সূরা আন নিসা; আয়াত ৯২-৯৪ (পর্ব ২৬)
পবিত্র কুরআনের তাফসিরবিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা আন নিসার ৯২ থেকে ৯৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৯২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ أَنْ يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَأً وَمَنْ قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَأً فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ إِلَّا أَنْ يَصَّدَّقُوا فَإِنْ كَانَ مِنْ قَوْمٍ عَدُوٍّ لَكُمْ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُؤْمِنَةٍ وَإِنْ كَانَ مِنْ قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِيثَاقٌ فَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَى أَهْلِهِ وَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُؤْمِنَةٍ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ تَوْبَةً مِنَ اللَّهِ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا (92)
"কোন ঈমানদারের জন্যই অপর কোন ঈমানদারকে হত্যা করা বৈধ নয়। কিন্তু কেউ যদি ভুলক্রমে কোন মুমিনকে হত্যা করে এবং তার স্বজনরা হত্যাকারীকে ক্ষমা না করে, তাহলে সে একজন মুসলমান ক্রীতদাসকে মুক্ত করবে এবং নিহত ব্যক্তির স্বজনদেরকে হত্যার বদলা বা রক্তমূল্য পরিশোধ করবে। কিন্তু নিহত ব্যক্তি যদি শত্রু পক্ষের হয়, তাহলে শুধু একজন মুসলমান ক্রীতদাসকে মুক্ত করবে। আর যদি সে তোমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ কোন সম্প্রদায়ের হয়, তাহলে তার স্বজনদেরকে রক্তমূল্য অর্পন এবং একজন মুসলমান ক্রীতদাসকে মুক্ত করবে৷ অবশ্য এ ক্ষেত্রে যার সামর্থ নেই সে আল্লাহর কাছ থেকে গোনাহ মাফ করানোর জন্য একাধারে দু'মাস রোজা রাখবে; আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।" (৪:৯২)
হাদীসে এসেছে, এক মুসলমান মক্কায় দীর্ঘদিন ধরে কিছু মুশরেকের হাতে নির্যাতিত হয়। মদীনায় হিজরত করার পর নির্যাতনকারীদের একজনের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। মুসলমান লোকটি তাকে দেখেই ক্রোধান্বিত হয়ে ওঠে। অথচ মুশরেক ব্যক্তি যে এরই মধ্যে মুসলমান হয়েছে তা তার জানা ছিল না। সে তাকে অত্যাচারী ও কাফের ভেবেই হত্যা করে। এরপর এ খবর রাসূলে খোদার কাছে পৌছার পর এই আয়াতটি নাজিল হয়।
এর আগের পর্বে আমরা বলেছি- এ ধরনের অত্যাচারী ও কাফেরের শাস্তি হলো গ্রেফতার এবং প্রয়োজনে হত্যা করা। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে, ব্যাপক তদন্ত ও গভীর পর্যালোচনার পরই কেবল এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যাবে এবং তা হতে হবে মুসলিম শাসকের তত্ত্বাবধানে। অর্থাৎ যে কেউ তার ইচ্ছেমত রক্তপাত ঘটাতে পারবে না। ফলে মদীনায় ঐ মুসলমানের পদক্ষেপটিও ভুল ছিল এবং কোরআনের এই আয়াতে উল্লেখিত নির্দেশ অনুযায়ী শাস্তিস্বরূপ রক্তমূল্য পরিশোধ করতে হবে৷ এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, নিহত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনরা ইসলামের শত্রু হলে কিংবা মুসলমানদের সাথে কোন শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ না হলে নিহতের পরিবারকে রক্তমূল্য পরিশোধ করতে হবে না। কারণ এতে করে শত্রুপক্ষের আর্থিক সামর্থ জোরদার হবার আশঙ্কা রয়েছে এবং তা মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। নিহতের আত্মীয় স্বজনকে রক্তমূল্য পরিশোধ করার নীতি সমাজে অনেক ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে। এর ফলে প্রথমত: নিহতের পরিবার তাদের একজন সদস্যের মৃত্যুর কারণে যে আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে তা কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারে৷ দ্বিতীয়ত: সমাজের প্রতিটি মানুষ রক্তপাত ঘটানোর ক্ষেত্রে সতর্ক হয় যাতে ভুলক্রমেও কোন হত্যাকাণ্ড না ঘটে সে ব্যাপারে সচেতন থাকে। তৃতীয়ত: রক্তমূল্য পরিশোধ করার নির্দেশের মাধ্যমে মানুষের প্রাণ ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রতি সম্মান দেখানো হয়েছে।
সূরা নিসার ৯২ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে,
প্রথমত: মানুষের রক্তপাত ঘটানো আল্লাহর প্রতি ঈমানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়৷ কেউ যদি ভুলক্রমেও কাউকে হত্যা করে, তাকে এ জন্য কঠিন শাস্তি পেতে হবে ৷
দ্বিতীয়ত: ইসলাম ধর্ম দাস প্রথার প্রসার না ঘটিয়ে ক্রীতদাসদের মুক্ত করার বিভিন্ন পথ বাতলে দিয়েছে৷ যেমন, হত্যাকারীকে তার হত্যার ক্ষতিপূরণ হিসাবে একজন দাসকে তার বন্দীদশা থেকে মুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে৷ এভাবে একজন বন্দী মানুষ নব জীবন ফিরে পায় ৷
তৃতীয়ত: ইসলাম শুধু এবাতদের নিয়ম-কানুনই বাতলে দেয়নি, একইসঙ্গে সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা এবং সমাজে ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইনও বাতলে দিয়েছে ৷
সূরা নিসার ৯৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,
وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا (93)
"যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন ঈমানদারকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম সে চিরকাল সেখানেই থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্য কঠোর শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।" (৪:৯৩)
হাদীসে এসেছে, ওহুদ যুদ্ধ চলাকালে একজন মুসলমান অপর এক মুসলমানকে ব্যক্তিগত শত্রুতার জের হিসাবে হত্যা করে। রাসূলে খোদা (সা.) ওহীর মাধ্যমে এ সম্পর্কে অবহিত হন এবং যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে হত্যাকারীকে কেসাস করার অর্থাৎ অনুরূপ শাস্তি দেয়ার নির্দেশ দেন এবং তার ক্ষমা প্রার্থনাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।এর আগের আয়াতে ভুলক্রমে হত্যার শাস্তি সম্পর্কে আলোচনার পর এবারের আয়াতে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যার শাস্তি সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হয়েছে৷ স্বেচ্ছায় হত্যাকারী ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে অভিশপ্ত এবং সে সব সময় দোযখের আগুনে জ্বলবে। অবশ্য এর আগের এক আয়াতে আমরা এ ধরনের অপরাধের দুনিয়াবী শাস্তি সম্পর্কেও বলেছি। আর তা হলো কেসাস বা হত্যার বদলে হত্যা।
সূরা নিসার ৯৩ নম্বর আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে,
প্রথমত : অপরাধীর বিচারের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় অপরাধকারী এবং ভুলবশত: অপরাধকারীর শাস্তি সম্পূর্ণ আলাদা।
দ্বিতীয়ত : সমাজকে স্থিতিশীল ও দূর্নীতিমুক্ত করার একটি উপায় হলো সমাজে কঠিন ফৌজদারী আইন বাস্তবায়ন করা।
সূরা নিসার ৯৪ নম্বর আয়াত আয়াতে বলা হয়েছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيَّنُوا وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ أَلْقَى إِلَيْكُمُ السَّلَامَ لَسْتَ مُؤْمِنًا تَبْتَغُونَ عَرَضَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فَعِنْدَ اللَّهِ مَغَانِمُ كَثِيرَةٌ كَذَلِكَ كُنْتُمْ مِنْ قَبْلُ فَمَنَّ اللَّهُ عَلَيْكُمْ فَتَبَيَّنُوا إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا (94)
"হে ঈমানদারগণ, তোমরা যখন আল্লাহর পথে বের হও তখন সব কিছু যাচাই করে নিও এবং কেউ যদি তোমাদেরকে ইসলাম ও শান্তির কথা বলে তাহলে যুদ্ধে গনিমত ও পার্থিব সম্পদ লাভের উদ্দেশ্যে তাকে বলো না যে, তুমি মুসলমান নও। বস্তুত: আল্লাহর কাছে অনেক সম্পদ রয়েছে। তোমরাওতো এর আগে তার মতই ছিলে৷ আল্লাহ তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন। অতএব সত্যতা যাচাই করে নাও। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্মের খবর রাখেন।" (৪:৯৪)
ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, খায়বার যুদ্ধে মদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকার ইহুদী ও মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হবার পর রাসূল (সা.) ঐ এলাকার ইহুদী অধ্যুষিত একটি গ্রামের লোকজনকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ ও ইসলামী শাসন ব্যবস্থা মেনে নেবার আহ্বান জানানোর জন্য একদল মুসলমানকে সেখানে পাঠান৷ মুসলিম সৈন্যদের গ্রামে প্রবেশের খবর শুনে একজন ইহুদী তার ধন-সম্পদ ও পরিবারের সদস্যদেরকে পাহাড়ে লুকিয়ে রেখে তৌহিদ ও শাহাদাতের বাণী উচ্চারণ করতে করতে মুসলমান সৈন্যদেরকে ঐ গ্রামে স্বাগত জানায়। কিন্তু ইহুদী লোকটি ভয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে এই ভেবে একজন মুসলমান তাকে হত্যা করে এবং তার ধন সম্পদ যুদ্ধে প্রাপ্ত গনিমত হিসাবে গ্রহণ করে৷ এ ঘটনার পরই পবিত্র কোরআনের এই আয়াতটি নাজিল হয়। এ আয়াতের মাধ্যমে এ ধরনের আচরণের নিন্দা জানানো হয় এবং ঘোষণা দেয়া হয়, যে সৈন্য সমাবেশ, গনিমতের মাল ও দুনিয়াবী সম্পদ লাভ করা ইসলামের লক্ষ্য নয় বরং ধর্মের প্রতি আহ্বান এবং মুসলমান ও কাফেরদের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠাই ইসলামের মূল লক্ষ্য ৷
এই আয়াতে শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত: যুদ্ধ ও জিহাদ হতে হবে শত্রুদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও তাদের অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে ৷ এ ক্ষেত্রে আবেগ ও বস্তুগত স্বার্থকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।
দ্বিতীয়ত: কেউ নিজেকে মুসলমান হিসাবে দাবি করলে এবং তার দাবি মিথ্যা ও ভণ্ডামী বলে প্রমাণিত না হলে তাকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।
তৃতীয়ত: ক্ষমতার অপব্যবহার করা যাবে না এবং বিনা কারণে প্রতিপক্ষের সম্পদ আটক এবং তাদের বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ জারী করা যাবে না।
চতুর্থত: যুদ্ধের ময়দানে লড়াইরত মুজাহিদদের মধ্যেও দুনিয়াবী আকর্ষণ দেখা দিতে পারে ৷ কাজেই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
পঞ্চমত: মানুষকে তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এমনকি তার শত্রুদের ব্যাপারেও ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ এবং মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। #