এলডিএল কমাতে, হার্টের সুস্থতা রক্ষায়, দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে, শরীরের ডাইজেশন সিস্টেম সুস্থ সবল রাখার পাশাপাশি আরও বহু ক্ষেত্রে এই পেস্তা চমৎকার কাজ করে।

গবেষকদের গবেষণায় আরও দেখা গেছে যারা ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত তাদের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ তথা স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণের জন্য এই পেস্তার যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। ত্বকের সুস্থতা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির ব্যাপারে যারা সচেতন তারা দৈনিক পেস্তা খেতে ভুলবেন না। যেহেতু পেস্তায় রয়েছে ভিটামিন-ই, তাই পেস্তা ত্বককে সূর্যের অতি বেগুণি রশ্মির ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে। প্রাচীন ইরানি চিকিৎসা পদ্ধতিতে শরীরের সামগ্রিক শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পেস্তা খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতো।

ইরানে পেস্তাটা অর্থকরী একটি পণ্য। অর্থনৈতিক দিক থেকেও তাই এই পেস্তার মূল্য যথেষ্ট। পেস্তার চাষ করে সবাই লাভবান হয়েছেন। কারণ হলো কেবল ইরানের অভ্যন্তরেই নয় বিশ্ব বাজারেও এই পেস্তার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সুতরাং পেস্তা রপ্তানি করে প্রচুর অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের বহু দেশে ইরানি পেস্তা রপ্তানি করা হয়ে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ, এশিয়া এবং আমেরিকার দেশগুলো ইরানি পেস্তার নিয়মিত ক্রেতা। দেশগুলো হলো জার্মানি, স্পেন, ইতালি, সুইডেন, সুজারল্যান্ড, জাপান, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, কাজাখিস্তান, তিউনিশিয়া, কানাডা, চিলি, ব্রাজিলসহ আরও বহু দেশ।

আগেই বলেছি গুণগত মান, খাদ্যগুণ, স্বাদ সব দিক থেকেই ইরানি পেস্তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের পেস্তার তুলনায় একেবারেই আলাদা। এ কারণেই  পেস্তা উৎপাদনকারী অন্যান্য দেশ তাদের পণ্যের সঙ্গে ইরানি পেস্তার মিশ্রণ ঘটিয়ে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে থাকে। আমেরিকা ইরানি পেস্তার ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ করে তাদের দেশে ইরানের সুস্বাদু পেস্তার প্রবেশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কারণ আমেরিকায় যারা পেস্তা উৎপাদন করছে তাদের পেস্তার তুলনায় ইরানি পেস্তা বেশি সুস্বাদু। তাদের উদ্বেগ কমানোর জন্যই ইরানি পেস্তার ওপর এ ধরনের শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/১৭