নভেম্বর ০২, ২০১৯ ১২:৫৫ Asia/Dhaka

ফার্সি ভাষায় লেখা শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির বিখ্যাত পুস্তিকা ' পিপড়া বা উই পোকার কথপোকথন বিষয়ক রচনা'র নানা দিক নিয়ে আমরা কথা বলেছি গত পর্বের আলোচনায়।

প্রতীকী ও রহস্যময় ভাষায় লেখা এ বইয়ে উই পোকা বা পিপড়া ছাড়াও নানা জীব-জন্তু যেমন কচ্ছপ, বাদুড়, হুদহুদ পাখি ও নানা পোকামাকড় ও পাখির কথা-কেন্দ্রীক কাহিনী রয়েছে। কায়খসরুর বাটি বা জ’ম-এর রূপক কাহিনীও স্থান পেয়েছে উই পোকার কথপোকথন বিষয়ক রচনায়। কায়খসরুর এই বাটির মধ্যে দেখা যেত গোটা বিশ্ব। এটি  আসলে একজন আরেফ বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান-সাধকের পরিচ্ছন্ন মনেরই রূপক প্রকাশ। জিনের বাদশাহ’র প্রতি কোনো এক ব্যক্তির আকৃষ্ট হওয়ার গল্পটিও ইরফানি বা সুফি-তাত্ত্বিক বক্তব্য তুলে ধরার জন্য এ বইয়ে স্থান পেয়েছে।

সোহরাওয়ার্দির 'উই পোকার কথপোকথন বিষয়ক রচনা'- শীর্ষক পুস্তিকাটি মূলত খোদাপ্রেমের আধ্যাত্মিক পরিভ্রমণ সম্পর্কিত। বইটির মূল কথা বা বক্তব্য হচ্ছে- খোদা প্রেমিক হতে হলে মানুষকে বস্তুগত স্বার্থ-চিন্তার বন্ধন থেকে মুক্ত হতে হবে এবং এভাবেই সে অর্জন করতে পারে মহান আল্লাহর নৈকট্য। আর এই বক্তব্যকেই নানা প্রতিকী ঘটনা ও গল্পের মাধ্যমে এ বইয়ে তুলে ধরেছেন দার্শনিক সোহরাওয়ার্দি।  

সোহরাওয়ার্দির 'উই পোকার কথপোকথন বিষয়ক রচনা'- শীর্ষক  ছোট্ট বইটিতে রয়েছে নয়টি অধ্যায়। এ বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়ে রয়েছে চারটি দারুন আকর্ষণীয় গল্প। মানুষের আধ্যাত্মিক তথা খোদায়ী সত্তা থাকা, বাস্তবতা বুঝতে কুপমন্ডুক বা গোঁড়া ব্যক্তিদের অক্ষমতা, অন্ধ হৃদয়ের লোকদের ওপর শিক্ষার কোনো প্রভাব না থাকা এবং নিজের খোদায়ী সত্তাকে ভুলে থাকাটা মানুষের স্বভাব, উচ্চতর জগতে ওঠার জন্য খোদাপ্রেম ও সম্রাট কায়খসরুর বিশ্ব-সদৃশ বাটি- ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা রয়েছে এই অধ্যায়ে।

দার্শনিক সোহরাওয়ার্দি  'পিপড়া বা উই পোকার কথপোকথন বিষয়ক রচনা'- শীর্ষক পুস্তিকাসহ এ জাতীয় কোনো কোনো রচনায় খুব বেশি প্রতীক ব্যবহার করেছেন যাতে এসব লেখার আলঙ্কারিকতা বা বাগ্মিতা, কথামালার পরিধি ও গভীরতা এবং সৌন্দর্য বাড়ে। আর একইসঙ্গে শিষ্য বা অনুসারীদের জন্য আধ্যাত্মিক আকর্ষণ সৃষ্টিও ছিল তার রহস্যময় ভাষা ব্যবহারের আরও একটি বড় কারণ। এ ধরনের প্রতীকী বা রহস্যময় শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সোহরাওয়ার্দির জন্য সুবিধার দিকটি ছিল এটা যে এ জাতীয় শব্দ ব্যব্হারের সময় তিনি নিজের জন্য কোনো সীমাবদ্ধতা অনুভব করতেন না। বরং এসবের মাধ্যমে নজিরবিহীন কল্পনা-শক্তি প্রয়োগ করে তিনি দার্শনিক বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারতেন। অবশ্য উপমা বা প্রতীকের অর্থ বের করা অনেক সময় গবেষকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় এমনটিও দেখা যায় যে এসব প্রতীক বা উপমার মর্ম উদঘাটনের কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। ফলে অনেকেই এসব প্রতীক বা উপমার ভুল অর্থ গ্রহণ করে সোহরাওয়ার্দির দর্শনকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন।  

সোহরাওয়ার্দির 'উই পোকার কথপোকথন বিষয়ক রচনা'- শীর্ষক পুস্তিকার একটি লক্ষ্যনীয় বৈশিষ্ট হল ইশরাকি দর্শনের গুরু এখানে বেশ কিছু ফার্সি ও আরবি কবিতার পংক্তি ব্যবহার করেছেন মাঝে মধ্যেই। এমনকি এসব পংক্তির রচয়িতা বা কবিদের নামও উল্লেখ করেছেন।  সোহরাওয়ার্দির লেখা অন্য কোনো পুস্তিকায় এত বেশি মাত্রায় কবিতার ব্যবহার দেখা যায় না। যেমন, সোহরাওয়ার্দির 'জিব্রাইলের পালকের শব্দ' শীর্ষক বইয়ে কবিতার একটি পংক্তিও নেই।

'পিপড়া বা উই পোকার কথপোকথন বিষয়ক রচনা'- শীর্ষক পুস্তিকায়  পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াত  ও আরবি নানা কবিতার পংক্তিও দেখা যায়। বিপুল সংখ্যক আরবি শব্দ ও বাক্যের ব্যবহার এ পুস্তিকাটির গদ্যকে কিছুটা ভারী করে তুলেছে। সোহরাওয়ার্দি এ ছোট্ট বইটি লিখেছিলেন এমন কারো অনুরোধে যিনি ছিলেন তার মতই ফার্সি-ভাষী, কিন্তু তিনি আরবিও খুব ভালোই বুঝতেন।

সোহরাওয়ার্দির 'উই পোকার কথপোকথন বিষয়ক রচনার' উপমা, প্রতীক, প্রবাদ, পংক্তি ও গল্পগুলোর উদ্দেশ্য হল ইরফানি বিষয়গুলো তুলে ধরা। এ পুস্তিকায় দর্শন-বিষয়ক প্রতীক বা উপমা তুলনামূলকভাবে কম। এ পুস্তিকার কোনো কোনো গল্প অতীতের ফার্সি গদ্য ও পদ্যতে ব্যবহৃত কিছু গল্পের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ছোট্ট এ বইয়ের কাহিনীগুলোর সঙ্গে বৌদ্ধদের ব্যবহৃত কোনো কোনো গল্পেরও মিল রয়েছে । 

রাতের শিশির-বিন্দু নিয়ে কয়েকটি পিপড়া বা উই পোকার কথপোকথন দিয়ে শুরু হয়েছে সোহরাওয়ার্দির উই পোকার কথপোকথন বিষয়ক রচনা। তারা প্রশ্ন করছিল এসব শিশির কি ভূমির না বাতাসের? যখন তারা দেখল যে শিশির তথা শবনম বাস্প হয়ে বাতাসে মিশে যায় তখন তারা এ উপসংহারে পৌঁছালো যে শিশির বাতাস থেকেই আসে। এভাবে সোহরাওয়ার্দি এটা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে সব কিছুই তার মূলের দিকে তথা আলোর অধিপতি মহান আল্লাহর দিকে ফিরে যায়।

সোহরাওয়ার্দির 'পিপড়া বা উই পোকার কথপোকথন বিষয়ক রচনা'র কাছিমের গল্পে দেখা যায় কয়েকটি কাছিম সাগরে একটি মুরগি বা পাখিকে দেখতে পেল। ওরা প্রশ্ন করল: এই পাখি কি পানি থেকে না বাতাস থেকে এসেছে? পাখি যদি পানির মুখাপেক্ষী না হয় তাহলে কোনো পানিই নেই। তাহলে পানিহীনতা থাকাটা সম্ভব। দার্শনিক বলছেন যে হিজাব বা পর্দা উঠিয়ে না নেয়া পর্যন্ত প্রত্যক্ষকরণ বা শহুদ সম্ভব হবে না। যে দামী রত্ন প্রত্যক্ষকরণের আওতায় আসে তা সৃষ্টির অংশ ও একটি ঘটনা মাত্র। কাছিমগুলো দার্শনিকের কাছে প্রশ্ন করল: যে রত্ন বসাতে স্থান দরকার হয় তা কিভাবে দিক ও স্থানের অমুখাপেক্ষী হবে? দার্শনিক তাদের কোনো জবাব দিলেন না। ফলে কাছিমগুলো তাকে ত্যাগ করে।

দার্শনিক সোহরাওয়ার্দি এ উপমায় মহানবীর (সা) মেরাজ বা উর্ধ্বজগত অবলোকন এবং সুফিদের অভিজ্ঞতাগুলো তুলে ধরেছেন যা আসলে ছয় দিক ও স্থান থেকে বেরিয়ে আসার তত্ত্বই তুলে ধরছে।  তার মতে স্থান ও দিক থেকে বেরিয়ে আসা এবং পর্দা তুলে ফেলা  বেহেশতি জগতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য জরুরি। এখানে কাছিমগুলো হচ্ছে খোদাপ্রেমের পথ পেতে ব্যর্থ মানুষের দল। তারা দার্শনিক তথা তরিকতের ওস্তাদ বা পিরের বক্তব্য বুঝতে পারেনি ও তাকে ঠেকিয়ে দেয়। 

প্রাচীন ইরানের দর্শন, রূপকথা ও আরেফদের বক্তব্য সম্পর্কে ধারণা থাকলে সোহরাওয়ার্দির দর্শনে ব্যবহৃত প্রতীক, উপমা ও রূপক বা রহস্যময় বক্তব্যগুলোর তাৎপর্য বোঝা সহজ হয়।  #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ০২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।