উত্তর প্রদেশে ক্যাম্পাসগুলোতে ‘ধর্মান্তরবিরোধী সেল’ গঠনের নির্দেশ: হাইকোর্টের উদ্বেগ
https://parstoday.ir/bn/news/event-i160262-উত্তর_প্রদেশে_ক্যাম্পাসগুলোতে_ধর্মান্তরবিরোধী_সেল’_গঠনের_নির্দেশ_হাইকোর্টের_উদ্বেগ
ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের সব রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজসহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তথাকথিত ‘ধর্মান্তরবিরোধী’ ইউনিট গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন রাজ্যের রাজ্যপাল ও চ্যান্সেলর আনন্দীবেন প্যাটেল। ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার্থীদের "জোরপূর্বক বা প্রলোভনমূলক ধর্ম পরিবর্তন" রোধ করার উদ্দেশ্যে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে বলে রাজ্যপাল সচিবালয় জানিয়েছে।
(last modified 2026-06-12T13:12:19+00:00 )
জুন ১২, ২০২৬ ১৯:০৯ Asia/Dhaka
  • উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ
    উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ

ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের সব রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজসহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তথাকথিত ‘ধর্মান্তরবিরোধী’ ইউনিট গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন রাজ্যের রাজ্যপাল ও চ্যান্সেলর আনন্দীবেন প্যাটেল। ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার্থীদের "জোরপূর্বক বা প্রলোভনমূলক ধর্ম পরিবর্তন" রোধ করার উদ্দেশ্যে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে বলে রাজ্যপাল সচিবালয় জানিয়েছে।

রাজ্যের ক্ষমতাসীন বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি) তথা মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকার এই পদক্ষেপকে জোরালো সমর্থন জানিয়েছে। তবে এই পদক্ষেপের ফলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হয়রানি ও আইনি অপব্যবহারের তীব্র শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যে কারণে এই নির্দেশনা:

সংবাদমাধ্যম 'দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' এবং 'হিন্দুস্তান টাইমস'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি লখনৌ'র ঐতিহ্যবাহী কিং জর্জ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এক নার্সিং ছাত্রীকে বিয়ের প্রলোভন, মানসিক চাপ ও যৌন শোষণের মাধ্যমে ধর্মান্তরকরণের অভিযোগে পুলিশি পদক্ষেপের পর এই নির্দেশনা এলো। এ ঘটনার পর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে তথাকথিত ‘লাভ জিহাদ’-এর অভিযোগ তোলে।

রাজ্যপালের বিশেষ নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সুধীর এম বোবদে স্বাক্ষরিত চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রলোভন বা মানসিক চাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টার তথ্য প্রায়ই পাওয়া যাচ্ছে। চিঠিতে বলা হয়, "শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে, ভয় দেখিয়ে, মানসিক চাপ তৈরি করে বা অনৈতিক প্রলোভন দেখিয়ে যেকোনো ধরনের অবৈধ বা জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের চেষ্টা সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য, অনৈতিক এবং আইনবিরোধী।"

বাধ্যতামূলক নির্দেশনাসমূহ:

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি নিরাপদ, ধর্ম-নিরপেক্ষ এবং একাডেমিক পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে কয়েকটি নির্দিষ্ট সুরক্ষাকবচ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:

উগ্রবাদবিরোধী ইউনিট সক্রিয়করণ: প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউট স্তরে ‘র‌্যাডিক্যালাইজেশনবিরোধী’ ইউনিট বা ছাত্রকল্যাণ সেলকে অত্যন্ত সক্রিয় করতে হবে।

কঠোর নজরদারি ও আকস্মিক পরিদর্শন: ক্যাম্পাসের হোস্টেলসহ সংবেদনশীল স্থানে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।

কাউন্সেলিং ও পিটিএ মিটিং: শিক্ষক-শিক্ষার্থী (মেন্টর-মেন্টি) সেশন এবং অভিভাবক-শিক্ষক সভায় শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা ও এ সংক্রান্ত উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা করা এবং গোপনীয়তা বজায় রেখে অভিযোগ জানানোর জন্য কাউন্সেলিং সেন্টার স্থাপন করা।

সেমিনার ও আইনি পদক্ষেপ: শিক্ষার্থীদের আইনি অধিকার ও নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করা এবং কোনো সন্দেহজনক বা উগ্রবাদী তৎপরতা দেখলে অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে অবহিত করা, যাতে রাজ্যের ধর্মান্তরবিরোধী আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিক্রিয়া:

রাজ্যপালের এই নির্দেশকে স্বাগত জানিয়েছে উত্তর প্রদেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়। কিং জর্জ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির এক জ্যেষ্ঠ ফ্যাকাল্টি মেম্বার জানান, তাঁরা ইতোমধ্যে এই সেলকে আরও শক্তিশালী করার কাজ শুরু করেছেন এবং ক্যাম্পাসে ছদ্মবেশে থাকা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা নিয়েছেন। এছাড়া অটল বিহারী বাজপেয়ী মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটিও তাদের অধিভুক্ত সব সরকারি ও বেসরকারি কলেজকে এই নির্দেশ জরুরি ভিত্তিতে অনুসরণের তাগিদ দিয়েছে।

আইনের অপব্যবহার ও মানবাধিকার হরণের অভিযোগ:

একদিকে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই পদক্ষেপকে ‘নিরাপত্তা’ হিসেবে দেখলেও, অন্যদিকে ভারতের প্রগতিশীল মহল এবং মানবাধিকার কর্মীরা এর তীব্র সমালোচনা করছেন।

সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’ এর আগের বেশ কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখিয়েছে যে, কীভাবে উত্তর প্রদেশের বিতর্কিত 'বেআইনি ধর্মান্তরকরণ নিষেধাজ্ঞা আইন, ২০২১'-কে রাজনৈতিক নির্দেশে এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সহায়তায় অপব্যবহার করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বজরং দল বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) মতো নজরদারি দলগুলো সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের হয়রানি করতে এই আইনকে হাতিয়ার বানিয়েছে। এমনকি কোনো অ-হিন্দু প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী যদি বিনামূল্যে চিকিৎসাকেন্দ্র, বৃত্তি বা কোনো সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রার্থনাসভার আয়োজন করে, তাও এই আইনের অধীনে সন্দেহজনক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই কেবল হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর মৌখিক অভিযোগে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে। কম সাজা হওয়ার হারের কারণে এ ধরনের ঢালাও গ্রেপ্তার, হয়রানি এবং সামাজিক সহিংসতা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে মারাত্মকভাবে বিনষ্ট করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এলাহাবাদ হাইকোর্টের উদ্বেগ:

চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্ট উত্তর প্রদেশের এই ধর্মান্তরবিরোধী আইনের অধীনে ঢালাওভাবে ‘মিথ্যা এফআইআর’ দায়ের করার বিষয়টিকে একটি "উদ্বেগজনক প্রবণতা" বলে তীব্র নিন্দা জানান। এ ধরনের ভিত্তিহীন মামলায় পুলিশ ও প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা স্পষ্ট করতে রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্য সচিবকে (স্বরাষ্ট্র) একটি ব্যক্তিগত হলফনামা দাখিল করারও নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।

আদালতের এমন পর্যবেক্ষণের পরেও রাজ্য প্রশাসনের শিক্ষাঙ্গনে এই ‘ধর্মান্তরবিরোধী সেল’ চালুর সিদ্ধান্ত ক্যাম্পাসের মুক্তচিন্তা এবং ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশকে সংকটে ফেলবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদরা।#

পার্সটুডে/এমএআর/১২