ইরানবিরোধী মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধে মূল ভূমিকা রেখেছিল ‘স্টারলিংক’: রিপোর্ট
-
স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক নেটওয়ার্কের ভূমিকা ফাঁস করে দিয়েছে একটি নতুন প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, বেসামরিক অবকাঠামো হিসেবে বাজারজাত করা এই প্রযুক্তিটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ওপর চালানো প্রাণঘাতী হামলার একটি অবিচ্ছেদ্য উপাদানে পরিণত হয়েছিল।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পেন্টাগনের নথিপত্র এবং একাধিক সূত্রের সাক্ষাৎকার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালীন মার্কিন সামরিক ড্রোন হামলার প্রধান পরিচালনাকারী ভিত্তি (অপারেশনাল ব্যাকবোন) হিসেবে কাজ করেছিল স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক।
প্রতিবেদনে আরও প্রকাশ করা হয়েছে যে, এই নেটওয়ার্কটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি এবং ইরানকে খণ্ড-বিখণ্ড করার পশ্চিমা-সমর্থিত প্রচেষ্টার একটি হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল।
২০২৩ সালের একটি চুক্তি অনুযায়ী, স্পেসএক্স পেন্টাগনের কাছে 'স্টারশিল্ড' নামে স্টারলিংকের একটি বিশেষ সামরিক সংস্করণ বিক্রি করে। এই টার্মিনালগুলো বাণিজ্যিক স্টারলিংক স্যাটেলাইট এবং 'স্টারশিল্ড' নামের একটি পৃথক ও আরও নিরাপদ নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত হতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর দিকেই স্টারলিংক ইরানের ওপর মার্কিন হামলার একটি মূল উপাদানে পরিণত হয়েছিল। প্রাথমিক পরীক্ষা এবং মোতায়েনের সময় এটি আকাশপথের ড্রোন হামলা থেকে শুরু করে সামুদ্রিক গুপ্তচরবৃত্তি ও হামলার মিশনে ব্যবহৃত চালকবিহীন জলযানসহ বিভিন্ন ব্যবস্থায় সহায়তা প্রদান করেছিল। মার্কিন আগ্রাসন যখন শুরু হয়, তখন এক ডজনেরও বেশি ড্রোন সিস্টেমে স্টারশিল্ড টার্মিনাল ব্যবহার করা হচ্ছিল।
রয়টার্সের অনুসন্ধান নিশ্চিত করেছে যে, স্টারলিংক নেটওয়ার্কটি ইরানের 'শাহেদ' ড্রোনের আদলে তৈরি মার্কিন 'লুকাস' (LUCAS) ড্রোনে রিয়েল-টাইম ভিডিও ফিড এবং কমান্ড গাইডেন্স প্রদান করেছিল।
একই সাথে, ইরানে অবৈধভাবে পাচার করা হাজার হাজার স্টারলিংক টার্মিনাল মার্কিন অফিশিয়াল সামরিক ব্যবহারকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৬,০০০ স্টারলিংক টার্মিনাল ইরানে পাচার করে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কেনা প্রায় ৭,০০০ টার্মিনালের সিংহভাগই "ইন্টারনেট-স্বাধীনতা উদ্যোগ" থেকে অর্থ ডাইভার্ট করে কেনা হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল "ইরানের সরকার-বিরোধীদের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এড়াতে সাহায্য করা।"
ধারণা করা হচ্ছে, ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩০,০০০ থেকে ৫০,০০০ স্টারলিংক টার্মিনাল ইরানে পাচার করা হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় মার্কিন প্রশাসনের সম্পৃক্ততা ছিল সরাসরি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি পাচারের বিষয়ে অবগত ছিলেন, যা সক্রিয়ভাবে ইরানের ভূখণ্ডে প্রাণঘাতী ড্রোনগুলোকে পথ দেখাচ্ছিল।
পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এই পাচারকে "ইন্টারনেট স্বাধীনতা"র পক্ষে একটি প্রচেষ্টা হিসেবে চিত্রায়িত করেছিল। তবে রয়টার্সের পর্যালোচনা করা পেন্টাগনের নথিতে দেখা গেছে, এই একই টার্মিনালগুলো একই সাথে মার্কিন সামরিক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
এর জবাবে ইরানি কর্তৃপক্ষ বহু টার্মিনাল জব্দ করে এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে প্রধান শহরগুলোতে জ্যামিং ডিভাইস মোতায়েন করে। ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ও সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল যে, স্টারলিংক টার্মিনালগুলো "ইলেকট্রনিক গুপ্তচরবৃত্তি ও নাশকতার" জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এগুলোকে "নিরাপত্তা-বিরোধী পণ্য" হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
গত জানুয়ারিতে বিদেশি সমর্থিত বিক্ষোভের সময় যুক্তরাষ্ট্র স্টারলিংক সরবরাহ আরও দ্রুততর করেছিল বলেও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।#
পার্সটুডে/এমএআর/৫